খামেনির মৃত্যু হলে থমকে যাবে না ইরান, রয়েছে মাস্টারপ্ল্যান
খামেনির মৃত্যু হলে থমকে যাবে না ইরান, রয়েছে মাস্টারপ্ল্যান
editor
প্রকাশিত মার্চ ১, ২০২৬, ০২:০৫ পূর্বাহ্ণ
Manual5 Ad Code
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইরানের ওপর ইসরায়েলি বা যুক্তরাষ্ট্রের হামলা কিংবা শীর্ষ নেতাদের গুপ্তহত্যার আশঙ্কার মধ্যে এক ‘মাস্টারপ্ল্যান’ হাতে নিয়েছেন দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি।
নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, খামেনির অবর্তমানে বা যেকোনো জরুরি পরিস্থিতিতে দেশের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে এবং প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে জাতীয় নিরাপত্তাপ্রধান আলী লারিজানিকে বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
মিডল ইস্ট আইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যদি কোনো কারণে সর্বোচ্চ নেতা বা দেশের শীর্ষ নেতৃত্ব নেতৃত্ব দানে অক্ষম হন বা নিহত হন, তবে দেশকে টিকিয়ে রাখা এবং প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখার পূর্ণ দায়িত্ব পালন করবেন জাতীয় নিরাপত্তাপ্রধান। খামেনি নিজেই এ সিদ্ধান্ত অনুমোদন করেছেন।
মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা এবং হামলার হুমকির মুখে এই আগাম প্রস্তুতি নিয়েছে তেহরান। মূলত সম্ভাব্য রাজনৈতিক শূন্যতা বা নেতৃত্বহীনতা এড়াতে খামেনির এ আগাম সিদ্ধান্ত ইরানজুড়ে নতুন এক সমীকরণ তৈরি করেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে হিজবুল্লাহ প্রধান হাসান নাসরাল্লাহ এবং হামাস নেতা ইসমাইল হানিয়ার মতো মিত্র নেতাদের ওপর সফল গুপ্তহত্যার ঘটনা ইরানকে গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলেছে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে খামেনি মনে করছেন, ইরানের অভ্যন্তরীণ চেইন অব কমান্ড বা নেতৃত্বকে লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে। এই শূন্যতা পূরণে এবং সম্ভাব্য বিশৃঙ্খলা এড়াতে আলী লারিজানি বা জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধানকে বিশেষ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।
বিপ্লবী গার্ড কোরের (আইআরজিসি) সদস্য ও উচ্চপদস্থ বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার বরাতে গত রোববার নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
খামেনির নির্দেশনা অনুযায়ী, তার নিয়োগ দেওয়া সামরিক ও সরকারি পদগুলোর জন্য চার স্তরের উত্তরাধিকার পরিকল্পনা করা হয়েছে। অর্থাৎ কোনো কর্মকর্তা নিহত হলে তার পর ধাপে ধাপে কোন চারজন নিয়োগ পাবেন, তা ঠিক করা হয়েছে। এ ছাড়া, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদেরও নিজেদের অন্তত চারজন উত্তরসূরির নাম ঠিক করে রাখার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লারিজানি দেশটির সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার দৌড়ে নেই বললে চলে। কারণ, এই পদের জন্য জ্যেষ্ঠ শিয়া আলেম হওয়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব যদি পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়, সে ক্ষেত্রে দেশ পরিচালনার জন্য যারা যোগ্য প্রার্থী, তিনি তাদের অন্যতম।
Manual6 Ad Code
কে এই আলী লারিজানি
আলী লারিজানি ইরানের নিরাপত্তাপ্রধান। গত আগস্টে এই নিরাপত্তাপ্রধানকে সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সেক্রেটারি নিয়োগ দেওয়া হয়।
Manual2 Ad Code
এই কাউন্সিল মূলত দেশটির নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি–সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত ক্ষমতা রাখে। তেহরানের শীর্ষ নেতৃত্ব গুপ্তহত্যার শিকার হলে ইরানের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে খামেনি যেসব ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক ও সামরিক সহযোগীকে দায়িত্ব দিয়েছেন বলে গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে, আলী লারিজানি তাদের মধ্যে অন্যতম।
Manual6 Ad Code
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার উত্তেজনার এ প্রেক্ষাপটে খামেনির পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে নানা জল্পনা চলছে। চলতি সপ্তাহে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক আলোচনা চললেও আদতে উত্তেজনা কমেনি। যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপ এড়ানোর শেষ চেষ্টা হিসেবে এ আলোচনা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এরই মধ্যে গত মঙ্গলবার খামেনেয়ি ট্রাম্পকে সতর্ক করে বলেন, তিনি ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে ‘ধ্বংস’ করতে পারবেন না।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই ডিক্রির মাধ্যমে খামেনেয়ি বিশ্বকে দুটি বার্তা দিতে চেয়েছেন। যেমন- নেতৃত্বের পরিবর্তন হলেও ইরানের নীতি বা প্রতিরোধ ব্যবস্থা দুর্বল হবে না এবং শত্রুপক্ষকে জানানো যে, শীর্ষ নেতাদের হত্যা করলেও ইরানের রাষ্ট্রযন্ত্র অচল করা সম্ভব নয়।
প্রসঙ্গত, গত বছর জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিন ধরে চলা সংঘাতের সময় খামেনি তার সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে তিনজনের নাম ঘোষণা করেছিলেন।
এদিকে নিউ ইয়র্ক টাইমসের এই প্রতিবেদন প্রকাশের পর আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে ওয়াশিংটন এবং তেল আবিব ইরানের এই নতুন সাংগঠনিক বিন্যাসকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। ধারণা করা হচ্ছে, যুদ্ধের ময়দানের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করাকেই এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন ৮৬ বছর বয়সী সর্বোচ্চ নেতা খামেনি।
অপরদিকে ইরানের বিরুদ্ধে হামলার হুমকি দিলেও যুক্তরাষ্ট্রের চূড়ান্ত লক্ষ্য ঠিক কী, তা এখনও স্পষ্ট করেননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মধ্যপ্রাচ্যে বিপুল সামরিক শক্তি মোতায়েনের পাশাপাশি তিনি কূটনৈতিক সমঝোতার কথাও বলছেন। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ও আঞ্চলিক প্রভাবকে কেন্দ্র করে ক্রমেই উত্তেজনা বাড়লেও সম্ভাব্য সংঘাত শেষ পর্যন্ত কোন পথে নিয়ে যাবে, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন অনিশ্চয়তা।
বার্তাসংস্থা এএফপি বলছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে হামলার হুমকি দিলেও, দীর্ঘ বা স্বল্পমেয়াদি সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের চূড়ান্ত লক্ষ্য কী, তা স্পষ্ট করেননি। ইতোমধ্যে তিনি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধজাহাজ ও বহুসংখ্যক যুদ্ধবিমান মোতায়েন করেছেন। ফলে পরিস্থিতি যে কোনও সময় বড় আকার নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
প্রশ্ন উঠছে, ট্রাম্প কি ইরানের ক্ষমতাসীন ধর্মীয় শাসনব্যবস্থার মূল ভিত্তি ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) ওপর সীমিত আঘাত হানতে চান? নাকি ইসরায়েলের প্রত্যাশা অনুযায়ী ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ধ্বংস করতে চান? এমনকি তেহরানে সরকার পরিবর্তনের চেষ্টাও কি তার পরিকল্পনায় আছে? অবশ্য ইরান আগেই সতর্ক করেছে যে হামলা হলে কঠোর প্রতিশোধ নেয়া হবে।