বাড়ছে ঋণের চাপ, কমছে রাজস্ব; নির্বাচনের বছরে গভীর অর্থনৈতিক ঝুঁকির সতর্কতা সিপিডির
বাড়ছে ঋণের চাপ, কমছে রাজস্ব; নির্বাচনের বছরে গভীর অর্থনৈতিক ঝুঁকির সতর্কতা সিপিডির
editor
প্রকাশিত জানুয়ারি ১০, ২০২৬, ১০:২২ অপরাহ্ণ
Manual6 Ad Code
অনলাইন ডেস্ক:
রাজধানীর নিজস্ব কার্যালয়ে সিপিডির সংবাদ সম্মেলন
রাজধানীর নিজস্ব কার্যালয়ে সিপিডির সংবাদ সম্মেলন
বাংলাদেশ যখন নির্বাচনের বছরে পা রাখছে, তখন অর্থনীতির প্রধান সূচকগুলোতে একের পর এক বিপৎসংকেত দেখা দিচ্ছে। ঋণ পরিশোধের চাপ বৃদ্ধি, রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থতা, ব্যাংকিং খাতের নাজুক অবস্থা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম কমলেও স্থানীয় বাজারে তার প্রতিফলন না থাকা— এই বিষয়গুলোকে বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সংস্থাটি সতর্ক করেছে যে, অর্থনীতির এসব প্রবণতা স্বল্পমেয়াদি চাপের চেয়েও দীর্ঘস্থায়ী গভীর কাঠামোগত দুর্বলতার ইঙ্গিত দিচ্ছে, যা অর্থনীতিকে ‘ঋণফাঁদ’ কিংবা ‘নিম্ন-মধ্যম আয়ের ফাঁদে’ ঠেলে দিতে পারে।
শনিবার (১০ জানুয়ারি) ঢাকায় নিজস্ব কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে নিজেদের মূল্যায়ন উপস্থাপন করে সিপিডি জানায়, সাম্প্রতিক বাজেট ও বাজারসংক্রান্ত সূচকগুলো এমন এক সময়ে নীতিগত সক্ষমতা সংকুচিত হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে, যখন রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও অর্থনৈতিক গতিমন্দা ইতোমধ্যেই বিনিয়োগ ও আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
Manual2 Ad Code
শিক্ষা খাতের চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে ঋণের বোঝা
সিপিডির মতে, জাতীয় বাজেটের অগ্রাধিকার তালিকায় একটি বড় পরিবর্তন এখন স্পষ্ট। অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ ব্যয় বর্তমানে বাজেটের দ্বিতীয় বৃহত্তম খাতে পরিণত হয়েছে, যা দীর্ঘদিন ধরে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত শিক্ষা খাতকেও ছাড়িয়ে গেছে।
সিপিডির বিশিষ্ট ফেলো অধ্যাপক মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, “এটি কেবল একটি আর্থিক সমন্বয় নয়; বরং ক্রমবর্ধমান ঋণের দায় মেটানোর চাপে জাতীয় অগ্রাধিকারের ক্ষেত্রে যে পরিবর্তন এসেছে, এটি তারই প্রতিফলন।”
তিনি সতর্ক করে বলেন, “অনেক দেশ নিম্ন আয়ের স্তর থেকে নিম্ন-মধ্যম আয়ের স্তরে উত্তরণের সময় এই পর্যায়ে হোঁচট খায়, যখন ঋণ পরিশোধ ব্যয় উন্নয়নমুখী ব্যয়কে সংকুচিত করে। বাংলাদেশও এই ঝুঁকির বাইরে নয়।”
আদায় বাড়লেও কমছে না রাজস্ব ঘাটতি
নামমাত্র হিসাবে রাজস্ব আদায় বাড়লেও তা ধারাবাহিকভাবে লক্ষ্যমাত্রার নিচেই রয়ে গেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ১৫ শতাংশের বেশি। তবে এ সময়ের লক্ষ্যমাত্রা থেকে ঘাটতি রয়ে গেছে প্রায় ২৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
এই ঘাটতির পরও সরকার চলতি বছরের জন্য সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা আরও বাড়িয়েছে, যা কতটা বাস্তবসম্মত, তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।
সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, “নির্বাচন সামনে রেখে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড যখন মন্থর, তখন এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের সম্ভাবনা নিয়ে সংশয় রয়েছে।” তিনি সতর্ক করে বলেন, “কর প্রশাসনে কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া শুধু লক্ষ্যমাত্রা বাড়ালে রাজস্ব বৃদ্ধির বদলে কর ফাঁকি বাড়তে পারে।”
