অনলাইন ডেস্ক
কুষ্টিয়ার শিলাইদহ রবীন্দ্র কুঠিবাড়ি—কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত এক অনন্য ঐতিহ্য। এই কুঠিবাড়িতেও কবির দীর্ঘ সময় কেটেছে, জন্ম নিয়েছে বাংলা সাহিত্যের অসংখ্য অমূল্য সৃষ্টি। নান্দনিক স্থাপত্য, শান্ত পরিবেশ আর ইতিহাসের গভীর ছাপ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা শিলাইদহ কুঠিবাড়ি আজও বহন করে রবীন্দ্র ভাবনার আবেশ।
সাহিত্য, ইতিহাস ও সংস্কৃতির ছোঁয়া একসঙ্গে পেতে কুষ্টিয়ার শিলাইদহ রবীন্দ্র কুঠিবাড়ি ভ্রমণপিপাসুদের জন্য নিঃসন্দেহে এক বিশেষ আকর্ষণ।
কুঠিবাড়ির ইতিহাস
রবীন্দ্র কুঠিবাড়ির ইতিহাস উনিশ শতকের শুরুতে ঠাকুর পরিবারের জমিদারি ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। ১৮০৭ সালে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পিতামহ প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর এই জমিদারি সম্পত্তির মালিকানা গ্রহণ করেন। প্রথমদিকে এটি নীলকুঠি ও প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হলেও পরবর্তীতে এখানে যে দালানটি নির্মিত হয়, সেটিই আজকের কুঠিবাড়ি। ঔপনিবেশিক স্থাপত্যরীতিতে নির্মিত এই ভবনটি পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আবাস ও কর্মস্থল হিসেবে পরিচিতি পায়।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কেন শিলাইদহে এসেছিলেন
১৮৮৯ সালের নভেম্বরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রথম শিলাইদহে আসেন ঠাকুর পরিবারের জমিদারি তদারকির দায়িত্ব নিয়ে। সে সময় জমিদারি পরিচালনা ছিল তার একটি প্রধান কর্তব্য। তবে শিলাইদহে অবস্থানের পেছনে কেবল জমিদারি দায়িত্বই নয়, এখানকার প্রকৃতি, নদীবেষ্টিত পরিবেশ এবং গ্রামীণ জীবন কবিকে গভীরভাবে আকর্ষণ করেছিল। অনেকে মনে করেন, কলকাতার শহুরে ব্যস্ততা থেকে দূরে এই শান্ত পরিবেশে কবি চিন্তা ও সৃষ্টির জন্য অনুকূল আবহ খুঁজে পেয়েছিলেন।
কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৮৯ সাল থেকে প্রায় ১৯০১ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময় শিলাইদহে অবস্থান করেছেন। এক দশকের বেশি সময়ে কখনো কয়েক মাস, কখনো দীর্ঘ সময় ধরে কবি এই কুঠিবাড়িতে থেকেছেন। কবির সাহিত্যিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্ব এই সময়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
কুঠিবাড়িতে কবির রচিত সাহিত্যকর্ম
কুঠিবাড়িটি কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্যচর্চার একটি উর্বর ক্ষেত্র। এখানে অবস্থানকালে তিনি ‘সোনার তরী’, ‘চিত্রা’, ‘চৈতালি’, ‘কথা ও কাহিনী’, ‘নৈবেদ্য’ ও ‘খেয়া’ কাব্যগ্রন্থের উল্লেখযোগ্য অংশ রচনা করেন। কবির বহু গান ও কবিতা এই সময়েই লেখা। বিশেষ করে ১৯১২ সালে তিনি এখানেই ‘গীতাঞ্জলি’র ইংরেজি অনুবাদের কাজ শুরু করেন, যা পরবর্তীতে কবিকে নোবেল পুরস্কার এনে দেয়।

