অনলাইন ডেস্ক
ভারতের অরুণাচল প্রদেশের বিতর্কিত সীমান্ত এলাকায় চীনা সেনাদের আবারও অবস্থান নেওয়া এবং ভারতীয় ভূখণ্ড বলে দাবি করা এলাকার কয়েক কিলোমিটার ভেতরে তাঁবু স্থাপনের অভিযোগ উঠেছে। ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী প্রধানের এমন বক্তব্যে দুই দেশের সম্পর্কের উন্নতি নিয়ে নতুন করে সংশয় তৈরি হয়েছে।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছরের বেশির ভাগ সময় ভারত ও চীন সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা চালিয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সীমান্ত পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে, দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা কমানোর উদ্যোগ এখনো নাজুক অবস্থায় রয়েছে।
ভারত-তিব্বত সীমান্ত পুলিশ বাহিনীর মহাপরিচালক শত্রুজিৎ সিং কাপুর সম্প্রতি রাজস্থানে এক অনুষ্ঠানে বলেন, চলতি বছরের জুলাইয়ে অরুণাচল প্রদেশের কয়েকটি স্থানে ভারতীয় ও চীনা সেনাদের মধ্যে মুখোমুখি অবস্থানের ঘটনা ঘটে। শুরুতে দুই পক্ষই সেনা সরিয়ে নিলেও কয়েক দিন পর চীনা সেনারা আরও বেশি সংখ্যায় ফিরে আসে।
কাপুরের ভাষ্য অনুযায়ী, চীনা সেনারা প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা (এলএসি) নিয়ে ভারতের ধারণা অনুযায়ী দেশটির ভূখণ্ডের প্রায় ছয় থেকে সাত কিলোমিটার ভেতরে তাঁবু স্থাপন করে। এসব এলাকায় দুই দেশের সেনাদের মধ্যে মুখোমুখি অবস্থানের ঘটনা এখনো অব্যাহত রয়েছে বলেও জানান তিনি।
সীমান্ত নিয়ে এ ধরনের সংবেদনশীল তথ্য সাধারণত ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার বা প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়। ফলে একজন দায়িত্বশীল সীমান্তরক্ষী কর্মকর্তার এমন বক্তব্য দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ভারত ও চীনের মধ্যে প্রায় ৩ হাজার ৪৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত নিয়ে কয়েক দশক ধরে বিরোধ চলছে। প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা দুই দেশের নিয়ন্ত্রণাধীন অঞ্চলকে আলাদা করলেও এর বড় একটি অংশের সুনির্দিষ্ট সীমানা এখনো চিহ্নিত হয়নি। ফলে বিভিন্ন এলাকায় দুই দেশই একই ভূখণ্ডের ওপর নিজেদের অধিকার দাবি করে আসছে।
চীন অরুণাচল প্রদেশকে দক্ষিণ তিব্বলের অংশ হিসেবে দাবি করে। অন্যদিকে ভারত বরাবরই এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, অরুণাচল তাদের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
এই সীমান্ত বিরোধের জেরে ১৯৬২ সালে দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ হয়। ওই যুদ্ধে ভারত পরাজিত হয়। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে সীমান্তে উত্তেজনা থাকলেও ২০২০ সালের জুনে লাদাখের গালওয়ান উপত্যকায় দুই দেশের সেনাদের সংঘর্ষ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। ওই ঘটনায় ভারতের ২০ জন সেনা এবং চীনের চারজন সেনা নিহত হন। ১৯৭৫ সালের পর দুই দেশের মধ্যে সেটিই ছিল প্রথম প্রাণঘাতী সংঘর্ষ।
গালওয়ান সংঘর্ষের পর ভারত-চীন সম্পর্কের অবনতি ঘটে। দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগে টানাপোড়েন দেখা দেয়। বাণিজ্য ও ভ্রমণেও এর প্রভাব পড়ে। পরে কয়েক দফা আলোচনার পর ২০২৪ সালে সীমান্তে উত্তেজনা কমাতে দুই দেশ সমঝোতায় পৌঁছায়।
এরপর সরাসরি বিমান চলাচল পুনরায় চালু করা এবং ভিসাসংক্রান্ত বিধিনিষেধ শিথিল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। সেপ্টেম্বরে ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ভারত সফর করেন। সাত বছরের মধ্যে এটি ছিল তাঁর প্রথম ভারত সফর।
