অনলাইন ডেস্ক
আওয়ামী লীগের (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) ঝটিকা মিছিল এখন পুলিশ কর্মকর্তারা আতঙ্কে রয়েছেন। কারণ ঊর্ধ্বতনরা ঘোষণা দিয়েছেন, কোনো এলাকায় ঝটিকা মিছিল হলে তার দায় ডিসি-ওসিকে নিতে হবে। ইতিমধ্যে ব্যবস্থা নেওয়াও শুরু হয়েছে। ফলে কোনো এলাকায় কখনো ঝটিকা মিছিল হবে, কাকে শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে, এমন আলোচনা চলছে পুলিশ কর্মকর্তাদের মধ্যে। অনেক কর্মকর্তাই এমন সিদ্ধান্তে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। এমন অস্থিরতার মধ্যে গতকাল বৃহস্পতিবার এসবি প্রধানসহ পুলিশের ১১ কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়েছে।
এদিকে ‘শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে পুলিশ কিছুই করতে পারবে না’—এমন বক্তব্যের একটি অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রাকিবুল হাসানকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।
সম্প্রতি পুলিশের মাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভায় ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ বলেছেন, কোনো এলাকায় আওয়ামী লীগের (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) লোকজন ঝটিকা মিছিল করলে তার দায় ঐ থানার ওসি ও এলাকার ডিসিকে নিতে হবে। কমিশনারের এই বক্তব্যের পর ইতিমধ্যে ব্যবস্থা নেওয়া শুরু হয়েছে। গুলশানে ঝটিকা মিছিল হওয়ায় গুলশাল বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) এম তানভীর আহমেদ ডিএমপি সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে। এর আগে গুলশান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. দাউদ হোসেনকেও প্রত্যাহার করা হয়। যদিও সংযুক্তির আদেশে সরাসরি বিষয়টি উল্লেখ করা হয়নি।
অপরাধ বিশ্লেষক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ কল্যাণ অনুষদের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক ইত্তেফাককে বলেন, ‘রাজনৈতিক বিষয়ে পুলিশের ওপর চাপ সৃষ্টি করা ঠিক না। এমনিতেই পুলিশ এখন পর্যন্ত ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। এই সময় এভাবে পুলিশকে চাপ দিলে ভালো ফল হবে না। পাশাপাশি রাজনৈতিক বিষয় রাজনৈতিকভাবেই মোকাবিলা করা উচিত। সেক্ষেত্রে গোয়েন্দা তথ্য বাড়িয়ে আগে ভাগে পদক্ষেপ নিতে হবে।’
পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ধরপাকড় ও কড়া নজরদারির পরেও ঠেকানো যাচ্ছে না কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের অপতত্পরতা। সুযোগ পেলেই বিভিন্ন জায়গায় ঝটিকা মিছিল বের করছে। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এ নিয়ে একাধিক মিটিং করেছেন। তারপরও ভালো ফল পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে নতুন করে ধরপাকড় শুরু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন পুলিশ কর্মকর্তারা। এই মুহূর্তে শক্তভাবে বিষয়টি তারা দেখতে চান।
পুলিশের সাবেক আইজিপি নুরুল হুদা বলেন, ‘যেহেতু আওয়ামী লীগের কার্যক্রম এখন নিষিদ্ধ, ফলে তাদের কর্মকাণ্ড নিবৃত্ত করার দায়িত্ব পুলিশের। তবে শুধু পুলিশের দিকে তাকিয়ে থাকলে হবে না, এখানে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। গোয়েন্দা তথ্য বাড়াতে হবে। শুধু একটা ঝটিকা মিছিল হয়েছে, এই কারণে কাউকে শাস্তি দেওয়া ঠিক হবে না। এখানে তার গাফিলতি ছিল না বা সহযোগিতা করেছে কি না সেগুলোও দেখতে হবে। আমার মনে হয়, চাপে রাখার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা হয়তো এমন কথা বলছেন।’
কয়েক দিন হলো পুলিশের চেকপোস্ট ও টহল বাড়ানো হয়। এর আগে নিরাপত্তা জোরদার-সংক্রান্ত নির্দেশনা পুলিশের মাঠ প্রশাসনের কাছে গেছে। থাকছে বিশেষ নজরদারি। পুলিশ, ডিবি, সিটিটিসিসহ বিভিন্ন ইউনিটের সদস্যরা নিরাপত্তায় থাকছেন। তারপরও এই ধরনের হুটহাট মিছিলের ঘটনা ভালোভাবে দেখছে না স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। কোনো মিছিল হলেই পুলিশের ঊর্ধ্বতনদের কাছে মন্ত্রণালয় থেকে জানতে চাওয়া হচ্ছে, কেন ঠেকানো যাচ্ছে না এসব মিছিল?
