আজ বৃহস্পতিবার, ৮ই অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২৩শে আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

অবশেষে বেক্সিমকো গ্রুপের পর্ষদ থেকে বাদ পড়লেন সালমান এফ রহমান

editor
প্রকাশিত অক্টোবর ৭, ২০২৬, ১০:৩৪ অপরাহ্ণ
অবশেষে বেক্সিমকো গ্রুপের পর্ষদ থেকে বাদ পড়লেন সালমান এফ রহমান

Manual8 Ad Code

অনলাইন ডেস্ক

দীর্ঘদিনের পরিচালনাগত অচলবস্থা কাটাতে এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাভাবিক কার্যক্রম পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে বেক্সিমকো গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমানকে বাদ দিয়ে—বেক্সিমকো লিমিটেড ও শাইনপুকুর সিরামিকস পিএলসির পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠনের অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত এই দুটি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম পুনরায় চালু করা এবং দীর্ঘদিনের নিয়ন্ত্রণমূলক ও আর্থিক প্রতিবেদন সংক্রান্ত জটিলতা নিরসনের প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে, বেক্সিমকো গ্রুপ পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির কাছে পর্ষদ পুনর্গঠনের আবেদন জানানোর পর বিএসইসি এই অনুমোদন দিল।

বিএসইসি সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) অনুষ্ঠিত কমিশন সভায় পুনর্গঠিত পর্ষদের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে এবং শিগগিরই কোম্পানিগুলোতে কমিশনের সম্মতিপত্র (কনসেন্ট লেটার) পাঠানো হবে।

ইনফোগ্রাফিক: টিবিএস
২০২৪ সালের আগস্ট থেকে একাধিক ফৌজদারি মামলায় কারাবন্দী রয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ বিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান। গত সেপ্টেম্বরে তিনি বেক্সিমকোর তালিকাভুক্ত পর্ষদগুলো থেকে সরে দাঁড়াতে সম্মত হন।

গ্রুপটির সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, পর্ষদ থেকে তাঁর বিদায়ের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠার পর এই প্রথমবারের মতো বেক্সিমকো গ্রুপের তালিকাভুক্ত তিনটি প্রতিষ্ঠান— সালমান এফ রহমানকে ছাড়াই তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করবে।

সরকার ও বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থার সাথে ধারাবাহিক আলাপ-আলোচনার পরই বিএসইসির কাছে পর্ষদ পুনর্গঠনের এই প্রস্তাব জমা দিয়েছিল বেক্সিমকো গ্রুপ।

Manual1 Ad Code

বিএসইসি’র সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে যে, বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের জন্য ৯ সদস্যের নতুন পর্ষদ অনুমোদনের পর নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি বেক্সিমকো লিমিটেড ও শাইনপুকুর সিরামিকসের পর্ষদ পুনর্গঠনেরও অনুমোদন দিয়েছে।

Manual6 Ad Code

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএসইসির এক কর্মকর্তা বলেন, “মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত কমিশন সভায় এই পুনর্গঠনের প্রস্তাব অনুমোদিত হয়েছে। এ বিষয়ে শিগগিরই কোম্পানিগুলোতে সম্মতিপত্র পাঠানো হবে।”

ব্যাংক ঋণ জালিয়াতি, পুঁজিবাজারের অর্থ আত্মসাৎ এবং আর্থিক অনিয়মের নানা অভিযোগে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদে বেক্সিমকো গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধকরণ (ফ্রিজ) সহ সরকারের কঠোর পদক্ষেপের মুখে পড়ে।

এর ফলে কার্যকরী মূলধনের চরম সংকট, কাঁচামালের অভাব এবং ব্যাংক হিসাব পরিচালনায় প্রশাসনিক জটিলতার কারণে গাজীপুর ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে অবস্থিত গ্রুপটির প্রায় এক ডজন কারখানা বন্ধ হয়ে যায়; যার খেসারত হিসেবে চাকরি হারাতে বা সাময়িক ছাঁটাইয়ের মুখে পড়তে হয় ৪০ হাজারের বেশি শ্রমিককে।

হাইকোর্টে জমা দেওয়া বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি প্রতিবেদনের তথ্যমতে, ২০২৪ সালের ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত বেক্সিমকো গ্রুপের মোট বকেয়া ঋণ ও দায়ের পরিমাণ ছিল ৫০ হাজার ৯৮ কোটি টাকা।

মোট দায়ের মধ্যে ২৫ হাজার ৫২৪ কোটি টাকা—যা অর্ধেকেরও বেশি—ইতিমধ্যেই খেলাপি ঋণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল এবং অবশিষ্ট দায়ের একটি বড় অংশ খেলাপি হওয়ার ঝুঁকিতে ছিল।

বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) তদন্তেও উঠে এসেছে যে, গ্রুপটির ঋণের এক বিশাল অংশ নেওয়া হয়েছিল অনিয়মের মাধ্যমে—যার মধ্যে ভুয়া বা স্রেফ কাগজে-কলমে থাকা প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ নেওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে। এ ছাড়া কিছু অর্থ পুঁজিবাজারে শেয়ার কারসাজিতে পাচার করা হয়েছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে।

Manual7 Ad Code

এখন বিএনপি সরকারের অধীনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাথে চলমান আলোচনার মাধ্যমে গ্রুপটি কারখানার কার্যক্রম পুনরায় চালু এবং স্বাভাবিক ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে ফেরার চেষ্টা করছে।

