লুৎফর রহমান,
স্বাধীনতা পরবর্তী ৫৫ বছরে দেশের প্রেসিডেন্ট পদে ২২ বার পরিবর্তন হয়েছে। একেক জনের বিদায় হয়েছে একেক ধাঁচের। প্রেসিডেন্ট পদে আসা ব্যক্তিদের বেশির ভাগই ছিলেন রাজনীতিক। দুইজন সামরিক বাহিনী থেকে প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন। এর বাইরে পেশাজীবীও ছিলেন কয়েকজন। কেউ মেয়াদ শেষে স্বাভাবিকভাবে বিদায় নিয়েছেন আবার কেউ বিদায় হয়েছেন অস্বাভাবিকভাবে। হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন দুইজন। এই প্রেসিডেন্ট পদ ঘিরে ঘটেছে নানা ঘটনাও। সর্বশেষ দেশের ২২তম প্রেসিডেন্ট মো. সাহাবুদ্দিন গতকাল পদত্যাগ করেছেন। তিন বছর তিন মাস দায়িত্ব পালন করে তিনি অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে সরে দাঁড়িয়েছেন। তিনি একমাত্র প্রেসিডেন্ট যিনি তিনটি সরকারের মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেন।
নানা আলোচনা-সমালোচনার কেন্দ্রে থাকা প্রেসিডেন্ট সাহাবুদ্দিনের বিদায় ঘিরেও চলছে নানা আলোচনা। বিপুল ভোটে বিজয়ী বিএনপি সরকারের দায়িত্ব নেয়ার পাঁচ মাস পর তিনি বিদায় নিয়েছেন। এর আগে তাকে সরকারের তরফেও সরানোর কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। লন্ডন সফরের সময় ভারতে পালিয়ে যাওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ফোনালাপের জেরে সাহাবুদ্দিনকে সরে যেতে হয়েছে- এমন আলোচনাই আছে বাইরে। এছাড়া আরও কিছু হিসাবও রয়েছে প্রেসিডেন্টের পদত্যাগের পিছনে। বলা হচ্ছে এই সময়ে প্রেসিডেন্টের পদত্যাগের পেছনে বিএনপি’র রাজনৈতিক কৌশলও রয়েছে। আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদী শাসনের শেষ সময়ে সাহাবুদ্দিনকে প্রেসিডেন্ট করা হয়েছিল একটি ব্যবসায়িক গ্রুপের হস্তক্ষেপে। ওই গ্রুপের হস্তক্ষেপে তিনি ইসলামী ব্যাংকের নীতি নির্ধারণী পর্যদেও যুক্ত হয়েছিলেন। দুর্নীতি দমন কমিশনের কমিশনার পদে থাকার সময়ও তার বিরুদ্ধে ছিল এন্তার অভিযোগ। সাহাবুদ্দিনের অতীত নিয়ে বিষদ তদন্তেরও দাবি উঠেছে বিভিন্ন পক্ষ থেকে।
শুক্রবার ( ২৪ জুলাই) বিকালে স্পিকার মেজর অব. হাফিজ উদ্দিন আহমদের কাছে জমা দেয়ার মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে সাহাবুদ্দিনের বঙ্গভবন অধ্যায়। দুই-একদিনের মধ্যেই তিনি বঙ্গভবন ছেড়ে গুলশানের বাসায় উঠছেন বলে জানা গেছে। সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগে সংবিধান অনুযায়ী স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। নিয়ম অনুযায়ী জাতীয় সংসদের আগামী অধিবেশনে পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগ পর্যন্ত হাফিজ উদ্দিনই এই দায়িত্ব পালন করবেন।
স্বাধীনতার পর শুরুতে প্রেসিডেন্ট শাসিত ব্যবস্থায় প্রায় ২০ বছর ছিল দেশ। তখন প্রেসিডেন্টই ছিলেন নির্বাহী ক্ষমতার অধিকারী। ১৯৯১ সাল থেকে দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র চালু হলে প্রেসিডেন্ট পদের ক্ষমতা কমে যায়। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা ঘোষণা করার পর ১৭ই এপ্রিল মুজিবনগর সরকারেরর রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করা হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। তখন তিনি পাকিস্তানে বন্দি। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ১২ই জানুয়ারি সংসদ অধিবেশন বসলে, তিনি প্রেসিডেন্টের অধ্যাদেশের মাধ্যমে সংসদীয় ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন এবং প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের জন্য প্রেসিডেন্ট পদ ত্যাগ করেন। ’৭৫ সালে বাকশাল গঠনের পর তিনি ফের প্রেসিডেন্ট শাসিত ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনেন এবং প্রেসিডেন্ট হন। ওই বছরের ১৫ই আগস্ট ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরের বাড়িতে এক সেনা অভ্যুত্থানে নিহত হন।Executive Branch
শেখ মুজিবুর রহমান প্রথম প্রেসিডেন্ট হলেও তার অবর্তমানে অস্থায়ী প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম। ১৯৭১ সালের ১৭ই এপ্রিল থেকে ’৭২ সালের ১০ই জানুয়ারি পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্ব পালন করেন।
শাসন ব্যবস্থা পরিবর্তন হওয়ায় ১৯৭২ সালের ১২ই জানুয়ারি প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী। স্বাধীনতার আগে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ছিলেন। ১৯৭৩ সালের শেষের দিকে তিনি পদত্যাগ করে মন্ত্রী পদমর্যাদায় বৈদেশিক সম্পর্ক বিষয়ক বিশেষ দূত নিযুক্ত হয়েছিলেন। ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পরে তিনি মোশ্তাক আহমেদের মন্ত্রিসভায় পররাষ্ট্রমন্ত্রীও হয়েছিলেন।

