আয়োডিন ঘাটতিজনিত থাইরয়েড রোগ; কীভাবে প্রতিরোধ করা যায়
আয়োডিন ঘাটতিজনিত থাইরয়েড রোগ; কীভাবে প্রতিরোধ করা যায়
editor
প্রকাশিত জানুয়ারি ২৭, ২০২৬, ০৪:৪৬ অপরাহ্ণ
Manual8 Ad Code
অনলাইন ডেস্ক:
আয়োডিন একটি অপরিহার্য ক্ষুদ্র খনিজ উপাদান, যা থাইরয়েড হরমোন (T₃ ও T₄) তৈরির জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। এই হরমোনগুলো মানবদেহের বিপাকক্রিয়া, শক্তি উৎপাদন, হৃদস্পন্দন, শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ এবং বিশেষ করে গর্ভকাল ও শৈশবে মস্তিষ্ক ও শারীরিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আয়োডিনের ঘাটতির ফলে যে রোগগুলো সৃষ্টি হয়, সেগুলোকে সম্মিলিতভাবে আয়োডিন ঘাটতিজনিত থাইরয়েড রোগ (Iodine Deficiency Disorders–IDD) বলা হয়। এটি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু প্রতিরোধযোগ্য জনস্বাস্থ্য সমস্যা।
বিশ্ব পরিস্থিতি
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, একসময় বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ আয়োডিন ঘাটতির ঝুঁকিতে ছিল। যদিও গত কয়েক দশকে ইউনিভার্সাল সল্ট আয়োডাইজেশন কর্মসূচির ফলে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে, তবুও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, আফ্রিকা ও কিছু ইউরোপীয় দেশে আয়োডিন ঘাটতি এখনও বিদ্যমান। আয়োডিন ঘাটতির ফলে গয়টার, হাইপোথাইরয়েডিজম, গর্ভপাত, মৃতভ্রূণ, জন্মগত ত্রুটি এবং শিশুর বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশে স্থায়ী ক্ষতি হতে পারে। বিশ্বব্যাপী বুদ্ধিবৃত্তিক অক্ষমতার অন্যতম প্রতিরোধযোগ্য কারণ হিসেবেও আয়োডিন ঘাটতিকে চিহ্নিত করা হয়েছে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশে আয়োডিন ঘাটতি দীর্ঘদিন ধরে একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা। ১৯৯৪ সালে বাধ্যতামূলক আয়োডিনযুক্ত লবণ ব্যবহারের আইন প্রণয়ন এবং USI কর্মসূচি চালু করা হলেও এখনও শতভাগ কাভারেজ নিশ্চিত হয়নি। গ্রামাঞ্চল, উপকূলীয় এলাকা ও নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীতে আয়োডিন ঘাটতির ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি। এর ফলে শিশুর শেখার সমস্যা, স্কুলে খারাপ ফলাফল, নারীর বন্ধ্যত্ব ও গর্ভকালীন জটিলতা এবং প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে গয়টার ও দীর্ঘমেয়াদি থাইরয়েড রোগ দেখা যায়। অনেক ক্ষেত্রেই এসব রোগ নীরবে অগ্রসর হয়, ফলে দেরিতে শনাক্ত হয় এবং জটিলতা বাড়ে।
Manual5 Ad Code
এই সমস্যায় আমাদের করণীয়
Manual4 Ad Code
প্রথমত, আয়োডিনযুক্ত প্যাকেটজাত লবণের সর্বজনীন ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। খোলা বা শিল্পলবণ ব্যবহার সম্পূর্ণভাবে পরিহার করা জরুরি।
Manual1 Ad Code
দ্বিতীয়ত, লবণ সঠিকভাবে সংরক্ষণ ও ব্যবহার করতে হবে–ঢাকনাযুক্ত পাত্রে রাখা এবং রান্নার শেষে লবণ যোগ করলে আয়োডিন নষ্ট কম হয়।
তৃতীয়ত, গর্ভবতী ও দুগ্ধদানকারী নারী এবং শিশুকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শে আয়োডিন সাপ্লিমেন্ট দেওয়া যেতে পারে।
চতুর্থত, লবণ উৎপাদন, আমদানি ও বাজারজাতকরণে আইন প্রয়োগ ও মান নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার করতে হবে।
পঞ্চমত, স্কুল, কমিউনিটি ক্লিনিক, গণমাধ্যম ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে।
সবশেষে, নিয়মিত গবেষণা, ইউরিন আয়োডিন পর্যবেক্ষণ ও স্ক্রিনিং কর্মসূচি চালু রাখা প্রয়োজন।
আয়োডিন ঘাটতিজনিত থাইরয়েড রোগ সম্পূর্ণভাবে প্রতিরোধযোগ্য। সমন্বিত নীতি, শক্তিশালী বাস্তবায়ন, জনসচেতনতা এবং নিয়মিত নজরদারির মাধ্যমে বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে এই নীরব কিন্তু গুরুতর সমস্যাকে নির্মূল করা সম্ভব। আয়োডিনযুক্ত লবণ ব্যবহার নিশ্চিত করাই সুস্থ প্রজন্ম গড়ার সবচেয়ে সহজ ও কার্যকর উপায়।
[সহযোগী অধ্যাপক, এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগ, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়]