স্বপন কুমার সিং, নিজস্ব প্রতিবেদক :
মৌলভীবাজারের চা-বাগানের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নারী ও শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা, নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিতকরণ এবং পুষ্টি ও যক্ষ্মা বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধিতে বিশেষ স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম পরিচালনা করছে জাতীয় পর্যায়ের বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা সীমান্তিক। এরই ধারাবাহিকতায় আজ শনিবার (৩১ অক্টোবর) কমলগঞ্জ উপজেলার নুরজাহান চা-বাগানের হাসপাতালে মা সমাবেশ ও ওরিয়েন্টেশন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর আগে গত ২৭ অক্টোবর একই উপজেলার পাত্রখলা চা-বাগানে অনুরূপ মা সমাবেশ ও স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচি সম্পন্ন হয়।
সীমান্তিকের বাস্তবায়নাধীন MOMENTUM Integrated Health Resilience (MIHR) Bangladesh Activity প্রকল্পের আওতায় এসব কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। চা-বাগানের শ্রমজীবী ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর গর্ভবতী মা, প্রসূতি মা, শিশু ও কিশোরীদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা, মাতৃস্বাস্থ্য ও পুষ্টি বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং যক্ষ্মা রোগ শনাক্তকরণে সহযোগিতা করাই এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
নুরজাহান চা-বাগানে স্বাস্থ্যসেবা পেলেন মা ও শিশুরা
শনিবার (৩১ অক্টোবর) নুরজাহান চা-বাগানের হাসপাতালে আয়োজিত মা সমাবেশে গর্ভবতী মা, প্রসূতি মা, শিশুদের মা ও কিশোরীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা, পুষ্টিসেবা এবং প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরামর্শ দেওয়া হয়।
কর্মসূচির সেবার বিবরণ অনুযায়ী, ১৭ জন গর্ভবতী মাকে প্রসবপূর্ব স্বাস্থ্য পরীক্ষা (এএনসি), ১৭ জনকে এএনসি ও আলট্রাসনোগ্রাফি সেবা এবং তিনজন প্রসূতি মাকে প্রসব-পরবর্তী স্বাস্থ্য পরীক্ষা (পিএনসি) দেওয়া হয়। এ ছাড়া ১২ জন কিশোরী এবং পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের ৪৪ জন মাকে স্বাস্থ্য ও পুষ্টিবিষয়ক সেবা ও পরামর্শ দেওয়া হয়। ৪১ জনের বাহুর মধ্যভাগের পরিধি (এমইউএসি) পরিমাপ করে পুষ্টিগত অবস্থা মূল্যায়ন করা হয়। পাশাপাশি মায়েদের মধ্যে পুষ্টিসামগ্রী বিতরণ করা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নুরজাহান চা-বাগানের ম্যানেজার ইনচার্জ সৈয়দ মো. শাহরিয়ার।
এ সময় সীমান্তিকের MIHR Bangladesh Activity প্রকল্পের জেলা সমন্বয়কারী মো. সামছুল আলম, ফিল্ড সুপারভাইজার নিলুকান্ত পাল , মিডওয়াইফ ফাহমিদা বেগম, ডাটা অ্যাসিস্ট্যান্ট লিপি ঘোষ, কনসালট্যান্ট, মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট, কম্পাউন্ডার এবং সনোলজিস্ট ডা. জান্নাতুল ফাতেমা সহ প্রকল্পের অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া চা-বাগানের স্বাস্থ্যকর্মী, কমিউনিটি লিডার, গর্ভবতী মা ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা অংশ নেন।
পাত্রখলা চা-বাগানে ৪১ জনের আলট্রাসনোগ্রাফি, উচ্চঝুঁকির গর্ভধারণ শনাক্ত ১৫।
উল্লেখ্য, গত ২৭ অক্টোবর কমলগঞ্জ উপজেলার পাত্রখলা চা-বাগানে সীমান্তিকের একই প্রকল্পের আওতায় মা সমাবেশ ও স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। ওই কর্মসূচিতে গর্ভবতী ও প্রসূতি মা এবং শিশুদের বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হয়।
