স্পোর্টস ডেস্ক
দক্ষিণ আমেরিকা ও বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা, বিপরীতে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন স্পেন। দুই মহাদেশীয় চ্যাম্পিয়নের মুখোমুখি হওয়ার কথা ছিল ফিনালিসিমায়। কিন্তু নানা জটিলতায় দুই বছরেও সেই ম্যাচ আয়োজন করা যায়নি। তবে ফুটবল-বিধাতা তাদের এক করতে যাচ্ছে ২০২৬ বিশ্বকাপে।
আজ রোববার (১৯ জুলাই) দিবাগত রাত ১টায় নিউজার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে লড়বে লিওনেল মেসি ও লামিনে ইয়ামালের দল।
আর্জেন্টিনা নিজেদের জার্সিতে চতুর্থ তারকা যোগ করার লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নামবে, আর স্পেনের লক্ষ্য দ্বিতীয় বিশ্বকাপ শিরোপা। মহারণী এই ম্যাচে বেশ কিছু বিষয় শিরোপা নির্ধারণে ভূমিকা রাখতে পারে। যেখানে মেসির সঙ্গে স্পেনের রক্ষণ ও বার্সেলোনায় তার উত্তরসূরী ইয়ামালের দ্বৈরথ, মাঝমাঠে ডি পল-পারেদেসদের সঙ্গে রদ্রি-রুইজদের বল দখল এবং দুই কোচের বিপরীতমুখী ট্যাকটিকসের মতো বিষয় নজরে থাকবে।
বিশ্বকাপের শিরোপা জয়ে প্রভাবক ৫টি বিষয়
ব্যক্তিগত দ্বৈরথ
রক্ষণ আর আক্রমণভাগে উভয় দলই ব্যক্তিগত কিছু দ্বৈরথ উপহার দেবে। লামিনে ইয়ামাল যেমন ডান প্রান্ত ধরে স্পেনের আক্রমণে নেতৃত্ব দেবেন, তেমটি তাকে ঠেকাতে আর্জেন্টিনার বাঁ-প্রান্তে প্রস্তুত থাকবেন ডিফেন্ডার নিকোলাস তাগলিয়াফিকো। যা হতে পারে ম্যাচের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লড়াই। চোট কাটিয়ে ধীরে ধীরে নিজের সেরা ছন্দে ফিরছেন ইয়ামাল। তাই তাকে সামলানোর বড় দায়িত্ব থাকবে তাগলিয়াফিকোর ওপর।
অন্যদিকে, স্পেনের সেন্টার-ব্যাক আইমেরিক লাপোর্তে ও পাউ কুবারসিকে থামানোর চেষ্টা করতে হবে লিওনেল মেসিকে। তবে কাজটি সহজ হবে না, কারণ প্রতিপক্ষের নজর এড়াতে মেসি এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি নিচে নেমে এসে আক্রমণ সাজিয়ে তুলছেন। আবার স্পেনের হয়ে আসরের সর্বোচ্চ গোলদাতা (৫) মিকেল ওয়ারজাবালকে ঠেকানোর দায়িত্ব থাকবে আর্জেন্টিনার দুই শক্তিশালী সেন্টার-ব্যাক ক্রিস্টিয়ান রোমেরো ও লিসান্দ্রো মার্টিনেজের।

লা ফুয়েন্তে বনাম স্কালোনি
আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনিকে বলা হয় স্প্যানিশ কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের শিষ্য। তার অধীনে ডিফেন্ডিং বিশ্বকাপজয়ী কোচ স্কালোনি স্পেনে কোচিংয়ের কোর্স করেছেন। তবে তারা লালন করেন সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি ফুটবল দর্শন।
পুরো বিশ্বকাপজুড়ে স্পেন বলের নিয়ন্ত্রণ, উচ্চ পর্যায়ের প্রেসিং এবং প্রতিপক্ষের ওপর লাগাতার চাপ সৃষ্টি করে খেলেছে। এখন পর্যন্ত চলতি আসরে তারা মাত্র একটি গোল হজম করেছে। ওই দর্শনেই সেমিফাইনালে ফ্রান্সকে যেভাবে তারা কার্যত নিষ্ক্রিয় করে দিয়েছিল, সেখানে কিলিয়ান এমবাপে, উসমান দেম্বেলে ও মাইকেল ওলিসেরা গোলের সুযোগই প্রায় পাননি।
অন্যদিকে, আর্জেন্টিনার শক্তি দ্রুতগতির আক্রমণ, সরাসরি ফুটবল এবং প্রতিকূল পরিস্থিতি থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর মানসিকতা। এই টুর্নামেন্টে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি গোল করেছে স্কালোনির দল, যদিও তারা সাতটি গোল হজমও করেছে। ফাইনালে ওঠার পথে আর্জেন্টিনা খেলেছে দুটি অতিরিক্ত সময়ের ম্যাচ এবং নকআউটের প্রায় প্রতি ম্যাচেই লিখেছে নাটকীয় প্রত্যাবর্তনের গল্প। কঠিন মুহূর্তে জয়ের পথ বের করে আনার আত্মবিশ্বাসই তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি।

