অনলাইন ডেস্ক
দেশে হামের প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় স্বাস্থ্য খাতের নাজুক পরিস্থিতি আবারও সামনে এসেছে। দেশব্যাপী শিশুদের নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ার উপক্রম হয়েছে, যা শিশুদের জন্য হামসহ অন্যান্য ভয়াবহ রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
দেশে টিকা কার্যক্রমের বাস্তব চিত্র এবং সরকারের উচ্চপর্যায়ের বক্তব্যে দেখা যাচ্ছে চরম বৈপরীত্য। দেশে সরকারিভাবে প্রান্তিক পর্যায় পর্যন্ত টিকা সরবরাহের দায়িত্বে থাকা ‘সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি’ (ইপিআই)-এর কর্মকর্তারা বলছেন, হামের প্রকোপ হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় রুটিন টিকাদান কর্মসূচির জন্য সংরক্ষিত দুই কোটি ডোজ টিকা বর্তমানে ছয় থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের দেওয়া হচ্ছে। আগামী দুই মাসের মধ্যে নতুন করে টিকা সংগ্রহ করা সম্ভব না হলে নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হবে।
বর্তমানে দেশে ইপিআই-এর মাধ্যমে নয়টি টিকার সাহায্যে ১২টি রোগ প্রতিরোধ করা হয়। শিশুদের জন্য নির্ধারিত সাতটি টিকার মধ্যে রয়েছে যক্ষ্মা প্রতিরোধে বিসিজি, পাঁচটি রোগ (ডিপথেরিয়া, হুপিংকাশি, ধনুষ্টংকার, হেপাটাইটিস-বি ও ইনফ্লুয়েঞ্জা) রুখতে পেন্টা, নিউমোনিয়ার জন্য পিসিভি, পোলিও নির্মূলে ওপিভি ও আইপিভি, টাইফয়েডের জন্য টিসিভি এবং হাম ও রুবেলা সুরক্ষায় এমআর টিকা। এছাড়া, কিশোরীদের জরায়ুমুখ ক্যানসার প্রতিরোধে এইচপিভি এবং ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী নারীদের ধনুষ্টংকার ও ডিপথেরিয়া সুরক্ষায় টিডি টিকা দেওয়া হয়।
ইপিআই-এর তথ্য অনুযায়ী, শিশুদের জন্য নির্ধারিত সাতটি টিকার মধ্যে আইপিভি ও টিসিভি ছাড়া বাকি পাঁচটি টিকার মজুত কেন্দ্রীয় গুদামে বর্তমানে শূন্য। এই তালিকায় রয়েছে যক্ষ্মা প্রতিরোধের বিসিজি, নিউমোনিয়ার পিসিভি, হাম-রুবেলার এমআর এবং পাঁচটি রোগ প্রতিরোধের পেন্টা টিকা।
এ বিষয়ে ইপিআই-এর সহকারী পরিচালক ডা. হাসানুল মাহমুদ বলেন, কেন্দ্রীয়ভাবে মজুত না থাকলেও মাঠপর্যায়ে কিছু টিকা রয়েছে। সরকার ইতোমধ্যে ৬০৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে এবং দ্রুততম সময়ে টিকা ক্রয়ের প্রক্রিয়া চলছে।
‘এটা চাইলাম আর কিনে নিলাম, তা তো নয়। একটু সময় প্রয়োজন। এসব টিকার কিছু কিছু মাঠপর্যায়ে আছে, কিন্তু আমাদের সেন্ট্রালে নেই।’
তিনি আরও বলেন, কেন্দ্রীয়ভাবে সরবরাহ না আসা পর্যন্ত কোনো এলাকায় টিকার ঘাটতি থাকলে শিশুরা তা পরে নিতে পারবে; এতে বড় কোনো সমস্যা হবে না এবং টিকা আসা মাত্রই পুনরায় রুটিন অনুযায়ী তা প্রদান করা হবে।
এদিকে, গতকাল রাজধানীর বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে এক অনুষ্ঠান শেষে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন গণমাধ্যমকে জানান, দেশে সব ধরনের টিকার পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে এবং আগামী ছয় মাস টিকাদানে কোনো সমস্যা হবে না। যক্ষ্মাসহ অন্যান্য টিকার কোনো সংকট নেই বলেও তিনি দাবি করেন।