১৯৭৩ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী পদত্যাগ করলে অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট নিযুক্ত হন মোহাম্মদ মোহাম্মদউল্লাহ। তিনি ১৯৭৪ সালের ২৪শে জানুয়ারি অস্থায়ী থেকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে ২৭শে জানুয়ারি শপথ গ্রহণ করেন। ১৯৭৫ সালের ২৫শে জানুয়ারি পর্যন্ত তিনি দায়িত্ব পালন করেন। মেয়াদ পূরণের আগেই তাকে সরে যেতে হয়।
১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের হত্যকাণ্ডের পর ওই সময়ের মন্ত্রিসভার সদস্য খন্দকার মোস্তাক আহমেদকে প্রেসিডেন্ট পদে বসানো হয়।
১৯৭৫ সালের ৬ই নভেম্বর রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহে প্রেসিডেন্ট হন বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম। ১৯৭৭ সালের ২১শে এপ্রিল শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেন। পরবর্তীতে মেজর জিয়াউর রহমান প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরের বছরের ২৩শে জুন নির্বাচনে জিয়া প্রথম সরাসরি নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হন। ১৯৮১ সালের ৩০শে মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে কতিপয় সেনা সদস্যের গুলিতে তিনি শাহাদতবরণ করেন।
এই ঘটনার পর উপ-রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তার সাংবিধানিকভাবে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। ১৯৮২ সালের মার্চ মাসে তৎকালীন সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল এইচ এম এরশাদ একটি রক্তপাতহীন অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা গ্রহণ করেন।
ওই বছরের ২৭শে মার্চ জেনারেল এরশাদ আহসান উদ্দিন চৌধুরীকে প্রেসিডেন্ট পদে অভিষিক্ত করেন। ১৯৮৩ সালের ১১ই ডিসেম্বর এরশাদের চাপে পদত্যাগ করেন আহসান উদ্দিন। সামরিক শাসক এরশাদ নিজেই প্রেসিডেন্ট পদে অধিষ্ঠিত হন। ১৯৯০ সালের মাঝামাঝি নাগাদ এরশাদের স্বৈশাসনবিরোধী আন্দোলন তীব্র হয়। ডিসেম্বরে এরশাদ পদত্যাগ করেন।
তার পদত্যাগের পর প্রধান বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদকে ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট করে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়।
তার নেতৃত্বে নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ১৯৯১ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ওই বছরের ২৩শে জুলাই তিনি দেশের আবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ২০০১ সালের ১৪ই নভেম্বর মেয়াদ শেষে তিনি দায়িত্ব ছাড়েন।
বাংলাদেশে সংসদীয় শাসন ব্যবস্থা চালু হবার পর ১৯৯১ এর ৮ই অক্টোবর প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন আবদুর রহমান বিশ্বাস। ১৯৯৬ সালের ৮ই অক্টোবর মেয়াদ শেষে তিনি দায়িত্ব ছাড়েন।
বিএনপি’র সরকারের সময় ২০০১ সালের ১৪ই নভেম্বর অধ্যাপক ডা. এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। রাজনৈতিক মতবিরোধের কারণে মেয়াদ শেষের আগেই ২০০২ সালের ২১শে জুন তিনি পদত্যাগ করেন। তার পদত্যাগের পর ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার। ওই বছরের ২১শে জুন থেকে ৬ই সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্ব পালন করেন। পরে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন প্রফেসর ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ। তিনি ২০০৬ সালের ২৯শে অক্টোবর প্রেসিডেন্টের দায়িত্বের অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব গ্রহণ করেন।Politics (Right)
২০০৭ সালের ১২ই জানুয়ারি তিনি এই পদ ত্যাগ করেন। আওয়ামী লীগ ক্ষমতা গ্রহণের পর ২০০৯ সালের ১২ই ফেব্রুয়ারি তিনি জিল্লুর রহমানের কাছে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব হস্তান্তর করেন। ২০১৩ সালের ২০শে মার্চ সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হলে পরবর্তী প্রেসিডেন্ট হন তৎকালীন স্পিকার মোহাম্মদ আবদুল হামিদ। তিনি প্রথমে ভারপ্রাপ্ত ও পরে ২০১৩ সালের ২৪শে এপ্রিল থেকে ২০২৩ সালের ২৪শে এপ্রিল পর্যন্ত দুই মেয়াদে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেন। ওই বছরের ২৪শে এপ্রিল থেকে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন। তথ্য সুএঃ মানবজমিন
RED TIMES LIMITED
116-117, Concord Emporium, Kataban, Dhaka-1205.
Mobile: 017111-66826
Email: redtimesnews@gmail.com
Copyright © 2026 RED TIMES. All rights reserved.