অর্থনীতির ভঙ্গুর দশায় বড় এক দুর্বলতার নাম ব্যাংক খাত
ব্যাংকিং খাতের নাজুক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে সিপিডি বলেছে, বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ, রাজনৈতিক প্রভাব এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর দুর্বলতার কারণে এই খাতটি এখন গোটা অর্থনীতির জন্য স্থায়ী ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, “ব্যাংক খাতের সংস্কার ছাড়া টেকসই প্রবৃদ্ধি সম্ভব নয়।” তিনি শক্তিশালী আইন, কার্যকর ঋণ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আরও বেশি স্বাধীনতার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন। তার মতে, নির্বাচন শেষে সংস্কারের গতি শ্লথ হয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে, যা আমানতকারীদের আস্থা ও আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য ক্ষতিকর।
বিশ্ববাজারে স্বস্তি ফিরলেও দেশের বাজারে দাম চড়া
ভোক্তা পর্যায়ে বৈশ্বিক ও দেশীয় দামের মধ্যে স্পষ্ট ব্যবধানের কথাও তুলে ধরেছে সিপিডি।
আন্তর্জাতিক বাজারে চালের দাম প্রায় ৪০ শতাংশ কমলেও দেশের বাজারে দাম এখনও চড়া। অথচ বাংলাদেশ বছরে যে পরিমাণ চাল উৎপাদন করে, তা অভ্যন্তরীণ চাহিদার চেয়েও বেশি।
চিনি ও ভোজ্যতেলের বাজারেও একই ধরনের চিত্র দেখা যাচ্ছে। সিপিডির মতে, “এটি দুর্বল প্রতিযোগিতা ও বাজার সিন্ডিকেটের প্রভাবের ইঙ্গিত দেয়, যা মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।”
মূল্যস্ফীতি কমার কোনও লক্ষণ নেই
ডিসেম্বরে সার্বিক মূল্যস্ফীতি সামান্য কমে ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশে নামলেও সিপিডির মতে, মূল্যস্ফীতি এখনও অর্থনীতির কাঠামোতে গভীরভাবে গেড়ে বসে আছে।
Manual5 Ad Code
খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের কাছাকাছি অবস্থান করছে, যা ইঙ্গিত দেয় যে দামের এই ঊর্ধ্বগতি কেবল খাদ্য সরবরাহের সংকটের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। তাই শুধুমাত্র সুদের হার বাড়িয়ে এই চাপ সামাল দেওয়া সম্ভব নয়।
সিপিডির মতে, বাজার তদারকি জোরদার, সরবরাহ ব্যবস্থার সংস্কার এবং সিন্ডিকেট বা যোগসাজশের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ এখন অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।
বিনিয়োগ ও দক্ষতাই সামনে এগোনোর পথ
Manual1 Ad Code
ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও সিপিডি মনে করে, সঠিক সময়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিলে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করার সুযোগ এখনও রয়েছে। বিনিয়োগ আনা, রফতানি বহুমুখী করা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং বৈদেশিক অর্থায়নের কার্যকর ব্যবহারকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।
ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, “বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার তরুণ জনশক্তি। সঠিক নীতি ও রাজনৈতিক অঙ্গীকার থাকলে এই জনসংখ্যাগত সুবিধাই প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি হতে পারে।”
যদিও সিপিডি সতর্ক করে বলেছে, সময়মতো সংস্কার করা না হলে অর্থনীতির গভীরে জমে থাকা এই চাপগুলো দীর্ঘমেয়াদী বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। আর এমন এক সময়ে এটি ঘটছে যখন দেশ একটি নির্বাচনের মতো সংবেদনশীল সময়ে প্রবেশ করছে।