অনলাইন ডেস্ক:
আজ মহান একুশে ফেব্রুয়ারি, শহীদ দিবস। ভাষার লড়াইয়ে আজ মাথা নত না করার দিন। দিনটি ভাষা শহীদ দিবস হিসেবে পালন করছে জাতি। একইসঙ্গে জাতিসংঘের উদ্যোগে বাংলাদেশসহ সারাবিশ্বে ভাষা শহীদদের স্মরণে দিবসটি যথাযথ মর্যাদায় পালিত হবে।
বাঙালির আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার লড়াকু ইতিহাসের অমর একুশের ৭৫ বছর পূর্ণ হলো আজ। ১৯৫২ সালের এই দিনে মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় বুকের রক্ত ঢেলে দিয়ে যারা স্বাধীন বাংলাদেশের ভিত্তি রচনা করেছিলেন, সেই বীর শহীদদের প্রতি আজ পরম শ্রদ্ধায় নত হচ্ছে জাতি।
শুক্রবার (২০ ফেব্রুয়ারী) দিবাগত রাত ১২টা ১ মিনিটে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের বেদিতে পুষ্পস্তবক অর্পণের মধ্য দিয়ে দিবসের কর্মসূচি শুরু করেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পরে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ, ঢাকায় বিদেশি দূতাবাসের প্রতিনিধিবর্গ, একুশে উদ্যাপন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, দফতর ও সংস্থার প্রতিনিধিবর্গ এবং রাজনৈতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা নিবেদনের পর নির্ধারিত ধারাক্রম অনুযায়ী বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ কর্তৃক কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদনের লক্ষ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অতিরিক্ত ৩০ মিনিট নিরাপত্তায় নিয়োজিত থাকেন। এরপর শহীদ মিনার এলাকা সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়।
শহীদ দিবস ও আর্ন্তজাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি তার বাণীতে বলেন, “স্মৃতিবিজড়িত এই দিনে আমি গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি মাতৃভাষা বাংলার অধিকার আদায়ে জীবন উৎসর্গকারী ভাষা শহিদ রফিক, সালাম, বরকত, জব্বার, শফিউরসহ নাম না জানা শহিদদের। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ২০২৬ উপলক্ষ্যে আমি বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন ভাষাভাষী জনগণ ও জাতিগোষ্ঠীকে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।”
মহান ভাষা আন্দোলন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাসের এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, “ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আমাদের নিজস্ব জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘটে। মূলত ভাষা আন্দোলন ছিল নিজস্ব জাতিসত্তা, স্বকীয়তা ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষার আন্দোলন। আমাদের স্বাধিকার, মুক্তিসংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে অমর একুশের চেতনাই যুগিয়েছে অফুরন্ত প্রেরণা ও অসীম সাহস।”
তিনি আরও যোগ করেন, “মহান একুশের চেতনাকে ধারণ করে পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষাভাষী ও সংস্কৃতির মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সম্মানবোধ জাগ্রত হোক, দেশ ও জাতির কল্যাণ নিশ্চিত হোক— মহান শহিদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে এ কামনা করি।
দিবসটি উপলক্ষে দেশবাসী ও বিশ্বের সকল ভাষাভাষী মানুষকে শুভেচ্ছা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এক বিশেষ বিবৃতি দিয়েছেন। বাণীতে তিনি বলেন, “একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের জাতীয় জীবনের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায় এবং গৌরবের প্রতীক। ৫২-র ভাষা আন্দোলন কেবল ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠাই করেনি, বরং বাঙালির স্বাধিকার, গণতন্ত্র ও সাংস্কৃতিক চেতনার ভিত্তিকে মজবুত করেছে। একুশের এই রক্তাক্ত পথ ধরেই মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমরা অর্জন করেছি বাংলাদেশের স্বাধীনতা।”
প্রধানমন্ত্রী আরও যোগ করেন, “১৯৭১ সালের স্বাধীনতা অর্জন এবং ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে আমরা একটি স্বনির্ভর, নিরাপদ ও মানবিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়তে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আসুন, আমরা সর্বস্তরে বাংলা ভাষার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করি এবং বিশ্বের সকল বিপন্ন ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণে সচেষ্ট হই।”
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, “গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, জনগণের অধিকার ও সমতা প্রতিষ্ঠাই ছিল একুশের মূল চেতনা। এ চেতনাকে ধারণ করে দীর্ঘ লড়াই সংগ্রাম পার হয়ে দেশে আজ গণতন্ত্র পুনপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। গণতন্ত্রের এই অগ্রযাত্রাকে সুসংহত করতে বর্তমান সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
