প্রিন্ট এর তারিখঃ অক্টোবর ১৭, ২০২৬, ৩:৪৮ এ.এম || প্রকাশের তারিখঃ অক্টোবর ১৭, ২০২৬, ১:১১ পূর্বাহ্ণ

লেখক: লায়ন উজ্জল কান্তি বড়ুয়া
শরতের নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা, ভোরের শিশিরভেজা ঘাসে শিউলির শুভ্রতা আর বাতাসে কাশফুলের মৃদু দোল। প্রকৃতির এই অপরূপ সাজ বাঙালির হৃদয়ে জাগিয়ে তোলে এক অনির্বচনীয় আনন্দের আবেশ। শারদীয় দুর্গাপূজা কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি বাঙালির ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, আবেগ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক অনন্য প্রকাশ। ঢাকের বাদ্য, শঙ্খধ্বনি, ধূপের সুবাস আর মণ্ডপে মণ্ডপে দেবী দুর্গার আগমন বাঙালির চিরচেনা উৎসবের আবহকে প্রাণবন্ত করে তোলে। শরতের প্রকৃতি যেমন তার সৌন্দর্যে মানুষকে মুগ্ধ করে, তেমনি দুর্গোৎসব মানুষের মনে জাগিয়ে তোলে শুভবোধ, সাহস, ভালোবাসা ও অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর প্রেরণা।
সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাসে দেবী দুর্গা শক্তি, সাহস ও কল্যাণের প্রতীক। মহিষাসুরের বিরুদ্ধে দেবীর বিজয় পৌরাণিক কাহিনির গণ্ডি অতিক্রম করে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে মানুষের চিরন্তন আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটায়। অন্যায়, অত্যাচার, অহংকার ও অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভশক্তির বিজয়ই দুর্গোৎসবের অন্যতম প্রধান তাৎপর্য। আজকের সমাজেও এই প্রতীকী বার্তা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। যখন চারদিকে হিংসা, বিদ্বেষ, দুর্নীতি, বৈষম্য ও অসহিষ্ণুতার বিস্তার ঘটে, তখন দুর্গোৎসব আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, অন্ধকার যত গভীরই হোক, শুভবোধের আলো নিভে যেতে দেওয়া যায় না। শক্তির প্রকৃত পরিচয় অন্যকে দমনে নয়, বরং দুর্বলকে রক্ষা করা, অন্যায়ের প্রতিবাদ করা এবং মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মধ্যেই নিহিত।
বাংলার দুর্গাপূজার ইতিহাস ও ঐতিহ্য বহু প্রাচীন। সময়ের পরিক্রমায় এই পূজা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি বাঙালির সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। পূজার আগে থেকেই শুরু হয় ঘরে ঘরে প্রস্তুতি, নতুন পোশাক কেনার আনন্দ, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে মিলিত হওয়ার পরিকল্পনা এবং প্রিয়জনদের সঙ্গে উৎসব ভাগ করে নেওয়ার অপেক্ষা। প্রবাসে থাকা সন্তান বাড়ি ফেরে, দূরে থাকা আত্মীয়ের সঙ্গে দেখা হয়, পুরোনো বন্ধুত্বে নতুন প্রাণ সঞ্চারিত হয়। মণ্ডপে মণ্ডপে প্রতিমার নান্দনিকতা, আলোকসজ্জা ও শিল্পকর্মের মধ্য দিয়ে ফুটে ওঠে মানুষের সৃজনশীলতা। এই উৎসবের আনন্দ তাই কোনো একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা ছড়িয়ে পড়ে সমাজের নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে। ধর্মীয় পরিচয় ভিন্ন হলেও আনন্দের ভাষা যে অভিন্ন, দুর্গোৎসব তারই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
