অনলাইন ডেস্ক:
ধর্মভিত্তিক পাকিস্তান রাষ্ট্র ভেঙে ভাষাভিত্তিক বাংলাদেশ সৃষ্টির জন্য শেখ মুজিবুর রহমানকে আপনি অপছন্দ করতে পারেন, কোনো কারণ ছাড়াই তার রাজনৈতিক দর্শনের বিরোধী হতে পারেন, স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে বাংলাদেশে দুর্ভিক্ষ, দুর্নীতি ও রক্ষীবাহিনীর অত্যাচারের জন্য আপনি তাকে দায়ী করতে পারেন, একদলীয় বাকশাল প্রতিষ্ঠার কারণে তার কট্টর সমালোচনাও করতে পারেন—কিন্তু শত চেষ্টাতেও বাংলাদেশের ইতিহাস থেকে তাকে মুছে ফেলতে পারবেন না। বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ের ইতিহাসের পরতে পরতে রয়েছে শেখ মুজিবুর রহমানের পদচিহ্ন।
আজ ১৭ মার্চ, শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিন। আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন থাকার সময় দিনটি ছিল সরকারি ছুটির দিন, এ দিন আওয়ামী লীগের উদ্যোগে আয়োজন করা হতো নানান অনুষ্ঠান। কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতায় চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ আজ ছন্নছাড়া। বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে নেই কোনো রাষ্ট্রীয় ও দলীয় আয়োজন। তাই আসুন, একটু ভিন্ন দৃষ্টিতে ফিরে তাকানো যাক শেখ মুজিবুর রহমানের কীর্তি ও রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের দিকে।
রাজনীতি কোনো সরল রেখা নয়, রাজনীতি অত্যন্ত জটিল, কূটিল ও নিষ্ঠুর বাস্তবতার সাক্ষ্য বহন করে। তাই রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে আলোচনা বা বিশ্লেষণ কোনো চূড়ান্ত সমাধান টেনে দেয় না, কাউকে স্থায়ীভাবে মহিমান্বিত বা প্রত্যাখ্যানও করে না। তবে রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে চর্চা ও আলোচনার প্রয়োজন আছে, যার অন্যতম সূত্র হতে পারে সংবাদপত্র।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ১৯৭০ সালের নির্বাচন ছিল একটি যুগান্তকারী সন্ধিক্ষণ। এটি ছিল পাকিস্তানের প্রথম কোনো জাতীয় নির্বাচন। যে নির্বাচনে শাসকগোষ্ঠীকে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে চূড়ান্তভাবে প্রত্যাখ্যান করেছিল বাঙালি জাতি, যা প্রতিফলিত হয়েছিল সংবাদপত্রে। আসুন, একটু ইতিহাসের পাতা উল্টে দেখা যাক ১৯৭০ সালের নির্বাচনে শেখ মুজিবকে।

১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক এই নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানে শেখ মুজিবুর রহমানের আওয়ামী লীগ নৌকা প্রতীকে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেছিল। পাকিস্তানের জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদে একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে আওয়ামী লীগ। পূর্ব পাকিস্তানে জাতীয় পরিষদের ১৬২টি আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ পায় ১৬০টি। সঙ্গে সংরক্ষিত ৭টি আসন যোগ করলে আসন সংখ্যা দাঁড়ায় ১৬৭টিতে। আর প্রাদেশিক পরিষদের ৩০০ আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ জয় পায় ২৮৮টিতে, যাকে নির্বাচনি ভাষায় বলা হয় ভূমিধস বিজয়। জাতীয় পরিষদে শেখ মুজিবুর রহমানের আওয়ামী লীগ ভোট পেয়েছিল ৭৫.১১ শতাংশ, আর প্রাদেশিক পরিষদে ৭০.৪৫ শতাংশ। এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন, এল.