শুধু আল-মুসলিম গ্রুপ নয়, চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে দেশের বিভিন্ন শিল্প এলাকায় শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। শিল্পসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত ছয়টি শিল্প এলাকার ৭৯টি কারখানায় মোট ৭ হাজার ৭৮৪ শ্রমিক ছাঁটাই হয়েছেন। এসব কারখানার অধিকাংশই তৈরি পোশাক খাতের। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছাঁটাই হয়েছে আশুলিয়ায়, যেখানে ৩৫টি কারখানা থেকে ৪ হাজার ৯৭২ শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন। গাজীপুরে ৩৩টি কারখানায় ছাঁটাই হয়েছেন ১ হাজার ৯৪৬ শ্রমিক। চট্টগ্রামে পাঁচটি কারখানায় ৫১৫ জন, ময়মনসিংহে একটি কারখানায় ২৫২, খুলনায় দুটি কারখানায় ৮১ ও নারায়ণগঞ্জে তিনটি কারখানায় ১৮ শ্রমিক ছাঁটাই হয়েছেন। কুমিল্লা ও সিলেট অঞ্চলে এ সময়ে কোনো ছাঁটাইয়ের ঘটনা ঘটেনি।
সাভার-আশুলিয়া এলাকায় শ্রমিক সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ঈদকে কেন্দ্র করে এ অঞ্চলের বিভিন্ন শিল্প-কারখানা থেকে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন। এর মধ্যে উলাইল এলাকার একেএম নিটওয়্যার লিমিটেড থেকে ১ হাজার ২৮৬ জন, রেডিও কলোনি এলাকার প্যাসিফিক ব্লু জিন্স ওয়্যার থেকে ৫২৯ ও আশুলিয়ার আল-মুসলিম অ্যাপারেলস থেকে ৫৩ শ্রমিককে ছাঁটাই করা হয়েছে। সব মিলিয়ে আল-মুসলিম গ্রুপের তিনটি কারখানা থেকে ছাঁটাই করা হয়েছে ১ হাজার ৮৬৮ শ্রমিক।
এছাড়া সাঙ্গু টেক্সটাইল থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে ১২৪ শ্রমিককে। জি ম্যাক্স ক্লদিং লিমিটেড থেকে ২০০ জন, পার্ল গার্মেন্টস প্রাইভেট লিমিটেড থেকে ৩০০, মাছিহাতা সোয়েটার লিমিটেড থেকে ১০০, এভারবাইট সোয়েটার লিমিটেড থেকে ১০০, গ্লোবাল আউটওয়্যার লিমিটেড থেকে ৭০০ ও টি ডিজাইন লিমিটেড থেকে ১০০ শ্রমিককে ছাঁটাই করা হয়েছে।
জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক ইউনিটির কেন্দ্রীয় সভাপতি ফরিদুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘শ্রম মন্ত্রণালয় ও বিজিএমইএ সবসময় বলে আসছে ঈদের সময় যেন কোনো শ্রমিক ছাঁটাই না করা হয়। কিন্তু সে নির্দেশনা উপেক্ষা করে অনেক মালিক ব্যক্তিগত স্বার্থে শ্রমিক ছাঁটাই করছেন। এটি অমানবিক। আইনে শ্রমিক ছাঁটাইয়ের বিধান থাকলেও এর একটি সময় ও মানবিক বিবেচনার বিষয় রয়েছে।’
আল-মুসলিম গ্রুপের ছাঁটাই প্রসঙ্গে ফরিদুল ইসলাম বলেন, ‘এটা নিয়ে আমরাও কাজ করছি। এটি মূলত টার্মিনেশনের আওতায় পড়ে। তবে কর্তৃপক্ষ ঈদের আগে ছাঁটাই সুবিধা দিয়ে শ্রমিকদের বিদায় করেছে।’
অভিযোগের বিষয়ে আল-মুসলিম গ্রুপ ঢাকার ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবুল হোসেন অপু বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বর্তমান বাজার পরিস্থিতি ও কাজের স্বল্পতার কারণে আমরা ১ হাজার ৮০০-এর কিছু বেশি শ্রমিককে ছাঁটাই করতে বাধ্য হয়েছি। শ্রম আইন অনুসরণ করেই এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে। ছাঁটাই হওয়া শ্রমিকদের সব পাওনা ২৭ মে বিকাশের মাধ্যমে পরিশোধ করা হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের গ্রুপে প্রায় ৩০ হাজার মানুষ কাজ করে। তিন-চার মাস ধরেই উৎপাদন কার্যক্রম ও কাজের পরিমাণ কমে আসছিল। লো-স্কিলড ৪-৫ শতাংশ কর্মীকে আগেই সম্ভাব্য ছাঁটাইয়ের বিষয়ে অবহিত করা হয়েছিল। করোনাভাইরাস মহামারীর পর থেকে ব্যবসায়িক পরিস্থিতি কঠিন হয়ে উঠেছে। গত ৩২ বছরে আমরা এ ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হইনি। বাজারের বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই এ সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।’
