অনলাইন ডেস্ক:
বাংলাদেশের রাষ্ট্রকাঠামোয় পরিবর্তনের লক্ষ্যে সংবিধান সংস্কার কমিশন দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা প্রবর্তনের প্রস্তাব করেছে। জুলাই বিপ্লবোত্তর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ‘জুলাই সনদ’-এর আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে এই মডেলটি আনা হয়েছে, যার মূল উদ্দেশ্য হলো এককক্ষবিশিষ্ট সংসদের ‘সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বৈরাচার’ রোধ করা। কমিশনের খসড়া প্রস্তাব অনুযায়ী, আগামী দিনে বাংলাদেশের আইনসভা হবে দুই স্তরের— ‘উচ্চকক্ষ’ (সিনেট) এবং অন্যটি হবে বর্তমানে বিদ্যমান ‘নিম্নকক্ষ’ (জাতীয় সংসদ)। তবে এই প্রস্তাবটি নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, সংসদের মোট আসন সংখ্যা হবে ৫০৫টি। নিম্নকক্ষে আসন থাকবে ৪০০টি। বর্তমান জাতীয় সংসদের আদলেই হবে এই নিম্নকক্ষ। এর মধ্যে ৩০০টি আসনে প্রচলিত ‘ফার্স্ট-পাস্ট-দ্য-পোস্ট’ (সরাসরি ভোট) পদ্ধতিতে নির্বাচন হবে। বাকি ১০০টি আসন নারীদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে, তবে তারা সারা দেশের নির্দিষ্ট ১০০টি নির্বাচনি এলাকা থেকে কেবল নারী প্রার্থীদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাধ্যমে সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হবেন।
সংসদের উচ্চকক্ষটি হবে তুলনামূলক ছোট। এর ১০৫ জন সদস্যের মধ্যে ১০০ জন নির্বাচিত হবেন সংসদে অংশ নেওয়া দলগুলোর প্রাপ্ত আসনের আনুপাতিক হারে। বাকি ৫টি আসনে রাষ্ট্রপতি দেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, বিজ্ঞানী বা বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিদের মধ্য থেকে সদস্য মনোনীত করবেন।
উচ্চকক্ষ প্রধানত নিম্নকক্ষ থেকে পাস হওয়া বিলগুলোকে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করবে। এটি একটি ‘দ্বিতীয় চিন্তার’ সুযোগ তৈরি করবে, যা তড়িঘড়ি করে জনস্বার্থবিরোধী আইন পাস হওয়া রোধে বাধা বা দেওয়াল হিসেবে কাজ করবে।
বিশেষজ্ঞ, বিজ্ঞানী ও শিক্ষাবিদদের সমন্বয়ে গঠিত এই কক্ষ আইন প্রণয়নে বিশেষজ্ঞ মতামত দেবে। সাংবিধানিক সংশোধনী বা গুরুত্বপূর্ণ আইনের ক্ষেত্রে উচ্চকক্ষের বিশেষ ক্ষমতা থাকবে। যদিও উচ্চকক্ষ সরকারের ওপর অনাস্থা আনতে পারবে না, তবে তারা সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারবে।এছাড়া উচ্চকক্ষে আঞ্চলিক প্রতিনিধিত্বের মাধ্যমে জাতীয় রাজনীতিতে প্রান্তিক কণ্ঠস্বর তুলে ধরার সুযোগ থাকবে। কোনও বিলে দুই কক্ষের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিলে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের বিধান রাখা হয়েছে।
সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত নিম্নকক্ষ বা ‘জাতীয় সংসদ’ রাষ্ট্রের চালিকাশক্তি। দেশের বাজেট এবং অর্থ সংক্রান্ত সব বিল পাসের একচ্ছত্র ক্ষমতা নিম্নকক্ষের হাতেই থাকবে। তবে অর্থবিল ছাড়া অন্য যেকোনও বিল পাসের ক্ষেত্রে দুই কক্ষের সমন্বয় প্রয়োজন হবে। বিল প্রথমে নিম্নকক্ষে আলোচনার পর স্থায়ী কমিটিতে যাবে, সেখান থেকে পাস হলে উচ্চকক্ষে পাঠানো হবে। উচ্চকক্ষ দুই মাসের মধ্যে বিলে সম্মতি বা সংশোধনী না দিলে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনুমোদিত বলে গণ্য হতে পারে। সবশেষে রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের মাধ্যমে বিলটি আইনে পরিণত হবে।
বিশ্লেষকরা এই ব্যবস্থার কিছু চ্যালেঞ্জও তুলে ধরেছেন। দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদের জন্য নতুন ভবন, প্রশাসনিক কাঠামো এবং ১০৫ জন নতুন সদস্যের বেতন-ভাতা বাবদ রাষ্ট্রের ওপর বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি হবে। দুই কক্ষের পর্যালোচনার কারণে জরুরি প্রয়োজনে দ্রুত আইন পাস করার প্রক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে। উচ্চকক্ষ বা সিনেট শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিকভাবে পরাজিত বা দলের অনুগত ব্যক্তিদের ‘পুনর্বাসন কেন্দ্র’ হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার আশঙ্কা করছেন অনেকে।
সংস্কার কমিশনের মতে, এই ব্যবস্থা জাতীয় রাজনীতিতে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করবে এবং কোনও একক দলের স্বেচ্ছাচারিতার সুযোগ বন্ধ করবে। উভয় কক্ষের মেয়াদকাল হবে চার বছর। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির গণভোটে জনগণের রায় পেলে এই রূপরেখাটি চূড়ান্তভাবে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হবে।
কমিশন মনে করছে, এটি দেশের সংসদীয় গণতন্ত্রে একটি গুণগত পরিবর্তন আনবে।
তথ্য সুএঃ বাংলা ট্রিবিউন
RED TIMES LIMITED
116-117, Concord Emporium, Kataban, Dhaka-1205.
Mobile: 017111-66826
Email: redtimesnews@gmail.com
Copyright © 2026 RED TIMES. All rights reserved.