দেবীপক্ষের সূচনালগ্নে ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে মহালয়ার অনুষ্ঠান শুরু হবে ভোর ৬টায়।
চণ্ডীপাঠ, মঙ্গলঘট স্থাপন, ঢাক-কাঁসা ও শঙ্খ বাজিয়ে শনিবার ভোরে মহালয়ায় দেবী দুর্গাকে মর্ত্যে আসার আহ্বান জানানোর মাধ্যমে শুরু হচ্ছে বাঙালি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গোৎসবের ক্ষণ গণনা।
শনিবার (১০ অক্টোবর) ভোর থেকেই পিতৃপক্ষ শেষে শুরু হচ্ছে দেবীপক্ষ। একইসঙ্গে মণ্ডপে মণ্ডপে শুরু হবে মহালয়ার প্রথম পর্বের আনুষ্ঠানিকতা।
বলা হয়, মহালয়া তিথি শুধু দশভূজা দেবী দুর্গার পূজা শুরুর তিথি তা নয়, এটি পরলোকগত পূর্বপুরুষের আত্মার শান্তির উদ্দেশ্যে তর্পণের মাধ্যমে শ্রদ্ধা জানানোরও দিন।
মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটি এক বিজ্ঞপ্তিতে বলেছে, এবার দেবীপক্ষের সূচনালগ্নে ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে মহালয়ার অনুষ্ঠান ভোর ৬টায় শুরু হবে। এরপর সকাল সাড়ে ৭টায় পূর্বপুরুষদের আত্মার শান্তি কামনায় তিল-তর্পণ অনুষ্ঠান এবং সকাল ৯টায় অনুষ্ঠিত হবে মহালয়ার ঘট স্থাপন ও বিশেষ পূজা ।
Manual1 Ad Code
মহালয়ার অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে ঢাকেশ্বরী মন্দিরে উপস্থিত থাকবেন ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী।
ধর্মীয় আচার অনুযায়ী, দুর্গোৎসবের তিনটি পর্ব- মহালয়া, বোধন আর সন্ধিপূজা। সাধারণত আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত চলে দুর্গাপূজার মূল আনুষ্ঠানিকতা। আশ্বিন মাসের এই শুক্লপক্ষকে বলা হয় দেবীপক্ষ।
দুর্গাপূজায় ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত পাঁচ দিনকে ধরা হয় সবচেয়ে বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। তবে এবার সপ্তমী তিথি দুইদিন হওয়ায় দুর্গোৎসব মোট ৬ দিন উদযাপিত হবে।
হিন্দু শাস্ত্র ও পঞ্জিকা অনুসারে পূজার সপ্তমীতে দেবীর আগমন হয়, আর গমন হয় দশমীতে। এই দুই দিন সপ্তাহের কোন কোন বারে পড়ছে, তার উপরেই নির্ভর করে দেবী কোন বাহনে চড়ে মর্ত্যে আসবেন ও কীসে ফিরে যাবেন।
শাস্ত্র অনুযায়ী সপ্তমী রবি বা সোমবার হলে দেবীর বাহন হবে গজ বা হাতি। সপ্তমী শনি বা মঙ্গলবার হলে দেবীর বাহন ঘোটক বা ঘোড়া। সপ্তমী বৃহস্পতি বা শুক্রবার হলে দেবীর বাহন দোলা বা পালকি। সপ্তমী বুধবার হলে দেবীর বাহন নৌকা। একই ভাবে, দশমী রবি বা সোমবার হলে দেবীর বাহন গজ বা হাতি। দশমী শনি বা মঙ্গলবার হলে দেবী বিদায় নেবেন ঘোড়ায় চড়ে। দশমী বৃহস্পতি বা শুক্রবার হলে দেবীর গমন হবে দোলা বা পালকিতে। আর দশমী বুধবার হলে নৌকা করে স্বর্গলোকে ফিরবেন দেবী।
