বিদ্যালয়ের প্রাত্যহিক কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো শারীরিক শিক্ষা (পিটি), প্যারেড এবং সকালের সমাবেশ। কিন্তু প্রায়ই দেখা যায়, দীর্ঘ সময় সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকার সময় কোনো কোনো শিক্ষার্থী হঠাৎ মাথা ঘুরে পড়ে যায় বা সাময়িকভাবে জ্ঞান হারায়। এ ধরনের ঘটনা শিক্ষক, অভিভাবক ও সহপাঠীদের মধ্যে উদ্বেগের সৃষ্টি করে।
চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এ অবস্থাকে সিনকোপ (Syncope) বা সাময়িক অজ্ঞান হয়ে যাওয়া বলা হয়। সাধারণত মস্তিষ্কে সাময়িকভাবে পর্যাপ্ত রক্ত ও অক্সিজেন সরবরাহ না হলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এটি সাময়িক ও প্রতিরোধযোগ্য হলেও কখনো কখনো এটি গুরুতর শারীরিক সমস্যার পূর্বলক্ষণ হতে পারে।
অজ্ঞান হওয়ার প্রধান কারণ:
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘক্ষণ একইভাবে দাঁড়িয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের অজ্ঞান হওয়ার অন্যতম কারণ। দীর্ঘ সময় স্থির অবস্থায় থাকলে শরীরের নিচের অংশে রক্ত জমা হয় এবং মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহ সাময়িকভাবে কমে যায়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে ভ্যাসোভ্যাগাল সিনকোপ বলা হয়।
এ ছাড়া তীব্র গরমে অতিরিক্ত ঘামের কারণে শরীরে পানিশূন্যতা দেখা দেয়। এতে রক্তচাপ কমে গিয়ে দুর্বলতা ও মাথা ঘোরা শুরু হতে পারে।
অনেক শিক্ষার্থী সকালের নাস্তা না করেই বিদ্যালয়ে আসে। ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা কমে গিয়ে দুর্বলতা, মাথা ঘোরা এবং অজ্ঞান হওয়ার ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।
পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব, অতিরিক্ত ক্লান্তি, মানসিক চাপ, পরীক্ষার উদ্বেগ কিংবা শাস্তির ভয়ও এ ধরনের ঘটনার কারণ হতে পারে। এছাড়া আয়রনের ঘাটতিজনিত রক্তস্বল্পতা, বিশেষ করে কিশোরী শিক্ষার্থীদের মধ্যে, মাথা ঘোরা ও অজ্ঞান হওয়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
কিছু ক্ষেত্রে জন্মগত হৃদরোগ, অনিয়মিত হৃদস্পন্দন, নিম্ন রক্তচাপ বা স্নায়বিক রোগের কারণেও শিক্ষার্থীরা অজ্ঞান হতে পারে। তাই বারবার এমন ঘটনা ঘটলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
পূর্বলক্ষণ:
অজ্ঞান হওয়ার আগে সাধারণত কিছু সতর্ক সংকেত দেখা যায়। যেমন—মাথা ঘোরা, চোখে ঝাপসা দেখা, অতিরিক্ত ঘাম হওয়া, বমি বমি ভাব, কানে ভোঁ-ভোঁ শব্দ হওয়া, মুখ ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া এবং শরীর দুর্বল অনুভব করা।
এসব লক্ষণ দেখা দিলে শিক্ষার্থীকে দ্রুত বসিয়ে বা শুইয়ে বিশ্রামের ব্যবস্থা করতে হবে।
তাৎক্ষণিক করণীয়:
কোনো শিক্ষার্থী অজ্ঞান হয়ে গেলে আতঙ্কিত না হয়ে তাকে দ্রুত নিরাপদ ও ছায়াযুক্ত স্থানে শুইয়ে দিতে হবে। পা মাথার চেয়ে সামান্য উঁচু করে রাখতে হবে এবং আঁটসাঁট পোশাক ঢিলা করে দিতে হবে। পর্যাপ্ত বাতাসের ব্যবস্থা করতে হবে এবং অপ্রয়োজনীয় ভিড় এড়িয়ে চলতে হবে।
জ্ঞান ফিরে এলে ধীরে ধীরে বিশুদ্ধ পানি বা ওরাল স্যালাইন পান করানো যেতে পারে। তবে জ্ঞান ফিরতে দেরি হলে, শ্বাসকষ্ট, খিঁচুনি, বুকে ব্যথা বা গুরুতর আঘাতের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া জরুরি।
প্রতিরোধে করণীয়:
বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের উচিত পিটি বা সমাবেশের আগে শিক্ষার্থীদের নাস্তা খেয়ে আসতে উৎসাহিত করা, পর্যাপ্ত পানি পান নিশ্চিত করা এবং প্রচণ্ড রোদে দীর্ঘ সময় দাঁড় করিয়ে না রাখা। অসুস্থ বা দুর্বল শিক্ষার্থীদের প্রতি বিশেষ নজরদারি এবং বিদ্যালয়ে প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন।
অভিভাবকদেরও শিশুদের পুষ্টিকর খাবার, পর্যাপ্ত পানি ও প্রয়োজনীয় ঘুম নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং আয়রনসমৃদ্ধ খাবার গ্রহণে গুরুত্ব দিতে হবে।
উপসংহার:
পিটি, প্যারেড ও বিদ্যালয়ের সমাবেশে শিক্ষার্থীদের অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার প্রধান কারণ হলো দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা, পানিশূন্যতা, অতিরিক্ত গরম, খালি পেটে থাকা, রক্তস্বল্পতা এবং শারীরিক-মানসিক দুর্বলতা। সচেতনতা বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা এবং প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বনের মাধ্যমে এ ধরনের ঘটনা অনেকাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব।
সুস্থ ও নিরাপদ শিক্ষাজীবন নিশ্চিত করতে শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের সমন্বিত উদ্যোগ অপরিহার্য। কারণ সুস্থ শিক্ষার্থীই একটি সুস্থ, সচেতন ও সমৃদ্ধ জাতি গঠনের ভিত্তি।
লেখক:
ডা. এম. এ. মান্নান
ম্যানেজিং ডিরেক্টর, মুকতাদির হোমিও চিকিৎসা কেন্দ্র, নাগরপুর, টাঙ্গাইল।
রিসোর্স টিচার (ইংরেজি), SESIP, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, ঢাকা।
সংযুক্তি: কবি নজরুল উচ্চ বিদ্যালয়, নাগরপুর।