বাংলাদেশের মাটি আবহমানকাল থেকেই বহুধর্ম, বহুজাতি ও বহুসংস্কৃতির মানুষের সহাবস্থানের সাক্ষ্য বহন করে আসছে। এ দেশের বৌদ্ধ, হিন্দু, মুসলিম, খ্রিষ্টানসহ বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষ পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহযোগিতা এবং সামাজিক বন্ধনের মধ্য দিয়ে যুগে যুগে জীবনযাপন করেছেন। এক সম্প্রদায়ের উৎসবে অন্য সম্প্রদায়ের মানুষের অংশগ্রহণ, শুভেচ্ছা বিনিময় এবং আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার ঐতিহ্য আমাদের সামাজিক জীবনের এক মূল্যবান সম্পদ। দুর্গাপূজার আনন্দে প্রতিবেশীর অংশগ্রহণ কিংবা ঈদ, বুদ্ধপূর্ণিমা ও বড়দিনের শুভক্ষণে পরস্পরের প্রতি শুভকামনা জ্ঞাপন প্রমাণ করে, মানবিক সম্পর্কের বন্ধন ধর্মীয় পরিচয়ের সীমানা অতিক্রম করতে পারে। ধর্ম যার যার, উৎসবের আনন্দ ও মানবিক সম্প্রীতি সবার, এই বোধকে আমাদের সামাজিক জীবনে আরও গভীরভাবে প্রতিষ্ঠিত করা প্রয়োজন।
তবে সম্প্রীতির এই সৌন্দর্যকে অটুট রাখতে হলে শুধু উৎসবের সময়ে শুভেচ্ছা বিনিময় যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সারা বছর পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা ও দায়িত্বশীল আচরণের চর্চা। ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে বিদ্বেষ ছড়ানো, গুজব প্রচার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানিমূলক বক্তব্য কিংবা কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি অবমাননাকর আচরণ সমাজের শান্তি ও স্থিতিশীলতাকে বিপন্ন করে। বিশেষ করে উৎসবকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে তার প্রভাব শুধু সংশ্লিষ্ট সম্প্রদায়ের ওপর পড়ে না, সামগ্রিকভাবে দেশের সামাজিক বন্ধনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই দুর্গোৎসবের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, পূজামণ্ডপের সার্বিক সুরক্ষা, নারী ও শিশুদের নিরাপদ চলাচল, যানজট নিয়ন্ত্রণ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় প্রশাসনের পাশাপাশি সাধারণ নাগরিকদেরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। একই সঙ্গে গুজব ও সাম্প্রদায়িক উসকানি প্রতিরোধে সচেতনতা এবং দ্রুত, নিরপেক্ষ ও কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি।
উৎসবের আনন্দের পাশাপাশি আমাদের দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন সমাজের সেইসব মানুষের প্রতিও, যাঁদের জীবনে আনন্দের আয়োজন সীমিত। দারিদ্র্য, অসুস্থতা, অসহায়ত্ব কিংবা পারিবারিক সংকটের কারণে অনেক মানুষই উৎসবের আনন্দ থেকে দূরে থাকেন। তাঁদের মুখে হাসি ফোটাতে পারলেই উৎসবের মানবিক তাৎপর্য পূর্ণতা পায়। অসচ্ছল পরিবারের পাশে দাঁড়ানো, পথশিশুদের জন্য নতুন পোশাকের ব্যবস্থা করা, অসুস্থ ও প্রবীণ মানুষের খোঁজ নেওয়া কিংবা ক্ষুধার্ত মানুষের হাতে খাবার তুলে দেওয়া হতে পারে দুর্গোৎসবের অন্যতম মহৎ আয়োজন। দেবীর আরাধনা তখনই সত্যিকার অর্থে মানবিক হয়ে ওঠে, যখন মানুষের প্রতি ভালোবাসা, মমতা ও দায়িত্ববোধ আমাদের দৈনন্দিন আচরণে প্রতিফলিত হয়। প্রতিমার সামনে প্রদীপ জ্বালানোর পাশাপাশি যদি মানুষের জীবনের অন্ধকার দূর করার চেষ্টা করা যায়, তবে সেই আলোর তাৎপর্য অনেক গভীর হয়।
দুর্গোৎসবের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নারীর শক্তি ও মর্যাদার স্বীকৃতি। দেবী দুর্গা শক্তির প্রতীক হিসেবে পূজিত হলেও বাস্তব সমাজে নারীর প্রতি সহিংসতা, বৈষম্য, অবমাননা ও নিরাপত্তাহীনতা এখনো নানা রূপে বিদ্যমান। পূজামণ্ডপে নারীশক্তির বন্দনা আর বাস্তব জীবনে নারীর অধিকার উপেক্ষা করা পরস্পরবিরোধী। দেবীর আরাধনার প্রকৃত শিক্ষা হবে নারীর প্রতি সম্মান প্রদর্শন, তাঁর স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও নেতৃত্বের ক্ষেত্রে সমান সুযোগ সৃষ্টি করা। কন্যাশিশুর স্বপ্নকে সম্মান জানানো, নারীর মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া এবং সহিংসতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়াই শক্তির আরাধনাকে জীবনের বাস্তবতায় প্রতিষ্ঠিত করার পথ।