সপ্তমীতে এবার দেবী দুর্গার আগমন হবে ঘোড়ায় চড়ে। দেবী যদি ঘোড়ায় চড়ে আসেন বা বিদায় নেন, তবে সামাজিক, রাজনৈতিক ও সামরিক অস্থিরতা বৃদ্ধি পায়। এর ফলে রাজায়-রাজায় বা রাষ্ট্রে-রাষ্ট্রে কলহের সূচনা হতে পারে। সামাজিক ও রাজনৈতিক স্তরে ধ্বংস ও অস্থিরতা বিরাজ করে, যা এক কথায় ‘ছত্রভঙ্গম’।
আর দশমীতে দেবীর গমন হবে নৌকায়; যার ফল ‘শস্য বুদ্ধিস্তথাজলম’ অর্থাৎ প্রবল বন্যা ও খরা দেখা দিতে পারে। সেই সঙ্গে অতি বর্ষণ বা প্লাবনের আশঙ্কাও দেখা যায়। তবে এরপর ধরিত্রী হয়ে উঠবে শস্য শ্যামলা।
মহালয়ার মূল আচার-অনুষ্ঠান পর্বে ভক্তরা তাঁদের পূর্বপুরুষের আত্মার প্রীতির জন্য পুরোহিতের মন্ত্র উচ্চারণের মধ্য দিয়ে অন্ন-জল নিবেদন করে থাকেন। শাস্ত্রে একে বলা হয় ‘তর্পণ’। এর মাধ্যমে পিতৃপক্ষের অবসান ও দেবীপক্ষের সূচনা হয়। এরপর ঘট স্থাপনের পর নানা স্তব-স্তুতিতে দেবীকে মর্ত্যে আহ্বান জানানো হয়।
সনাতন বিশ্বাস অনুযায়ী, জীবিত ব্যক্তির পূর্ববর্তী তিন পুরুষ পর্যন্ত পিতৃলোক বা যমলোকে বাস করেন। আর এই পিতৃলোকের অবস্থান স্বর্গ ও মর্ত্যের মাঝামাঝি স্থানে। পিতৃলোকের শাসক মৃত্যুদেবতা যম। তিনি সদ্য মৃত ব্যক্তির আত্মাকে মর্ত্য থেকে পিতৃলোকে নিয়ে যান। এরপর পরের প্রজন্মের একজনের মৃত্যু হলে আগের প্রজন্মের একজন পিতৃলোক ছেড়ে স্বর্গে গমন করেন। একই সঙ্গে পরমাত্মায় বা ঈশ্বরে বিলীন হন।
এ কারণে মহালয়ায় সনাতন ধর্মাবলম্বীরা তাঁদের পূর্বে মারা যাওয়া তিন প্রজন্মের ব্যক্তিদের স্মরণ বা তর্পণ করে থাকেন। এ দিন শ্রাদ্ধানুষ্ঠানের মাধ্যমে তাঁদের আত্মার শান্তি কামনা করে অঞ্জলি দেন।
Manual3 Ad Code
মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির সভাপতি গোপাল চন্দ্র দেবনাথ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “মহালয়া উদযাপন উপলক্ষে আমাদের সার্বিক প্রস্তুতি ইতিমধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে। ভোর ৬টা থেকেই আমাদের পূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে। সারাদেশে এবার ৩৩ হাজার ৮৫১টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা হবে, যা গত বছরের চেয়ে সংখ্যায় বেড়েছে।’
Manual4 Ad Code
পঞ্জিকা অনুযায়ী, এবার মহালয়ার সপ্তম দিন ১৬ অক্টোবর থেকে ষষ্ঠীপূজার মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক সূচনা হবে ছয়দিনের দুর্গোৎসবের। এরপর ১৭ ও ১৮ অক্টোবর সপ্তমী, ১৯ অক্টোবর অষ্টমী, ২০ অক্টোবর নবমী এবং ২১ অক্টোবর দশমীর সন্ধ্যায় বিসর্জনের মধ্য দিয়ে সমাপ্তি ঘটবে এ বছরের শারদীয় দুর্গোৎসবের।
Manual4 Ad Code
এ বছর হিন্দু সম্প্রদায়ের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে দুর্গাপূজার ছুটি তিনদিন পর্যন্ত বর্ধিত করেছে। সাপ্তাহিক ছুটির দিন শুক্র ও শনিবারের সঙ্গে এই বর্ধিত ছুটি যুক্ত হয়ে ২০ থেকে ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত মোট পাঁচ দিনের ছুটি পাওয়া যাবে।