অনলাইন ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানে নতুন করে হামলা চালালে উপসাগরীয় অঞ্চলের সাতটি দেশের তেল স্থাপনা, সমুদ্রতলের যোগাযোগ ক্যাবল, ডেটা সেন্টার ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করা হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মোহসিন রেজায়ি এ হুমকি দিয়েছেন বলে ইরানের সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাত নিরসনে আলোচনায় যুক্ত কট্টরপন্থি রাজনীতিক ও পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের উপদেষ্টা মেহদি মোহাম্মদি বলেছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নতুন করে হামলার বিষয়ে নীতিগতভাবে একমত হয়েছেন। তবে এমন অভিযানে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করা যাবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
মোহাম্মদির ভাষ্য, ইরান সম্ভাব্য পরবর্তী সংঘাতকে অস্তিত্বের জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করছে। দুই বছরের মধ্যে তৃতীয়বারের মতো যুদ্ধ শুরু হলে তার পরিণতি হবে গুরুতর। এ পরিস্থিতিতে যুদ্ধের সময়সীমা ও ভৌগোলিক বিস্তারের প্রচলিত সীমা না মেনেই পাল্টা জবাব দেওয়ার কৌশল নিয়েছে তেহরান।
ইরানের সংবাদমাধ্যমের বরাতে জানা গেছে, রেজায়ি বলেছেন, দেশটির অর্থনৈতিক জীবনরেখায় আঘাত হানা হলে হামলায় সহায়তাকারী পক্ষগুলোর অর্থনৈতিক অবকাঠামোও নিরাপদ থাকবে না। নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে যোগাযোগব্যবস্থা, ডেটা সেন্টার ও এআই-সংশ্লিষ্ট স্থাপনাও ইরানের সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় থাকবে।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে নতুন করে হামলার পরিকল্পনা নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের তৎপরতা বাড়ছে বলে বিভিন্ন মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। আগামী ৩ নভেম্বরের নির্বাচনের পর সম্ভাব্য অভিযানের জন্য মার্কিন সামরিক উপদেষ্টারা লক্ষ্যবস্তুর বিস্তারিত তালিকা তৈরি করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে ইরান, ইয়েমেন ও ফিলিস্তিন পরিস্থিতি নিয়ে সমন্বিত নীতি নির্ধারণের লক্ষ্যে শুক্রবার ইস্তাম্বুলে বৈঠকে বসার কথা রয়েছে কয়েকটি দেশের প্রতিনিধিদের। এতে তিনটি ইউরোপীয় দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের পাশাপাশি তুরস্ক, সৌদি আরব, পাকিস্তান ও মিসরের প্রতিনিধিরা অংশ নেবেন। তেহরান ও ওয়াশিংটন উভয় পক্ষের সামরিক প্রস্তুতির খবরে নতুন করে সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার দাবিও উত্তেজনা বাড়িয়েছে। বুধবার প্রণালি দিয়ে চলাচলের চেষ্টা করা চারটি বাণিজ্যিক জাহাজে একই সময়ে হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) নৌবাহিনী। জাহাজগুলো থেকে অন্য জাহাজে তেল স্থানান্তর করা হচ্ছিল বলে দাবি করেছে তারা। এ ছাড়া প্রণালিতে মাইন বিস্ফোরণে আরও তিনটি জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলেও জানিয়েছে আইআরজিসি। তবে এসব ঘটনার বিবরণ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
নতুন করে হামলার আশঙ্কার প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১৩ দশমিক ৪ ডলারে পৌঁছেছে, যা সাম্প্রতিক সময়ের সর্বোচ্চ পর্যায়ের একটি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত চার মাসে সাতবার ইরানে নতুন করে হামলার সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছেন ট্রাম্প। তবে কূটনৈতিক আলোচনা অচলাবস্থায় পড়ায় যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করছেন। সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনা, তেল অবকাঠামো ও পারমাণবিক স্থাপনাও রয়েছে বলে জানা গেছে।