এ সময় সাংবাদিকরা ইপিআই-এর তথ্যের বরাত দিয়ে টিকার ঘাটতি নিয়ে প্রশ্ন করলে তিনি তা নাকচ করে দেন এবং সেই তথ্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইপিআই-এর এক কর্মকর্তা আক্ষেপ করে বলেন, আমাদের নিয়মিত টিকা কার্যক্রম সর্বদা চলমান ছিল। যারা বলছেন গত বছর টিকা কার্যক্রম বন্ধ ছিল, তারা যদি তাদের আত্মীয়-স্বজনদের (যাদের বাচ্চা আছে) কাছে খোঁজ নেন, তাহলে জানতে পারবেন তারা তাদের বাচ্চাদের টিকা প্রদান করেছেন কি না। রুটিন টিকা কার্যক্রম আমাদের কখনওই বন্ধ হয়নি।
‘আমরা প্রতি তিন মাস অন্তর প্রতিটি সিভিল সার্জন অফিসে টিকা পৌঁছে দিই। বর্তমানে আমাদের কয়েকটি টিকা স্টক আউট (মজুত শেষ) হয়ে গেছে। আশা করি সরকার যেভাবে পদক্ষেপ নিচ্ছে, শিগগিরই আমরা এ সমস্যা উত্তরণ করতে পারব। তবে, আমাদের কাছে না থাকলেও কিছু কিছু স্থানে (মাঠপর্যায়ে) এ টিকা রয়েছে, যা শিশুদের দেওয়া হচ্ছে।’
হঠাৎ কেন টিকার ঘাটতি পড়ল— এ বিষয়ে জানতে চাইলে এই কর্মকর্তা বলেন, ‘বিগত সময়ে টিকা ক্রয় করা হতো অপারেশন প্ল্যান (ওপি)-এর মাধ্যমে। কিন্তু ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ওপি বন্ধ করে দেওয়ায় টিকা ক্রয়ে বাধাগ্রস্ত হয় অর্থছাড়ের কারণে। মূলত ওপি বন্ধ হওয়ায় আরও কিছু কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে টিকার ঘাটতি পড়ে যায়।’
এ বিষয়ে জনস্বাস্থ্য ও টিকা বিশেষজ্ঞ ডা. তাজুল ইসলাম বারী বলেন, ইপিআইতে কখনোই হামের টিকার ঘাটতি ছিল না। বর্তমানে হামের প্রাদুর্ভাবের ফলে সরকার যে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচিতে টিকা দিচ্ছে, এ টিকা গত বছর সেপ্টেম্বর মাসে ইপিআইতে চলে এসেছে ইউনিসেফের মাধ্যমে। এ টিকা গত বছরের ডিসেম্বরেই দেশের ৫৮টি জেলায় ৯ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী ও ৬টি জেলায় ৯ মাস থেকে ১৫ বছর পর্যন্ত শিশুদের টিকা দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু রাজনৈতিক পরিস্থিতি, স্বাস্থ্য সহকারী ও পোর্টারদের আন্দোলনের কারণে তখন টিকা দেওয়া সম্ভব হয়নি। এ টিকাই আগামী জুনে দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু হামের প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধি পাওয়ায় সরকার এখন সেগুলো ব্যবহার করছে।
এ বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, হামের টিকার ঘাটতি না থাকলেও গত বছর থেকে ইপিআই কর্তৃক দেওয়া অন্যান্য সব টিকার ঘাটতি দেখা দেয়। এটার পেছনে মূল কারণ ছিল সমন্বয়হীনতা। বর্তমানে হাম ছাড়া সব টিকারই ঘাটতি রয়েছে। কোনো কোনো টিকা কেন্দ্রীয় ভান্ডার থেকে শুরু করে মাঠপর্যায়ে মোটেও নেই। সরকারের উচিৎ টিকা নিয়ে ভুল তথ্য না দিয়ে বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে সমাধানের পথ খোঁজা। তথ্য সুএঃ ঢাকা পোস্ট
RED TIMES LIMITED
116-117, Concord Emporium, Kataban, Dhaka-1205.
Mobile: 017111-66826
Email: redtimesnews@gmail.com
Copyright © 2026 RED TIMES. All rights reserved.