বর্তমান সময়ে দুর্গোৎসবের আয়োজন আরও বর্ণিল ও আধুনিক হয়ে উঠেছে। প্রতিমা নির্মাণ, মণ্ডপসজ্জা, আলোকায়ন ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সৃজনশীলতার নতুন নতুন প্রকাশ ঘটছে। তবে এই জাঁকজমকের পাশাপাশি পরিবেশের প্রতিও দায়িত্বশীল থাকা জরুরি। শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ, প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো, জলাশয় ও পরিবেশের ক্ষতি রোধ, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং প্রতিমা বিসর্জনে পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে উৎসবকে আরও সুন্দর ও দায়িত্বশীল করে তোলা সম্ভব। উৎসবের সৌন্দর্য শুধু আলোকসজ্জায় নয়, প্রকৃতি ও মানুষের প্রতি আমাদের যত্নশীল আচরণেও প্রকাশিত হয়।
আমাদের মনে রাখতে হবে, কোনো সমাজের প্রকৃত উন্নতি শুধু অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি কিংবা অবকাঠামোগত অগ্রগতির মাধ্যমে পরিমাপ করা যায় না। সমাজ কতটা মানবিক, কতটা সহনশীল এবং ভিন্ন বিশ্বাসের মানুষের মর্যাদা ও নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত করতে পারে, তার ওপরও সভ্যতার মান নির্ভর করে। একজন মানুষ তাঁর ধর্মীয় পরিচয়, বিশ্বাস কিংবা সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য নিয়ে নিরাপদে বাঁচতে পারবেন, নিজের ধর্ম পালন করতে পারবেন এবং সমান নাগরিক মর্যাদা ভোগ করবেন, এটাই একটি গণতান্ত্রিক ও মানবিক রাষ্ট্রের মৌলিক প্রত্যাশা। বাংলাদেশের সংবিধানও ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সমানাধিকারের যে আদর্শ ধারণ করে, তার বাস্তব প্রতিফলন ঘটাতে হবে রাষ্ট্রীয় নীতি, সামাজিক আচরণ এবং ব্যক্তিগত বিবেকের প্রতিটি স্তরে।
শারদীয় দুর্গোৎসব আমাদের সামনে সেই মানবিক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় নতুন করে তুলে ধরুক, যেখানে ধর্মের কারণে কেউ ভীত বা অবহেলিত হবেন না, ভিন্নমত ও ভিন্ন বিশ্বাসের কারণে কেউ বিদ্বেষের শিকার হবেন না, আর উৎসবের আনন্দ থেকে কেউ নিজেকে বিচ্ছিন্ন মনে করবেন না। যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠতার শক্তি সংখ্যালঘুর নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষায় সহায়ক হবে, যেখানে প্রতিবেশীর বিপদে প্রতিবেশী এগিয়ে আসবেন এবং মানুষের পরিচয়ের ঊর্ধ্বে মানবিক পরিচয়ই সর্বাধিক গুরুত্ব পাবে।
শরতের শিউলি ঝরা ভোরে দেবী দুর্গার আগমন আমাদের হৃদয়ে জাগিয়ে তুলুক শুভবোধের নতুন আলো। অসত্যের বিরুদ্ধে সত্য, অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়, ঘৃণার বিরুদ্ধে ভালোবাসা এবং বিভেদের বিরুদ্ধে সম্প্রীতির জয় হোক। দুর্গোৎসবের আনন্দ ছড়িয়ে পড়ুক ঘরে ঘরে, মানুষের হৃদয়ে হৃদয়ে। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের গণ্ডি পেরিয়ে এই উৎসব হয়ে উঠুক মানবিকতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সামাজিক সংহতির এক উজ্জ্বল উপলক্ষ।
শুভ শারদীয় দুর্গোৎসব। সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ হোক বাংলাদেশ, মানবতার আলোয় আলোকিত হোক প্রতিটি মানুষের জীবন।
লেখক পরিচিতি: কলাম লেখক ও প্রাবন্ধিক।