এফ.ও. (লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক অর্ডার)-এর ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচন দুই দফায় অনুষ্ঠিত হয়েছিল—১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর ও ১৯৭১ সালের ১৭ জানুয়ারি। ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতে বিধ্বস্ত হওয়ায় উপকূলীয় ৯টি আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় দফায়।
৯ ডিসেম্বর ১৯৭০ দৈনিক পাকিস্তান (স্বাধীনতার পর যে পত্রিকাটি হয়ে যায় দৈনিক বাংলা) শেখ মুজিবুর রহমানের আওয়ামী লীগের সাফল্য নিয়ে ৮ কলামে প্রধান শিরোনাম করেছিল নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা, যাতে বলা হয়, পূর্ব পাকিস্তানে জাতীয় পরিষদের ১৫৩টি আসনে আওয়ামী লীগ ১৫১টি আসন দখল করেছে, অর্থাৎ শতকরা ৯৮.৬টি আসনে জয়লাভ করেছে। এনই-৮৩ নং আসনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী জনাব রফিকুন্দিন ভূইয়া পিডিপি প্রধান জনাব নূরুল আমীনের কাছে পরাজয় বরণ করেছেন। এছাড়া এনই-১৬২ নং আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী এবং প্রাক্তন এমপি-এ রাজা ত্রিদিব রায় আওয়ামী লীগ প্রার্থী চারু বিকাশ চাকমা থেকে ২৫ হাজারেরও বেশি ভোটে এগিয়ে আছেন। এই আসনের চূড়ান্ত ফলাফল গতরাতেও পাওয়া যায়নি। ভোটের ব্যবধান দেখে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর বিজয়ের কোনো সম্ভাবনা নেই বলেই মনে হচ্ছে।

১৫৩টি আসনের মধ্যে ১৫১টি আসন দখলের ফলে আওয়ামী লীগ ৩১৩ সদস্যবিশিষ্ট জাতীয় পরিষদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেছে বলা যায়। কারণ পূর্ব পাকিস্তানে যে ৭টি মহিলা আসন রয়েছে, সেই ৭টি আসনই এখন আওয়ামী লীগের মুঠোর মধ্যে এসে গেছে। কারণ পুরুষ সদস্যদের ভোটে মহিলা সদস্যরা নির্বাচিত হবেন। তাছাড়া প্রদেশের যে ৯টি আসনে নির্বাচন স্থগিত রাখা হয়েছে, আওয়ামী লীগ সেগুলোও দখল করবে। কারণ দলের পুরো শক্তি তারা এ এলাকায় নিয়োগ করবে এবং অন্যান্য আসনে বিপুল বিজয়ের প্রতিক্রিয়ায় ওই এলাকার ভোটাররাও স্বভাবতই প্রভাবিত হবে।
সুতরাং জাতীয় পরিষদে আওয়ামী লীগ মোট ১৬৭টি আসনের অধিকারী হবে বলে আশা করা যায়। নির্বাচনের পূর্ববর্তী দিনে শেখ মুজিবুর রহমান এক সাক্ষাৎকারে এই আশা প্রকাশ করেছিলেন যে, তার দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তার দল নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতাই পেল, যা দলের অনেকেই আশা করেননি। (দৈনিক পাকিস্তান, ৯ ডিসেম্বর ১৯৭০, প্রধান সংবাদের খণ্ডিতাংশ)

প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭১ সালের ১৭ জানুয়ারি। যে নির্বাচনেও একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় শেখ মুজিবুর রহমানের আওয়ামী লীগ। ৩০০ আসনের এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পায় ২৮৭টি আসন। ১৯ জানুয়ারি ১৯৭১ দৈনিক পাকিস্তানে প্রকাশিত প্রধান সংবাদের শিরোনাম ছিল আওয়ামী লীগ ২৬৮। যে সংবাদের বিস্তারিত লেখা হয়—প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনেও পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ আওয়ামী লীগকে একচেটিয়া বিজয়ের গৌরব দান করেছে। রাজনৈতিক দল হিসেবে একমাত্র আওয়ামী লীগ ছাড়া আর কোনো দলই পরিষদে পার্লামেন্টারি দল তো দূরের কথা, গ্রুপ করার মতো সদস্যও পায়নি।