এ পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যৌথ সামরিক মহড়াও চালিয়ে যাচ্ছে। ইরাকের আকাশসীমা দিয়ে উড্ডয়নসহ বিভিন্ন সামরিক অভিযানের অনুশীলন চলছে। সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি সপ্তাহের শুরুতে ইসরাইলের কয়েক ডজন যুদ্ধবিমান ইরানের সীমান্তের কাছাকাছি উড়েছে।
এর মধ্যে মধ্য ইরানের আরাক শহরের একটি বড় অ্যালুমিনিয়াম কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাও ঘটেছে। এ ঘটনায় দেশটির অভ্যন্তরে অন্তর্ঘাতমূলক তৎপরতা চলছে কি না, তা নিয়ে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সোমবার ইসরাইলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের সঙ্গে বৈঠক করেন নেতানিয়াহু। বৈঠকে সম্ভাব্য যৌথ হামলার সময় ও উদ্দেশ্য নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ধরনের অভিযান নেতানিয়াহুর পুনর্নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনায় কী প্রভাব ফেলতে পারে, তা নিয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে। একই সঙ্গে নেতানিয়াহু চান, ইরান আগে হামলা চালাক—বৈঠকে তিনি এমন মনোভাব জানিয়েছেন বলেও প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
ট্রাম্পের পরিকল্পনা অনুযায়ী, নভেম্বরের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে তিনটি বিমানবাহী রণতরি, কয়েক হাজার মেরিন সেনা, যুদ্ধবিমান ও বিশেষ অভিযান পরিচালনাকারী বাহিনী মোতায়েন করা হতে পারে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঘনিষ্ঠ আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ রেজা নাসরি সতর্ক করে বলেছেন, নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে তা নির্দিষ্ট কোনো এলাকায় সীমাবদ্ধ থাকার সম্ভাবনা কম। তার আশঙ্কা, সংঘাত ছড়িয়ে পড়লে আঞ্চলিক বিদ্যুৎ গ্রিড, লবণাক্ত পানি পরিশোধন কেন্দ্র, তেল শোধনাগার ও বন্দরগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এতে বিপুলসংখ্যক মানুষ পানি ও বিদ্যুৎ সংকটে পড়বে এবং আরব দেশগুলো থেকে শরণার্থীদের ইউরোপমুখী হওয়ার চাপ বাড়তে পারে।
নাসরির মতে, হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলে জ্বালানি তেলের দাম ব্যাপকভাবে বেড়ে যাবে এবং বিশ্ব অর্থনীতি মন্দার মুখে পড়তে পারে। দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত ইসরাইলের অর্থনীতির ওপরও চাপ তৈরি করবে। একই সঙ্গে এমন পরিস্থিতি ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সংকটের কারণ হতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
আইআরজিসির ঘনিষ্ঠ সংবাদ সংস্থা ফার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্ভাব্য বড় যুদ্ধের জন্য ইরানের বিভিন্ন সামরিক ও অভিযান পরিচালনাকারী ইউনিটকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, নতুন সংঘাতের সময় ইরানি কর্মকর্তাদের হত্যা বা বেসামরিক নাগরিকদের প্রাণহানির ঘটনা ঘটলে তেহরানের পাল্টা হামলা শুধু সামরিক স্থাপনায় সীমাবদ্ধ থাকবে না; রাজনৈতিক লক্ষ্যবস্তুও এর আওতায় আসতে পারে।
অন্যদিকে, যুদ্ধবিরতির পথ খুঁজতে ইরান ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারীরা চলতি সপ্তাহে আবারও আলোচনা করেছেন। আলোচনায় আগের কয়েকটি প্রস্তাব নতুন করে বিবেচনা করা হচ্ছে। এসব প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে হরমুজ প্রণালির অবরোধ তুলে নেওয়া, জাতিসংঘের অস্ত্র পরিদর্শকদের বোমা হামলার শিকার ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা পরিদর্শনের সুযোগ দেওয়া এবং দেশটির উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত তৃতীয় কোনো দেশে পাঠানো। এর বিনিময়ে ইরানের কয়েক বিলিয়ন ডলারের জব্দ সম্পদ ফেরত দেওয়ার প্রস্তাবও আলোচনায় রয়েছে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
RED TIMES LIMITED
116-117, Concord Emporium, Kataban, Dhaka-1205.
Mobile: 017111-66826
Email: redtimesnews@gmail.com
Copyright © 2026 RED TIMES. All rights reserved.