আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের সৌদি আরবে আকস্মিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে নজিরবিহীন যুদ্ধাবস্থা তৈরি হয়েছে। এই উত্তেজনার জেরে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার চলমান ছায়া যুদ্ধে এবার সরাসরি পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশ পাকিস্তান জড়িয়ে পড়তে পারে বলে তীব্র আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
বিশেষ করে সৌদি আরবের সঙ্গে থাকা কৌশলগত প্রতিরক্ষা চুক্তির কারণে ইরানের বিরুদ্ধে পাকিস্তানকে সরাসরি সামরিক অ্যাকশনে নামতে হতে পারে, যা পুরো এশীয় অঞ্চলের নিরাপত্তাকে এক চূড়ান্ত ঝুঁকির মুখে দাঁড় করিয়েছে।
বার্তাসংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, হুথিদের নিয়ন্ত্রণাধীন একটি বিমানবন্দরে সৌদি আরব বোমাবর্ষণ করেছে—এমন অভিযোগ তুলে সৌদি ভূখণ্ড লক্ষ্য করে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে হুথিরা। এতে দুই পক্ষের মধ্যে চার বছর ধরে কার্যকর থাকা দীর্ঘ যুদ্ধবিরতি ভেঙে যায়।
এই ঘটনার পর পাকিস্তানের শীর্ষ বেসামরিক ও সামরিক নেতৃত্ব সর্বোচ্চ পর্যায়ে তেহরানকে কড়া বার্তা দিয়ে জানিয়েছে, সৌদি আরবের ওপর যেকোনো হামলা মানে সরাসরি পাকিস্তানের ওপর হামলা এবং এটি ইসলামাবাদের জন্য একটি চূড়ান্ত ‘রেড লাইন’ বা সীমারেখা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পাকিস্তানের শীর্ষ কর্মকর্তারা রয়টার্সকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
ইরানে বেসামরিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের ভয়াবহ হামলা
গত বছর সৌদি আরবের সঙ্গে একটি ঐতিহাসিক পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করে পাকিস্তান। ওই চুক্তির আওতায় হাজার হাজার পাকিস্তানি সেনা এবং যুদ্ধবিমান স্কোয়াড্রন বর্তমানে সৌদি আরবে মোতায়েন রয়েছে। উদ্বেগের বড় কারণ হলো, ইয়েমেন সীমান্তের কাছাকাছি সৌদি এলাকায় পাকিস্তানি সেনারা অবস্থান করায় হুথিদের এই হামলায় তারা সরাসরি ঝুঁকির মধ্যে পড়েছেন। পরিস্থিতি আরও অবনতি হলে প্রতিরক্ষা চুক্তির শর্ত অনুযায়ী পাকিস্তানকে সরাসরি সামরিকভাবে হস্তক্ষেপ করতে হবে। পাকিস্তানের নিরাপত্তা বিশ্লেষক মুহাম্মদ আমির রানা বলেন, ‘আঞ্চলিক উত্তেজনা এত দ্রুত ও নাটকীয়ভাবে বাড়বে, তা পাকিস্তান আগে ধারণা করতে পারেনি।’
ইসলামাবাদের আশঙ্কা, হুথিদের কারণে উত্তেজনা বাড়লে লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নৌপথে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে, যার ওপর পাকিস্তানের অর্থনীতি বহুলাংশে নির্ভরশীল। এছাড়া হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে চলমান উত্তেজনায় দেশটির অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সরবরাহ ইতিমধ্যে ব্যাহত হয়েছে, যার ফলে ক্ষুব্ধ প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের সরকার বাধ্য হয়ে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আগেভাগে বন্ধ রাখাসহ নানা জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ফলে মধ্যস্থতার পেছনে ইসলামাবাদের প্রধান উদ্দেশ্য কেবল কূটনৈতিক প্রভাব বাড়ানো নয়, বরং নিজেদের জ্বালানি সরবরাহের রুট সচল রাখাও।
পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল গুলাম মোস্তফা বলেন, আপাতত পাকিস্তানের শীর্ষ নেতৃত্ব সব পক্ষকে শান্ত রাখার চেষ্টা করছে। তবে হুথিরা যদি সৌদি আরবে তাদের হামলার পরিধি আরও বাড়ায়, তাহলে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে যেতে পারে। এদিকে পাকিস্তান সরকারের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইরানের নেতৃত্বের অভ্যন্তরে বাড়তে থাকা অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মতপার্থক্যও গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে ইসলামাবাদ। তাদের ভাষ্য, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির অবস্থান থেকে দেশটির শক্তিশালী সামরিক বাহিনী ইসলামি রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) রাজনৈতিক লক্ষ্য ক্রমেই ভিন্ন হয়ে যাচ্ছে এবং সেখানে সামরিক প্রভাব বাড়ছে।
এই আঞ্চলিক উত্তেজনার মাঝেই বুধবার (১৫ জুলাই) দুই দিন বিলম্বে ইরানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসকান্দার মোমেনির নেতৃত্বাধীন একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল ইসলামাবাদে পৌঁছায়। কর্মকর্তারা জানান, দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা ও চলমান যুদ্ধাবস্থা নিয়ে বিশদ আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
বৃহস্পতিবার(১৬ জুলাই) নিয়মিত ব্রিফিংয়ে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র তাহির আন্দরাবি বলেন, ‘সব পক্ষকে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানাচ্ছে পাকিস্তান। বর্তমান সংকটে টেকসই যোগাযোগ, সংলাপ ও কূটনীতির কোনো বিকল্প নেই।’ তবে মধ্যস্থতা প্রক্রিয়া সম্পর্কে অবগত পাকিস্তানের আরেকটি নির্ভরযোগ্য সূত্র স্পষ্ট করে জানিয়েছে, যুদ্ধের অবসান সবার জন্যই মঙ্গলজনক, তবে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সৌদি আরব যদি কোনো সামরিক সহায়তার জন্য ডাকে, তবে পাকিস্তান তাদের পাশেই গিয়ে দাঁড়াবে।
RED TIMES LIMITED
116-117, Concord Emporium, Kataban, Dhaka-1205.
Mobile: 017111-66826
Email: redtimesnews@gmail.com
Copyright © 2026 RED TIMES. All rights reserved.