ভবিষ্যতে আরো ছাঁটাই করা হবে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ মুহূর্তে আমাদের সে ধরনের কোনো পরিকল্পনা নেই। বাজার পরিস্থিতির উন্নতি হলে এবং ক্রয়াদেশ বাড়লে বর্তমান কর্মী নিয়েই উৎপাদন কার্যক্রম চালিয়ে যেতে চাই।’
পোশাক খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যবসার পরিস্থিতি এখন কিছুটা খারাপ যাচ্ছে। কেউ মোটামুটি সামলে নিতে পারছে, আবার কেউ পারছে না। আল-মুসলিম গ্রুপে এমনিতেই অনেক শ্রমিক কাজ করেন। ফলে তারা ছাঁটাই করলে সংখ্যাটা বড় হওয়াটাই স্বাভাবিক। তবে আল-মুসলিম ভালো গ্রুপ। বেতন-ভাতা নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ বা কমপ্লেইন নেই। অনেক শ্রমিক একসঙ্গে ছাঁটাই হওয়ায় বিষয়টি বেশি চোখে পড়ছে। তবে সামগ্রিকভাবে দেখলে বিভিন্ন জায়গাতেই অল্পস্বল্প ছাঁটাই হচ্ছে। আল-মুসলিমের ক্ষেত্রে ১ হাজার ৮০০ জনের মতো ছাঁটাই হওয়ায় সংখ্যাটা বড় মনে হচ্ছে। কিন্তু তাদের মোট শ্রমিক সংখ্যা প্রায় ৩০ হাজার। এখনো প্রায় ২৮ হাজার শ্রমিক সেখানে কর্মরত। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটি ছাঁটাই হওয়া শ্রমিকদের সব বেনিফিট ও প্রাপ্য পরিশোধ করছে।
বিজিএমইএর সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ইনামুল হক খান বাবলু বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কেউ তো ইচ্ছাকৃত শ্রমিক ছাঁটাই করে না। ব্যবসার অবস্থা খারাপ এটা সত্য কথা। আমরা সবসময় বলি, ছাঁটাই করতে হলে করো, কোনো সমস্যা নেই; কিন্তু সবার প্রাপ্য পাওনা মিটিয়ে দিতে হবে। আল-মুসলিম এ বিষয়ে সম্মত হয়েছে এবং তারা যথাযথভাবে সবকিছু করছে। তাই তাদের ব্যাপারে বিজিএমইএর কোনো আপত্তি বা ইস্যু নেই। এ ধরনের ঘটনা শুধু একটি কারখানায় নয়, বিভিন্ন কারখানায় কিছু কিছু হচ্ছে। কেউ হয়তো ১০০, কেউ ১৫০ শ্রমিক ছাঁটাই করছে। সেগুলো হয়তো ততটা আলোচনায় আসছে না। তবে শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধ করে বিদায় দেয়া হচ্ছে। আগামী দিনে পরিস্থিতি আরো খারাপ হতে পারে বলেই আমরা আশঙ্কা করছি। যে ইঙ্গিতগুলো দেখছি, তা খুব একটা সুখকর নয়। পরিস্থিতি কিছুটা খারাপ দেখছি। আমরা চাই সবাই টিকে থাকুক। টিকে থাকার জন্য যদি কেউ মনে করে কিছু শ্রমিক কমিয়ে প্রতিষ্ঠানকে শক্ত অবস্থানে রাখতে হবে, সেটি তাদের সিদ্ধান্ত। কিন্তু যার যা পাওনা, তা অবশ্যই পরিশোধ করতে হবে। পরিস্থিতি দুঃখজনক, কিন্তু এটাই বাস্তবতা।’
শ্রমিক ছাঁটাই পরিস্থিতি নিয়ে ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি গাজী জসীম উদ্দিন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘যেসব কারখানায় শ্রমিক ছাঁটাই হচ্ছে, সেখানে মালিক পক্ষ শ্রম আইন অনুযায়ী নোটিস দিচ্ছে এবং শ্রমিকদের প্রাপ্য পাওনা পরিশোধ করেই ছাঁটাই কার্যক্রম সম্পন্ন করছে বলে আমরা জেনেছি। তবে অনেক শ্রমিকের অভিযোগ, ঈদের ছুটিতে যাওয়ার পর ফিরে এসে তারা চাকরি হারানোর বিষয়টি জানতে পারছেন। মূলত চাকরি হারানোই তাদের বড় উদ্বেগের কারণ।’
যেসব এলাকায় শ্রমিক ছাঁটাই হচ্ছে বা এমন পরিস্থিতি তৈরির আশঙ্কা রয়েছে, সেখানে শিল্প পুলিশ নজরদারি ও মোতায়েন জোরদার করেছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘কোথাও যাতে অপ্রীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি না হয়, সেজন্য আমরা কাজ করছি। একই সঙ্গে প্রয়োজন হলে মালিক পক্ষ ও শ্রমিক পক্ষের মধ্যে সমন্বয় ও মধ্যস্থতার ভূমিকাও পালন করছি।’তথ্য সুএ: বনিকবার্তা