এমন প্রেক্ষাপটে অরুণাচল সীমান্তে নতুন করে চীনা সেনাদের অবস্থান নেওয়ার অভিযোগ দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
কাপুরের বক্তব্যের পর ভারতের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস নরেন্দ্র মোদি সরকারের সমালোচনা করেছে। দলটির জ্যেষ্ঠ নেতা জয়রাম রমেশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লেখেন, এই গুরুতর বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর প্রশাসন নীরব রয়েছে।
তবে ভারত সরকার চীনা সেনাদের তাঁবু স্থাপনের অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেনি। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল গত সপ্তাহে বলেন, চীনা বাহিনী প্রচলিত টহল দেওয়ার নিয়ম থেকে সরে এলে সীমান্ত এলাকার পরিস্থিতি মাঝেমধ্যে বিঘ্নিত হয়। অমীমাংসিত বিষয়গুলোর সমাধানে দুই দেশ সামরিক ও কূটনৈতিক যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছে বলেও জানান তিনি।
অন্যদিকে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র বলেছেন, ভারত-চীন সীমান্ত নিয়ে বিদ্যমান চুক্তিগুলো বেইজিং ধারাবাহিকভাবে মেনে চলছে। ভূখণ্ডের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় চীনা বাহিনী সীমান্ত এলাকায় স্বাভাবিক টহল ও ব্যবস্থাপনার কাজ করছে বলেও দাবি করেন তিনি।
ভারতের সাবেক পররাষ্ট্রসচিব শ্যাম শরণ বিবিসিকে বলেন, অরুণাচল প্রদেশের সীমান্তবর্তী বিভিন্ন স্থানে চীনের এ ধরনের তৎপরতা বেশ কিছুদিন ধরেই চলছে। ২০০০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে চীনের সঙ্গে সীমান্ত নিয়ে আলোচনায় নেতৃত্ব দেওয়া শ্যাম শরণের মতে, এসব পদক্ষেপ তাৎক্ষণিকভাবে যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি না করলেও সীমান্তের বাস্তব অবস্থায় পরিবর্তন আনার সুযোগ তৈরি করতে পারে।
অন্যদিকে চীনের গণমুক্তি ফৌজের অবসরপ্রাপ্ত জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ঝৌ বো মনে করেন, ২০২০ সালের গালওয়ান সংঘর্ষ থেকে ভারত ও চীন উভয়েরই শিক্ষা নেওয়া উচিত। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা এড়াতে দুই পক্ষকে আরও সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন তিনি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, অরুণাচল সীমান্তে সাম্প্রতিক মুখোমুখি অবস্থানের খবর চীনা সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়নি।
বাণিজ্যেও বাড়ছে নির্ভরতার চাপ
সীমান্ত বিরোধের পাশাপাশি দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কও নানা জটিলতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। মতপার্থক্য সত্ত্বেও ভারত ও চীন একে অপরের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার। গত বছর দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১৫১ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে ভারতে চীনের রপ্তানির পরিমাণ ছিল প্রায় ১৩১ বিলিয়ন ডলার।
যন্ত্রপাতি, বিরল মৃত্তিকা দিয়ে তৈরি চুম্বক, বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি ও ওষুধের মতো গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের জন্য ভারত চীনের ওপর নির্ভরশীল। ফলে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বাড়লে তার প্রভাব সীমান্তের বাইরেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