কুঠিবাড়ির স্থাপত্য ও পরিবেশ
কুঠিবাড়িটি প্রায় ১১ একর জমির ওপর অবস্থিত। তিনতলা বিশিষ্ট এই ভবনে রয়েছে ১৮টি কক্ষ, প্রশস্ত বারান্দা ও একটি বড় কেন্দ্রীয় হলঘর। ভবনের চারপাশে রয়েছে সুপরিকল্পিত ও সুসজ্জিত বাগান, ফলের গাছ ও পুকুর। ঔপনিবেশিক স্থাপত্যশৈলীর সঙ্গে গ্রামীণ পরিবেশের একটি স্বাভাবিক সংমিশ্রণ এখানে দেখা যায়।
কুঠিবাড়ির চারপাশের পরিবেশ অত্যন্ত শান্ত ও সবুজে ঘেরা। একসময় প্রমত্তা পদ্মা নদী কুঠিবাড়ির একেবারে কাছ দিয়ে প্রবাহিত হতো। যদিও নদীর গতিপথ পরিবর্তনের ফলে এখন নদী কিছুটা দূরে সরে গেছে, তবু নদীবেষ্টিত আবহ এখনো স্পষ্ট। বিস্তীর্ণ খোলা মাঠ, পুকুর, গাছগাছালি ও পাখির কলরব মিলিয়ে পরিবেশটি আজও স্বস্তিদায়ক। শুধু তাই নয়, এটি যেকোনো ভ্রমণপিপাসু মানুষকে আকৃষ্ট করবে।
বর্তমানে কুঠিবাড়িটি রবীন্দ্র স্মৃতি জাদুঘর হিসেবে সংরক্ষিত। এখানে রবীন্দ্রনাথের ব্যবহৃত আসবাবপত্র, পোশাক, আলোকচিত্র, চিত্রকর্ম, চিঠিপত্রের প্রতিলিপি ও দৈনন্দিন ব্যবহারের নানা সামগ্রী প্রদর্শিত হচ্ছে।
বিশেষ করে কবি ভবনে ব্যবহার্য জিনিসপত্রগুলোর মধ্যে চঞ্চলা ও চপলা নামে দুটো স্পিডবোট, পল্টুন, ৮ বেহারার পালকি রয়েছে। পাশাপাশি কবির জীবন ও সাহিত্যকর্ম নিয়ে তথ্যভিত্তিক প্রদর্শনীও রয়েছে। এই জাদুঘর দর্শনার্থীদের জন্য কবির জীবনকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ করে দেয়।

টিকিট ও সময়সূচি
দর্শনার্থীদের প্রবেশের জন্য কুঠিবাড়ির প্রধান ফটকের পাশেই রয়েছে টিকিট কাউন্টার। জনপ্রতি টিকিটের মূল্য ২০ টাকা। তবে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য কোনো টিকিটের প্রয়োজন নেই। শিক্ষার্থী ও শিশু-কিশোরদের জন্য প্রবেশমূল্য রাখা হয়েছে মাত্র ৫ টাকা। সার্কভুক্ত বিদেশি দর্শনার্থীদের জন্য টিকিটের মূল্য ৫০ টাকা এবং অন্যান্য বিদেশি পর্যটকদের জন্য টিকিটের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১০০ টাকা।
কুঠিবাড়ির দর্শন সময়সূচি মৌসুমভেদে ভিন্ন। গ্রীষ্মকালে সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত খোলা থাকে, মাঝে দুপুর ১টা থেকে ১টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত নামাজ ও বিশ্রামের জন্য বন্ধ থাকে। শীতকালে সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকে, এ সময়ও দুপুর ১টা থেকে ১টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত বন্ধ রাখা হয়। এছাড়া শুক্রবার জুমার নামাজের জন্য সাড়ে ১২টা থেকে ৩টা পর্যন্ত বন্ধ থাকে। প্রতি সপ্তাহের রোববার এবং সরকারি বিশেষ দিবসে কুঠিবাড়ি সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য বন্ধ থাকে।

যেভাবে যাবেন
শিলাইদহ রবীন্দ্র কুঠিবাড়ি কুষ্টিয়া শহর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে, কুমারখালী উপজেলার শিলাইদহ গ্রামে অবস্থিত। ঢাকা থেকে বাস বা ট্রেনে দুইভাবেই কুষ্টিয়া যাওয়া যায়। এরপর কুষ্টিয়া থেকে সড়কপথে সহজেই কুঠিবাড়িতে যাওয়া যায়। কুষ্টিয়া শহর থেকে স্থানীয় পরিবহনে প্রায় ৩০–৪০ মিনিট সময় ব্যয় করে জনপ্রতি ৫০ টাকা ভাড়ায় যাওয়া যায় কুঠিবাড়িতে।
কুষ্টিয়ায় কোনো পাঁচ তারকা মানের হোটেল নেই। তবে মোটামুটি মানের বেশ কয়েকটি আবাসিক হোটেল রয়েছে। এগুলো হলো—হোটেল রিভারভিউ, ফেয়ার রেস্ট হাউস, হোটেল গোল্ডস্টার, হোটেল আজমিরী, হোটেল পদ্মা ইত্যাদি। এসব হোটেলে ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকায় রাত্রিযাপন করা যায়। এ ছাড়া, কুঠিবাড়িতেই রয়েছে সরকারি গেস্ট হাউস।

স্থানীয় খাবারের স্বাদ
কুষ্টিয়া শহর ও আশপাশের এলাকায় স্থানীয় খাবারের ভালো ব্যবস্থা রয়েছে। সাধারণ ভাত-মাছের পাশাপাশি কুষ্টিয়ার মিষ্টান্ন, তিলের খাজা, কুলফি স্থানীয়ভাবে বেশ জনপ্রিয়। শহরের হোটেল ও রেস্তোরাঁগুলোতে সহজেই খাবারের ব্যবস্থা পাওয়া যায়। তথ্য সুএঃ দ্যা ডেইলি স্টার
RED TIMES LIMITED
116-117, Concord Emporium, Kataban, Dhaka-1205.
Mobile: 017111-66826
Email: redtimesnews@gmail.com
Copyright © 2026 RED TIMES. All rights reserved.