গত বৃহস্পতিবারের নির্বাচনে ২৭৯টি আসনের মধ্যে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ২৭৫টি আসনের খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ পেয়েছে ২৬৬টি আসন, পিডিপি ২টি, ন্যাপ (ওয়ালী), নেজামে ইসলাম ও জামাতে ইসলামী একটি করে আর স্বতন্ত্র প্রার্থীরা চারটি আসন পেয়েছেন।
এছাড়া বাকি ৪টি আসনের মধ্যে রাত বারটায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত আওয়ামী লীগ ২টি আসনে এবং অন্যান্যরা দুটিতে অগ্রগামী ছিল। অবশ্য এর দুটিতেই আওয়ামী লীগের জয় প্রায় অবশ্যম্ভাবী। (দৈনিক পাকিস্তান, ১৯ ডিসেম্বর ১৯৭০, প্রধান সংবাদের খণ্ডিতাংশ)
১৯৭০-১৯৭১ সালের এই নির্বাচন বাংলাদেশের গতিপথ ঠিক করে দেয়। যে নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি আস্থা রেখেছিলেন বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষ। আর নির্বাচিত হওয়ার পরই শেখ মুজিবুর রহমান শুরু করেছিলেন ৬-দফাভিত্তিক স্বায়ত্তশাসন অর্জনের অভিযান, যা নিয়ে শুরু থেকেই ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয় পাঞ্জাবি অভিজাতরা। উল্লেখ করা প্রয়োজন, ১৯ ডিসেম্বরই শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষণা দেন—শাসনতন্ত্র হতে হবে ছয় দফাভিত্তিক। যা নিয়ে পরের দিন ব্যানার হেডলাইন করে দৈনিক পাকিস্তান। যে খবরে শেখ মুজিবুর রহমানের বরাতে বলা হয়—আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমান গতকাল শনিবার বলেন যে, ছয় দফা ব্যতীত অন্য কোনো কিছুর ভিত্তিতে শাসনতন্ত্র প্রণীত হতে পারে না।
এক বিবৃতিতে তিনি জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অভূতপূর্ব বিজয়ের জন্য সর্বশক্তিমান আল্লাহ এবং ছাত্র-শ্রমিক-কৃষকসহ দেশের জনগণের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। শেখ মুজিবুর রহমান জনগণের সক্রিয় সমর্থন ও সহযোগিতায় সম্ভাব্য সবকিছু করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি বলেন, আমাদের ৬ দফা কর্মসূচি সম্পর্কে এক ঐতিহাসিক রায় দেওয়ার জন্য আমি জনগণকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি। (দৈনিক পাকিস্তান, ২০ ডিসেম্বর ১৯৭০, প্রধান সংবাদের খণ্ডিতাংশ)

এই ছিল সংবাদপত্রের দিনপঞ্জি অনুযায়ী ১৯৭০ সালের নির্বাচনের শেখ মুজিবুর রহমান ও আওয়ামী লীগের সাফল্যের চিত্র। সে সময় জনগণ মানুষের মুক্তির উপায় হিসেবে বুলেটের মুখে শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে ঐতিহাসিক রায় দিয়েছিলেন। যদিও শেখ মুজিবুর রহমানই ১৯৭৫ সালে বাকশাল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মানুষের নেতা নির্বাচনের অধিকার কেড়ে নিয়েছিলেন। হয়তো তারই ঐতিহাসিক পরিক্রমায় শেখ হাসিনাও এক সময় মানুষকে ভোট দিতে দেননি। এ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অদ্ভুত প্রহেলিকা।
তথ্য সুএঃ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর
RED TIMES LIMITED
116-117, Concord Emporium, Kataban, Dhaka-1205.
Mobile: 017111-66826
Email: redtimesnews@gmail.com
Copyright © 2026 RED TIMES. All rights reserved.