পুলিশের মধ্যম সারির একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘এই ধরনের মিছিল চাইলেই ওসির পক্ষে ঠেকানো সম্ভব না। কারণ কয়েক জন মানুষ একত্রিত হয়ে একটি মিছিল করলে সেটা ঠেকানো যায় না। এর জন্য কারো বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া ঠিক না। আওয়ামী লীগের আমলেও বিএনপি ও জামায়াত অনেক মিছিল করেছে। কিন্তু তার জন্য কোনো ওসি বা ডিসিকে সাসপেন্ড করা হয়নি। এই ধরনের দৃষ্টান্ত স্থাপন করা হলে পুলিশের মনোবল আরো কমবে।’
পুলিশের সাবেক আরেক জন আইজি আশরাফুল হুদা বলেন, ‘কাজটা সঠিকভাবে করার জন্য ঊর্ধ্বতনরা অনেক সময় অধস্তনদের নানাভাবে চাপ দেন। এটাও হয়তো তেমন কিছু। সঠিকভাবে কাজটা করতে গেলে চাপ তো দিতেই হবে। তবে ব্যবস্থা নিতে গেলে দেখতে হবে ঐ মিছিলটি ঠেকানোর ব্যাপারে তার কোনো উদ্যোগ ছিল না। তিনি তার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করছেন কি না। পাশাপাশি গোয়েন্দা তথ্য বাড়াতে হবে, নিয়মিত এসব তথ্য দিয়ে ওসিদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রেখে তাদের উত্সাহ দিতে হবে।’
এসবি প্রধানসহ শীর্ষ পর্যায়ে রদবদল :পুলিশের শীর্ষ ও গুরুত্বপূর্ণ রেঞ্জ পর্যায়ে বড় ধরনের রদবদল করা হয়েছে। অতিরিক্ত আইজিপি ও ডিআইজি পদমর্যাদার ১১ কর্মকর্তাকে বদলি ও নতুন দায়িত্বে পদায়ন করেছে সরকার। এর মধ্যে বিশেষ শাখা (এসবি), পুলিশ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমি, ট্যুরিস্ট পুলিশ, কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতাল এবং ঢাকা ও খুলনা রেঞ্জের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটে নেতৃত্বে পরিবর্তন এসেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পুলিশ-১ শাখা থেকে পৃথক দুটি প্রজ্ঞাপনে এসব আদেশ জারি করা হয়।
রদবদলের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে পুলিশের গোয়েন্দা ইউনিট এসবিতে। পুলিশ অধিদপ্তরের ডিআইজি মো. কামরুল আহসানকে অতিরিক্ত আইজিপি পদে পদোন্নতি দিয়ে এসবির প্রধান করা হয়েছে। এতদিন এসবির অতিরিক্ত আইজিপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করা সরদার নুরুল আমিনকে পুলিশ অধিদপ্তরে পদায়ন করা হয়েছে।
একই সঙ্গে ঢাকা রেঞ্জের নেতৃত্বেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। বর্তমান ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি মো. ইকবাল হোসেনকে অতিরিক্ত আইজিপি পদে পদোন্নতি দিয়ে পুলিশ অধিদপ্তরে নেওয়া হয়েছে। তার স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন খুলনা রেঞ্জের ডিআইজি মো. মোস্তাফিজুর রহমান। আর পুলিশ অধিদপ্তরের ডিআইজি মো. রেজাউল করিমকে খুলনা রেঞ্জের ডিআইজি করা হয়েছে। ফলে দেশের দুই গুরুত্বপূর্ণ রেঞ্জের নেতৃত্বে একই আদেশে পরিবর্তন এলো।
অন্যদিকে কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালের পরিচালক ডিআইজি মো. সায়েদুর রহমানকে অতিরিক্ত আইজিপি পদে পদোন্নতি দিয়ে পুলিশ অধিদপ্তরে পদায়ন করা হয়েছে। অ্যান্টি টেররিজম ইউনিটের ডিআইজি মোহাম্মদ মুসলিমকে কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালের নতুন পরিচালক করা হয়েছে। ট্যুরিস্ট পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি মো. মাইনুল হাসানকে বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমি, সারদার প্রিন্সিপাল এবং সারদার প্রিন্সিপাল জি এম আজিজুর রহমানকে ট্যুরিস্ট পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি করা হয়েছে। এসবির ডিআইজি মীর আশরাফ আলী পেয়েছেন রেলওয়ে পুলিশের দায়িত্ব। আর মেট্রোরেলের ডিআইজি সিদ্দিকী তানজিলুর রহমানকে এসবির