মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলায় চলন্ত ট্রেনের ছাদ থেকে পড়ে দুই দিনে দুই যুবকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। পৃথক দুটি ঘটনায় আরও ৩ জন গুরুত্বর আহত হয়েছেন। উপজেলার উত্তরসুর এলাকায় দ্বারিকাপাল মহিলা ডিগ্রি কলেজ সংলগ্ন রেললাইনের পাশে এসব দুর্ঘটনা ঘটে। ঈদযাত্রাকে সামনে রেখে যখন ট্রেনের ছাদে ভ্রমণ ঠেকাতে কঠোর অবস্থানের কথা বলছে বাংলাদেশ রেলওয়ে, ঠিক তখনই পরপর দুটি প্রাণহানির ঘটনায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে।
রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, শনিবার (৬ জুন) বিকেল প্রায় ৩টায় ঢাকাগামী আন্তঃনগর জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস ট্রেনের ছাদ থেকে পড়ে গুরুতর আহত হন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার এনামুল মিয়া ফাহিম (২৫) ও মো. সিয়াম (১৮)। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস ও রেলওয়ে পুলিশ তাঁদের উদ্ধার করে শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে ফাহিমের শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে, তাকে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে তিনি মৃত্যু বরণ করেন। সিয়াম বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
এর একদিন পর রবিবার (৭ জুন) বিকেল ৩টা ১০ মিনিটে একই স্থানে চট্টগ্রামগামী আন্তঃনগর পাহাড়িকা এক্সপ্রেস ট্রেনের ছাদ থেকে পড়ে অজ্ঞাতপরিচয় ( ৩৫) নামে এক যুবক ঘটনাস্থলেই নিহত হন। একই ঘটনায় সামছু মিয়া (৩০) নামে আরও ১ জন আহত হন। তাদের বাড়ি রংপুর জেলায় বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্র জানায়, গতকাল রবিবার আহত সামছু মিয়াকে হাসপাতালে এনে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। অপরদিকে ৬ জুন শনিবার আহত দুইজনের মধ্যে এনামুল মিয়া ফাহিমকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রেফার করা হলে পরে তার ও মৃত্যু হয়েছে।
শ্রীমঙ্গল রেলওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জাহাঙ্গীর আলম আজ সোমবার সকালে সর্বশেষ আপডেটে জানান, নিহত দুই ব্যক্তির ঘটনায় পৃথক অপমৃত্যু মামলা দায়ের হয়েছে। জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস থেকে পড়ে মৃত্যুর ঘটনায় মামলা নং-১৭, তারিখ ০৬/০৬/২০২৬ এবং গতকাল রবিবার পাহাড়িকা এক্সপ্রেস থেকে পড়ে মৃত্যুর ঘটনায় মামলা নং-১৮, তারিখ ০৭/০৬/২০২৬ রুজু করা হয়েছে। নিহতদের মরদেহ মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালের মর্গে রয়েছে এবং ময়নাতদন্ত প্রক্রিয়া চলমান।
তিনি আরও জানান, পাহাড়িকা এক্সপ্রেস থেকে পড়ে নিহত অজ্ঞাত যুবকের পরিচয় শনাক্তে পিবিআই মৌলভীবাজারকে অবহিত করা হয়েছে।পিবিআই মৌলভীবাজার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন এবং পরিচয় নিশ্চিত করার কাজ চলছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ট্রেনের ছাদে বসে ভ্রমণের গাছের ডাল ধাক্কা লেগে বা অসাবধানতা বশত তারা নিচে পড়ে যান।
এ বিষয়ে শ্রীমঙ্গল রেলওয়ে স্টেশনের স্টেশন মাস্টার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, “দুই দিনে একই স্থানে জয়ন্তিকা ও পাহাড়িকা এক্সপ্রেস ট্রেনের ছাদ থেকে পড়ে ২ জন যাত্রীর মৃত্যু অত্যন্ত দুঃখজনক। যাত্রীদের বারবার সতর্ক করা হলেও কিছু মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ট্রেনের ছাদে ভ্রমণ করেন। এমন ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা থেকে সবাইকে বিরত থাকতে হবে।”
এদিকে ঈদযাত্রাকে সামনে রেখে ট্রেনের ছাদে ভ্রমণ ঠেকাতে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। রেলপথ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, স্টেশনগুলোতে তিন স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা, অতিরিক্ত নজরদারি এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টহল জোরদার করা হয়েছে।
তবে শ্রীমঙ্গলের এই মর্মান্তিক ঘটনাগুলোর পর জনমনে প্রশ্ন উঠেছে—এত নিরাপত্তা ব্যবস্থার পরও কীভাবে যাত্রীরা ট্রেনের ছাদে উঠে দীর্ঘ পথ ভ্রমণ করতে পারছেন? নিরাপত্তা ব্যবস্থার কোথায় ঘাটতি রয়েছে, তা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে।
সম্প্রতি নরসিংদীর ঘোড়াশালে আন্তঃনগর উপকূল এক্সপ্রেস ট্রেনের ছাদে ভ্রমণের সময় বজ্রপাতে সজীব সরকার (৪০) নামে এক যাত্রীর মৃত্যুর ঘটনাও দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। গত ২৪ মে বিকেল প্রায় ৫টার দিকে ঘোড়াশাল ফ্ল্যাগ স্টেশন সংলগ্ন এলাকায় ওই দুর্ঘটনা ঘটে।
রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ আবারও যাত্রীদের ট্রেনের ছাদে ভ্রমণ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রেনের ছাদে ভ্রমণকারীরা গাছের ডাল, সেতু, বৈদ্যুতিক তার, বজ্রপাত কিংবা হঠাৎ ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যাওয়ার মতো প্রাণঘাতী ঝুঁকির মুখে থাকেন। শ্রীমঙ্গলে পরপর ২ দিনের এই দুই মৃত্যু যেন আবারও মনে করিয়ে দিল—ট্রেনের ছাদে যাত্রা মানেই মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়া।