কর্মসূচির সেবার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ৪২ জন গর্ভবতী মায়ের এএনসি চেকআপ, ১০ জন প্রসূতি মায়ের পিএনসি চেকআপ, শূন্য থেকে পাঁচ বছর বয়সী ৩৭ শিশুর এমইউএসি স্ক্রিনিং এবং ৪১ জনের আলট্রাসনোগ্রাফি করা হয়।
এ ছাড়া ১৫ জনের উচ্চঝুঁকিপূর্ণ গর্ভধারণ (হাই-রিস্ক প্রেগন্যান্সি) শনাক্ত করা হয়। তাঁদের মধ্যে তিনজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রেফারেলের পরামর্শ দেওয়া হয়। পাশাপাশি যক্ষ্মা রোগের সন্দেহভাজন ছয়জনের কফের নমুনা সংগ্রহ করা হয়।
পাত্রখলা চা-বাগানের কর্মসূচিতে বিশেষভাবে উপস্থিত ছিলেন JSI-এর ঢাকা কার্যালয়ের পরিচালক (এমআইএস ও আইটি) নাজমুল কবির, পাত্রখলা চা-বাগানের ম্যানেজার মো. ইউসুফ খান এবং কমলগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. শাকুর আহমেদ। এ ছাড়া প্রকল্পের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, স্বাস্থ্যকর্মী, চা-বাগানের প্রতিনিধি, গর্ভবতী মা ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা অংশগ্রহণ করেন।
সিলেট বিভাগের তিন জেলায় ৩৬টি চা-বাগানে প্রকল্পের কার্যক্রম MOMENTUM Integrated Health Resilience (MIHR) Bangladesh Activity প্রকল্পটি যুক্তরাষ্ট্রের Department of State (DOS-USA)-এর অর্থায়নে এবং JSI Research & Training Institute, Inc.-এর কারিগরি সহায়তায় জাতীয় পর্যায়ের বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা সীমান্তিকের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হচ্ছে।
সিলেট বিভাগের সিলেট, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজার জেলার ছয়টি উপজেলায় নির্ধারিত ৩৬টি চা-বাগানে এ প্রকল্পের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে মূলত গর্ভবতী মা, প্রসূতি মা, শূন্য থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশু এবং যক্ষ্মা রোগীদের স্বাস্থ্যসেবা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
মৌলভীবাজার জেলায় তিনটি উপজেলার ২১টি চা-বাগানে প্রকল্পটি চলমান রয়েছে। এর মধ্যে শ্রীমঙ্গল উপজেলায় নয়টি, রাজনগর উপজেলায় সাতটি এবং কমলগঞ্জ উপজেলায় পাঁচটি চা-বাগান অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
চা-বাগানের শ্রমজীবী জনগোষ্ঠীর অনেক পরিবারের জন্য নিয়মিত চিকিৎসা, গর্ভকালীন পরীক্ষা, আলট্রাসনোগ্রাফি, প্রসব-পরবর্তী সেবা ও শিশুর পুষ্টি মূল্যায়নের সুযোগ সীমিত। বিশেষ করে উচ্চঝুঁকিপূর্ণ গর্ভধারণ শনাক্ত, প্রয়োজনীয় রেফারেল পরামর্শ এবং যক্ষ্মার সন্দেহভাজন রোগীদের নমুনা সংগ্রহের মতো সেবাগুলো মা ও শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ।
এ বাস্তবতায় চা-বাগানের হাসপাতাল ও স্থানীয় পর্যায়ে স্বাস্থ্য বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে সীমান্তিকের এ ধরনের কার্যক্রম প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ তৈরি করছে। নিরাপদ মাতৃত্ব, সুস্থ শিশু এবং স্বাস্থ্যসচেতন পরিবার গড়ে তুলতে চা-বাগানগুলোতে এ ধরনের উদ্যোগের ধারাবাহিকতা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
‘সুস্থ মা, সুস্থ শিশু, সমৃদ্ধ সমাজ’—এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে চা-বাগানের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মাতৃস্বাস্থ্য, শিশুর পুষ্টি ও যক্ষ্মা প্রতিরোধে কাজ করে যাচ্ছে MIHR Bangladesh Activity প্রকল্প।