ডিআইজি হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে। প্রজ্ঞাপনে পরিবর্তনের কারণ হিসেবে শুধু ‘জনস্বার্থে’ আদেশ জারির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসি প্রত্যাহার :‘শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে পুলিশ কিছুই করতে পারবে না’—এমন বক্তব্যের একটি অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রাকিবুল হাসানকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদের সই করা ঐ আদেশে রাকিবুল হাসানকে ডিএমপির সদর দপ্তর ও প্রশাসন বিভাগের কেন্দ্রীয় সংরক্ষণ দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে। আদেশটি আজ থেকেই কার্যকর হবে। এ বিষয়ে ওসি রাকিবুলের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অডিওটি ছড়িয়ে পড়ে। এতে ওসি পরিচয়ে এক ব্যক্তিকে সরকার, প্রশাসন, সেনাবাহিনী ও পুলিশ বাহিনীর সমালোচনা করতে শোনা যায়। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা এবং ওসি পদায়নে টাকা লেনদেনের অভিযোগও করেন তিনি। অডিওতে ঐ ব্যক্তিকে বলতে শোনা যায়, ‘জানি যে শেখ হাসিনা ডিসেম্বর আসতেছে। কিচ্ছু হবে না আসলে, কিচ্ছু হবে না। আপনারা তো চিন্তা করতে পারছেন, রাস্তার পুলিশ কত দুর্বল। ভয়ানক দুর্বল। আসা উচিত। ডিসেম্বর দেরি হয়ে গেছে। এই মাসে আসা উচিত ছিল। চলে আসলি এই পুলিশ কিচ্ছু করতে পারবে না।’
অডিওতে ঐ পুলিশ কর্মকর্তাকে বলতে শোনা যায়, ‘সিনিয়র অফিসার সব বিএনপি করতেছে। আমরা তো বিএনপি করতেছি না। সব সিনিয়ররা বিএনপি করতেছে, আমরা বিএনপি করতেছি না। এই করার জন্য তো আমরা ডিপার্টমেন্টে আসি নাই। তোমরা খাবা-দাবা, ... নিয়ে থাকবা, আর আমরা এখানে বসে বসে কাজ করব, তা তো হবে না।’ মনির নামে পুলিশের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তার গাড়িচালক থানার ওসি পদায়ন করছেন বলেও বলা হয় ঐ অডিওতে। অডিওতে তাকে বলতে শোনা যায়, ‘এগুলো সহ্য করা যায়? আর কী বলব? যারা পেস্টিং পাইতেছে তার (মনির) কাছে টাকা দিচ্ছে, সকালবেলা পেস্টিং হইতেছে।’
ঐ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে উদ্দেশ করে অডিওর বক্তা বলেন, তার লজ্জা থাকা উচিত। তার চাকরি ছিল না। এখন যে পদে আছেন, সেখানে এক বছর থাকতে পারলে ১০০ কোটি টাকা এমনিতেই হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি। ওসি পদায়ন নিয়ে অডিওতে ঐ ব্যক্তিকে আরো বলতে শোনা যায়, ‘আওয়ামী লীগের (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) কমিশনার যারা ছিল, তারা ওসি পেস্টিংয়ে টাকা নেয় নাই। যত ওসি বেনজীরের আমলে ছিল, টাকায় কোনো সময় বদলি হয় নাই।’ এখানে তিনি সাবেক আইজিপি ও ডিএমপি কমিশনার বেনজীর আহমেদের প্রসঙ্গ উল্লেখ করেন। অডিওতে এই পুলিশ কর্মকর্তাকে আরো বলতে শোনা যায়, ‘ডিএমপি, ঢাকা, বাংলাদেশের রাজধানী, ক্যাপিটাল সিটি। এখানকার ওসিরা টাকা দিতে যাবে কেন? এখানে ওসিরা এমনিই যাবে। তোমাদের কাজ করে নিয়ে তোমরা টাকা উঠিয়ে নিবা।’
ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কীভাবে কাজ করে দিয়েছেন, সেই অভিজ্ঞতার বিষয়ে ওসি রাকিবুলকে বলতে শোনা যায়, ‘আমি ভাটারায় একটা কাজ করে দিছি এক স্যারকে। স্যার ১ কোটি টাকা নিছে। আমি তো জানতাম না।... (অস্পষ্ট কথা) আমার সঙ্গে শুধু সম্পর্কটা আছে। এই হলো অবস্থা! এইভাবে চাকরি করা যাবে নাকি? অযোগ্য লোকগুলোরে কোন জায়গা ঢোকায় (পদায়ন দেয়) আর যোগ্য লোকগুলোকে চিপা-চাপায় রাখছে।’সুএ: ইত্তেফাক
RED TIMES LIMITED
116-117, Concord Emporium, Kataban, Dhaka-1205.
Mobile: 017111-66826
Email: redtimesnews@gmail.com
Copyright © 2026 RED TIMES. All rights reserved.