বেক্সিমকো গ্রুপের প্রস্তাবিত পর্ষদ

দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের হাতে আসা এক চিঠির তথ্য অনুযায়ী, বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের পর্ষদ পুনর্গঠনের পর গ্রুপটির মালিকানাধীন অপর দুটি তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠান—বাংলাদেশ এক্সপোর্ট ইমপোর্ট কোম্পানি লিমিটেড (বেক্সিমকো লিমিটেড) ও শাইনপুকুর সিরামিকস পিএলসি—গত সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে বিএসইসির দুটি পূর্ববর্তী আদেশ প্রত্যাহার করে তাদের নতুন প্রস্তাবিত পর্ষদ অনুমোদনের অনুরোধ জানায়।

প্রস্তাবিত উভয় পর্ষদই সাত সদস্যের; যার মধ্যে সালমান এফ রহমানের ভাই এ এস এফ রহমান এবং স্পন্সর গ্রুপের মনোনীত চারজন পরিচালক রয়েছেন।

কর্পোরেট গভর্ন্যান্স কোড মেনে এই পর্ষদগুলোতে একজন পুরুষ ও একজন নারীসহ দুজন স্বতন্ত্র পরিচালকও রাখা হয়েছে।

বেক্সিমকো লিমিটেডের জন্য প্রস্তাবিত পরিচালকদের মধ্যে রয়েছেন ও কে চৌধুরী, ইকবাল আহমেদ, আজমল কবীর এবং কামরুন নাহার আহমেদ। এছাড়া স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবে শাহ মঞ্জুরুল হকের নাম সুপারিশ করা হয়েছে।

অন্যদিকে শাইনপুকুর সিরামিকস পর্ষদে বেক্সিমকো লিমিটেডের মতোই একই স্পন্সর ও স্পন্সর-গ্রুপের পরিচালকদের নাম প্রস্তাব করা হলেও, কোনো স্বতন্ত্র পরিচালকের নাম সুপারিশ করা হয়নি।

আর্থিক বিবরণী প্রকাশে অচলাবস্থা

২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দুটি কোম্পানিই কেবল ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এক প্রান্তিকের আর্থিক বিবরণী প্রকাশ করেছিল, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকের।

Manual2 Ad Code

এখন অন্তত পাঁচটি প্রান্তিকের আর্থিক বিবরণী প্রকাশ বকেয়া পড়েছে—যার মধ্যে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিক, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বার্ষিক হিসাব এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরের টানা তিনটি প্রান্তিক রয়েছে।

এ ছাড়া গত জুনে অর্থবছর শেষ হওয়ায়, চলতি মাসেই ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বার্ষিক আর্থিক বিবরণী প্রকাশের সময়সীমা শেষ হতে চলেছে। কারণ নিয়ম অনুযায়ী অর্থবছর শেষের পর কোম্পানিগুলো বিবরণী প্রকাশের জন্য ১২০ দিন সময় পায়।

বিএসইসিকে দেওয়া চিঠিতে কোম্পানি দুটি উল্লেখ করে, “প্রয়োজনীয় অনুমতি প্রাপ্তি এবং বিলম্বের বিষয়ে আদালতের সমন্বয় সাপেক্ষে বর্তমান পরিচালকদের উপস্থিতিতে কোম্পানিগুলোর হিসাব অনুমোদন করতে হবে।”

চিঠিতে আরও বলা হয়, “একই সাথে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংবিধিবদ্ধ ও নিয়ন্ত্রণমূলক বাধ্যবাধকতার সময়সীমা ঘনিয়ে আসছে—যার মধ্যে ২০২৫-২৬ সালের নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী অনুমোদন ও প্রকাশ এবং ২০২৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর সমাপ্ত প্রথম প্রান্তিকের অনিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী প্রকাশ অন্যতম।”

পর্ষদ অনুমোদিত হলে নিয়ন্ত্রক সংস্থার আগের সিদ্ধান্ত (নতুন স্বতন্ত্র পরিচালক অন্তর্ভুক্তকরণ এবং পরিচালকদের সাথে সভা আহ্বানের আদেশসহ) চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা রিট পিটিশন প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে বলে কমিশনকে অবহিত করে কোম্পানি দুটি।

বেক্সিমকো ফার্মার পর্ষদ পুনর্গঠন

এর আগে গত ২৯ সেপ্টেম্বর সালমান এফ রহমানকে বাদ দিয়ে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের পর্ষদ পুনর্গঠনের অনুমোদন দেয় বিএসইসি।

কর্পোরেট গভর্ন্যান্স কোড মেনে বেক্সিমকো গ্রুপের তিনজন, আইএফআইসি ব্যাংকের একজন এবং একজন নারীসহ চারজন স্বতন্ত্র পরিচালকের সমন্বয়ে গঠিত ৯ সদস্যের নতুন পর্ষদের অনুমোদন দেওয়া হয়।

এ ছাড়া পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থার গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এই পর্ষদে একজন নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালকও নিয়োগ করা হবে।

এদিকে নিয়ন্ত্রক সংস্থার সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের দায়ের করা মামলাটি প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে। কোম্পানিটি মামলা প্রত্যাহার করলেই নিয়ন্ত্রক সংস্থাও তাদের আগের দুটি আদেশ প্রত্যাহার করে নেবে।

বেক্সিমকো ফার্মার ওয়েবসাইটে প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, পুনর্গঠিত পর্ষদে বেক্সিমকো গ্রুপের পরিচালকদের মধ্যে রয়েছেন গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান এ এস এফ রহমান, ও কে চৌধুরী এবং ইকবাল আহমেদ। বর্তমানে ও কে চৌধুরী প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক এবং ইকবাল আহমেদ ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।