গত সপ্তাহে চীন সুড়ঙ্গ খননে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি রপ্তানিতে বিধিনিষেধ আরোপের ঘোষণা দিয়েছে। পাতাল রেল ও মহাসড়ক নির্মাণে এসব যন্ত্রের ব্যবহার রয়েছে। জাতীয় নিরাপত্তা ও স্বার্থ রক্ষার কথা বলে বেইজিং এ সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে। বিধিনিষেধটি শুধু ভারতকে লক্ষ্য করে দেওয়া না হলেও দেশটির অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে এর প্রভাব পড়তে পারে।
নিউইয়র্কের ইউনিভার্সিটি অ্যাট অ্যালবানির অধ্যাপক ক্রিস্টোফার ক্লারি বিবিসিকে বলেন, ভারতের উত্থানকে জটিল করে তোলার মতো নীতি অনুসরণ করছে চীন। বিশেষ করে উন্নত প্রযুক্তি ও উৎপাদন খাতে ভারতের সক্ষমতা বাড়ানোর পথে বাধা তৈরির বিষয়টি এ নীতির অংশ হতে পারে।
এর আগে বিরল মৃত্তিকা চুম্বক রপ্তানিতে চীনের বিধিনিষেধের কারণে ভারতের বিভিন্ন শিল্পে সরবরাহের সমস্যা দেখা দিয়েছিল। বৈদ্যুতিক গাড়ি, স্মার্টফোন, বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদনের টারবাইন এবং চিকিৎসায় ব্যবহৃত স্ক্যানার তৈরিতে এসব চুম্বক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
চীনের ওপর নির্ভরতা কমাতে ভারত নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। তবে এ ধরনের শিল্প প্রতিষ্ঠায় প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ও সময়।
সীমান্তবর্তী বাসিন্দাদের উদ্বেগ
সীমান্তে উত্তেজনার প্রভাব পড়ছে স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবনেও। অরুণাচল টাইমসের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক টোঙ্গাম রিনা বিবিসিকে বলেন, সীমান্তবর্তী কয়েকটি গ্রামের বাসিন্দারা জানিয়েছেন, চীনের অনুপ্রবেশ ও দখলদারির কারণে তারা চারণভূমিতে যেতে পারছেন না। তাঁর মতে, এ ধরনের পরিস্থিতি নতুন নয়; দীর্ঘদিন ধরেই এমন সমস্যা চলছে।
এতে সীমান্ত এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে। স্থানীয়রা আগে যেসব এলাকায় শিকার করতে যেতেন বা চমরি গাই চরাতেন, সেসব এলাকায় এখন আর সহজে যেতে পারছেন না। কবে আবার সেখানে যাওয়ার সুযোগ হবে, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।
এদিকে ভারত-চীন সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে দিল্লির কৌশলগত উদ্বেগও বাড়ছে। ভারতের নীতিনির্ধারকদের একাংশের আশঙ্কা, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদারে বেশি গুরুত্ব দিলে ভবিষ্যতে দুই দেশের মধ্যে সংঘাতের পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটনের কাছ থেকে প্রত্যাশিত সমর্থন পাওয়া কঠিন হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, চীনের হয়তো ভারতের সঙ্গে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে জড়ানোর আগ্রহ নেই। তবে সীমান্ত বিরোধ দীর্ঘস্থায়ী হলে এবং দেশটির অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি বাড়তে থাকলে ভবিষ্যৎ আলোচনায় বেইজিং সুবিধাজনক অবস্থানে যেতে পারে।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো তাই ভারতকে নতুন করে সতর্ক করছে। দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ ও বাণিজ্যিক সম্পর্কের উন্নতি হলেও সীমান্ত বিরোধের স্থায়ী সমাধান ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি শান্তি নিশ্চিত করা কঠিন।
RED TIMES LIMITED
116-117, Concord Emporium, Kataban, Dhaka-1205.
Mobile: 017111-66826
Email: redtimesnews@gmail.com
Copyright © 2026 RED TIMES. All rights reserved.