হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলার ৭ নম্বর ভাদেশ্বর ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী বড়গাঁও গ্রামে ভক্তি ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে ৩ দিনব্যাপী অষ্টপ্রহর হরিনাম সংকীর্তন মহোৎসব সম্পন্ন হয়েছে। ‘কলিহত জীবের দুঃখ মোচন ও শান্তি অর্জনের একমাত্র উপায় হরিনাম সংকীর্তন’—এই সনাতন শাস্ত্রীয় বাণীকে হৃদয়ে ধারণ করে গত ৪ থেকে ৬ জুন পর্যন্ত এই উৎসবের আয়োজন করা হয়।
পরমারাধ্য পিতৃদেব স্বর্গীয় শ্রী পবিত্র দেব ও বংশীয় পূর্বপুরুষদের বিদেহী আত্মার চিরশান্তি, বিশ্বশান্তি এবং দেশ ও মানবজাতির কল্যাণ কামনায় প্রবাসী পলাশ দেব ও বেলা রানী দেবের সার্বিক তত্ত্বাবধানে এই পুণ্যময় উৎসবের আয়োজন করা হয়।
উৎসবের দিনপঞ্জি অনুযায়ী, গত ২০শে জ্যৈষ্ঠ (৪ জুন) বৃহস্পতিবার বিকালের শুভ লগ্নে শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা পাঠের মধ্য দিয়ে এই উৎসবের সূচনা হয়। মৌলভীবাজারের ভুজবল (আজমেরু) থেকে আগত পাঠক শ্রীযুক্ত দিলীপ গোস্বামী গীতা পাঠ করেন। এরপর রাতে যথানিয়মে মঙ্গলঘট স্থাপন এবং সুনামগঞ্জের দিরাইয়ের কীর্তনীয়া শ্রীযুক্ত মুক্তপদ তালুকদারের সুমধুর কণ্ঠে হরিনাম সংকীর্তন মহোৎসবের শুভ অধিবাস পরিবেশিত হয়। পরদিন ২১শে জ্যৈষ্ঠ (৫ জুন) শুক্রবার ব্রাহ্মমুহূর্ত থেকেই শুরু হয় পরম কাঙ্ক্ষিত অষ্টপ্রহরব্যাপী শ্রীশ্রী হরিনাম সংকীর্তন মহোৎসব।
‘হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ
কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে
হরেরাম হরেরাম
রাম রাম হরেহরে
উপরোক্ত মহামন্ত্রের সুমধুর ধ্বনিতে পুরো বড়গাঁও গ্রাম ও আশেপাশের এলাকা এক অলৌকিক ও স্বর্গীয় আবেশে মুখরিত হয়ে ওঠে। উৎসবের শেষ দিন ২২শে জ্যৈষ্ঠ (৬ জুন) শনিবার পুণ্য ঊষালগ্নে নাম সংকীর্তন সমাপনান্তে দধিভান্ড ভঞ্জন, প্রসাদ বিতরণ ও মোহন্ত বিদায়ের মধ্য দিয়ে ৩ দিনব্যাপী এই আধ্যাত্মিক মহোৎসবের সাঙ্গ হয়।
মহোৎসবের দিনগুলোতে স্থানীয় ভক্তবৃন্দের পাশাপাশি দূর-দূরান্ত থেকে আসা শতশত সনাতন ধর্মাবলম্বী ও দর্শনার্থীর স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতিতে অনুষ্ঠানস্থল এক মিলনমেলায় পরিণত হয়। উৎসবজুড়ে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক ভক্তের মাঝে মহাপ্রসাদ বিতরণ করা হয়। এবারের আয়োজনে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা প্রখ্যাত কীর্তন দলসমূহ নামসুধা বিতরণ করে ভক্তদের হৃদয়ে ভক্তির রসধারা বইয়ে দেয়। এর মধ্যে পটুয়াখালীর শ্যাম অনুরাগ সম্প্রদায়, কিশোরগঞ্জের নিত্যনন্দ সম্প্রদায়, সিলেটের নব নিত্যানন্দ সম্প্রদায় এবং মৌলভীবাজারের রাজনগরের আশ্রম সম্প্রদায় তাদের চমৎকার কীর্তন পরিবেশন করেন।
আয়োজকেরা জানান, পিতৃদেব ও পূর্বপুরুষদের আত্মার শান্তি কামনার পাশাপাশি কলিযুগে জীবের দুঃখ-দুর্দশা মোচন, বিশ্বকল্যাণ এবং শ্রীমন মহাপ্রভুর অশেষ কৃপায় লাভ করাই ছিল এই আয়োজনের মূল বাসনা। একই সঙ্গে ধর্মীয় মূল্যবোধ, সামাজিক সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ববোধ জাগ্রত রাখাও এই আয়োজনের অন্যতম উদ্দেশ্য। সকলের স্বতঃস্ফূর্ত সহযোগিতা ও শ্রীশ্রী রাধাকৃষ্ণের কৃপায় পুরো মহোৎসবটি অত্যন্ত সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে সম্পন্ন হওয়ায় আয়োজকদের পক্ষ থেকে গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়েছে।