মেসির জাদুর বিপরীতে স্পেনের দৃঢ় রক্ষণ
নিজের সম্ভাব্য শেষ বিশ্বকাপে যেন আরও বেশি নিখুঁত মেসি। প্রায় ম্যাচেই তিনি আর্জেন্টিনার ত্রাণকর্তা রূপে হাজির হয়েই ক্ষান্ত হননি, বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বকালের সেরা হওয়ার দৌড়ও চালিয়ে যাচ্ছেন (গতকাল তাকে ছাড়িয়েছেন এমবাপে)। গোল করার পাশাপাশি এখন তিনি আর্জেন্টিনার সুযোগ তৈরি করা প্রধান মুখ। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনালে দুই গোলেই ছিল তার অ্যাসিস্ট, আর শেষ ষোলোতে মিশরের বিপক্ষে প্রত্যাবর্তনেও রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। মোট অ্যাসিস্ট ৪টি।
স্পেনের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে মেসিকে জায়গা না দেওয়া। স্পেনের ঘন রক্ষণ ও দ্রুত প্রেসিং এমনভাবেই সাজানো, যাতে মেসি যেসব ছোট ছোট ফাঁকা জায়গায় খেলা তৈরি করতে পছন্দ করেন, সেগুলো বন্ধ করে দেওয়া যায়। আবার, আর্জেন্টিনা চাইবে স্পেনকে আরও ওপরে উঠে প্রেস করতে বাধ্য করতে, যাতে পেছনের ফাঁকা জায়গা কাজে লাগিয়ে দ্রুতগতির ফরোয়ার্ড ও উইঙ্গাররা আক্রমণে যেতে পারেন।
মাঝমাঠের কঠিন লড়াই
আর্জেন্টিনা-স্পেন ফাইনালের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধগুলোর একটি হবে মাঝমাঠে। স্পেনের রদ্রিগো হার্নান্দেজের দায়িত্ব থাকবে এনজো ফার্নান্দেজ ও অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে। প্রতিপক্ষের আক্রমণ নষ্টের পাশাপাশি দ্রুত বলের দখল ফেরানো এবং আক্রমণ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে রদ্রি স্পেনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়দের একজন।
এনজো ফার্নান্দেজ আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগে বল ছাড়া দৌড়ে সবচেয়ে কার্যকর ফুটবলার। মেসি যখন নিচে নেমে আসেন, তখন তৈরি হওয়া জায়গাগুলো কাজে লাগান তিনি। অন্যদিকে, ম্যাক অ্যালিস্টার গোল করার সামর্থ্যের পাশাপাশি মাঝমাঠে ভারসাম্য এনে দেন। তাদের সঙ্গে রয়েছেন রদ্রিগো ডি পল ও লিয়েন্দ্রো পারেদেস, যারা শারীরিক শক্তি ও লড়াকু মানসিকতা দিয়ে দলকে এগিয়ে রাখেন। তাদের বিপরীতে স্পেনের রদ্রি ও ফ্যাবিয়ান রুইজরা ভরসা রাখেন নিখুঁত পাসিং ও বল নিয়ন্ত্রণের ওপর।

দুই প্রজন্মের ঝাণ্ডাধারী মেসি-ইয়ামাল
লামিনে ইয়ামালকে শিশু অবস্থায় কোলে নিয়ে মেসির একটি ছবি বেশ কয়েক বছর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছিল। সেই দুই প্রজন্ম ফুটবলের সবচেয়ে বড় ম্যাচে সাক্ষাৎ করতে যাচ্ছে আজ। ৩৯ বছর বয়সী মেসি প্রথমবার আন্তর্জাতিক ফুটবলে মুখোমুখি হবেন ১৯ বছর বয়সী ইয়ামালের।
অনেকের মতে, স্পেন জিতলে সেটি হবে ফুটবলের নেতৃত্ব এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে হস্তান্তরের প্রতীকি চিত্র। চোটের কারণে টুর্নামেন্টের শুরুটা কঠিন ছিল ইয়ামালের। গ্রুপ পর্বে করেছিলেন মাত্র একটি গোল। তবে নকআউট পর্বে ধীরে ধীরে নিজের সেরা ছন্দে ফিরেছেন তিনি। সেমিফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে পেনাল্টি আদায় করে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেন এবং স্পেনের সবচেয়ে বিপজ্জনক আক্রমণভাগের অস্ত্র হয়ে ওঠেন। স্পেন শিরোপা জিতলে মেসির কাছ থেকে ইয়ামালের নতুন নেতৃত্ব হস্তগত করার বিষয় স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
RED TIMES LIMITED
116-117, Concord Emporium, Kataban, Dhaka-1205.
Mobile: 017111-66826
Email: redtimesnews@gmail.com
Copyright © 2026 RED TIMES. All rights reserved.