১৯৫২ সালের এই দিনে তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর ‘উর্দু হবে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’ এমন একতরফা ঘোষণার প্রতিবাদে বিক্ষোভে ফেটে পড়েছিল বাংলার ছাত্রসমাজ। সব বাধা উপেক্ষা করে মিছিল বের করলে পুলিশের গুলিতে রফিক, সালাম, বরকত, জব্বার ও শফিউরসহ নাম না-জানা অনেকে শহীদ হন। তাদের সেই আত্মত্যাগই পরবর্তীকালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র অর্জনের প্রেরণা জুগিয়েছিল।
শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদ্যাপন উপলক্ষে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে বিস্তারিত কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।
একুশে ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি ভবনসমূহে জাতীয় পতাকা বিধিমালা অনুযায়ী অর্ধনমিত থাকবে। পতাকার সঠিক মাপ ও উত্তোলনের নিয়ম সম্পর্কে সকলকে সচেতন করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ বেতার, সকল বেসরকারি টেলিভিশন/বেতার এবং সকল প্রিন্ট মিডিয়ায় প্রচার করতে হবে। জাতীয় কর্মসূচির সাথে সঙ্গতি রেখে দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্ব-স্ব কর্মসূচি প্রণয়নপূর্বক পালন ও সকল সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, ইউনিয়ন পরিষদসমূহ যথাযোগ্য মর্যাদায় দিবসটি উদ্যাপন করবে।
একুশে ফেব্রুয়ারিতে শহীদ মিনার চত্বর এবং আজিমপুর কবরস্থান এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের পাশাপাশি অতিরিক্ত জনসমাবেশ বা ভিড় নিয়ন্ত্রণ করে অপ্রীতিকর পরিস্থিতি রোধ করার বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। সব সরকারি ও বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল, বাংলাদেশ বেতার এবং কমিউনিটি রেডিওসমূহ কর্তৃক একুশের অনুষ্ঠানমালা প্রচার করবে।
শহীদ দিবস উপলক্ষে ঢাকা শহরের বিভিন্ন সড়ক দ্বীপসমূহ এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থানসমূহে বাংলাসহ দেশের অন্যান্য সকল জাতিগোষ্ঠীর বর্ণমালা সম্বলিত ফেস্টুন দ্বারা সজ্জিত করা হবে। এছাড়া, ভাষা শহিদদের রুহের মাগফেরাতের জন্য দেশের সকল মসজিদ, মন্দির, গির্জা ও অন্যান্য উপাসনালয়ে প্রার্থনার আয়োজন করা হবে। বাংলাদেশ বেতার, বাংলাদেশ টেলিভিশন এবং বেসরকারি বেতার ও টেলিভিশনে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা সম্প্রচার এবং সংবাদপত্রসমূহে বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করবে।
গণযোগাযোগ অধিদফতর ঢাকা মহানগরীতে ট্রাকের মাধ্যমে রাজপথে ভ্রাম্যমাণ সংগীতানুষ্ঠান এবং নৌযানের সাহায্যে ঢাকা শহর সংলগ্ন নৌপথে সঙ্গীতানুষ্ঠানের আয়োজনসহ জেলা-উপজেলায় ভ্রাম্যমাণ চলচ্চিত্র প্রদর্শন করবে। এছাড়া, বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনসমূহে শহিদ দিবস ও আর্ন্তজাতিক মাতৃভাষা দিবস যথাযোগ্য মর্যাদায় উদ্যাপন করা হবে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমি এ উপলক্ষ্যে শিশুদের নিয়ে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, ছড়া ও কবিতা পাঠ এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করবে।
দিবসটি উপলক্ষে বাংলা একাডেমি একুশে বইমেলার আয়োজন করবে। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, গণগ্রন্থাগার অধিদফতর, বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইন্সটিটিউট, বাংলাদেশ শিশু একাডেমি এবং ইসলামিক ফাউন্ডেশনসহ বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থা এ বইমেলায় অংশগ্রহণ করবে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমি মেলা উপলক্ষ্যে বিশেষ শিশু সংখ্যা প্রকাশের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর ও অধীনস্থ শাখা জাদুঘরসমূহ, শিল্পাচার্য জয়নুল লোক ও কারুশিল্প জাদুঘর, বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন এবং প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সকল প্রত্নস্থান ও জাদুঘরসমূহ শিশু-কিশোর, শিক্ষার্থী, বৃদ্ধ ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য ঐদিন বিনা টিকেটে পরিদর্শনের ব্যবস্থা করা হবে। এছাড়া, বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর ও স্বাধীনতা জাদুঘরে প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন, ভাষা আন্দোলনের ওপর বিভিন্ন প্রামাণ্য নিদর্শন প্রদর্শন, ২০২৪ এর গণ-অভ্যুত্থানের গ্রাফিতি অঙ্কন ও প্রদর্শন, শিশু-কিশোরদের সুন্দর বাংলা হাতের লেখা প্রতিযোগিতা এবং সেমিনারের আয়োজন করবে। গণগ্রন্থাগার অধিদফতর বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সরকারি গণগ্রন্থাগারসমূহে রচনা ও চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা এবং ভাষা আন্দোলন বিষয়ক আলোচনা সভার আয়োজন করবে।
এছাড়া দেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো তাদের কর্মসূচি পালন করবে আজ।
RED TIMES LIMITED
116-117, Concord Emporium, Kataban, Dhaka-1205.
Mobile: 017111-66826
Email: redtimesnews@gmail.com
Copyright © 2026 RED TIMES. All rights reserved.