আজ মঙ্গলবার, ১৭ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৪ঠা ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ভারতীয় কূটনীতিকদের পরিবার সরিয়ে নেওয়ার খবর, বাংলাদেশকে কী বার্তা দিচ্ছে?

editor
প্রকাশিত জানুয়ারি ২২, ২০২৬, ১২:২৬ পূর্বাহ্ণ
ভারতীয় কূটনীতিকদের পরিবার সরিয়ে নেওয়ার খবর, বাংলাদেশকে কী বার্তা দিচ্ছে?

Manual6 Ad Code

অনলাইন ডেস্ক:

বাংলাদেশে অবস্থিত ভারতীয় হাইকমিশন ও তাদের অন্য মিশনগুলো থেকে কূটনীতিকদের পরিবারের সদস্যদের সরিয়ে নেওয়া হবে বলে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশ হয়েছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, এর মধ্য দিয়ে মূলত বাংলাদেশকে এক ধরনের কূটনৈতিক বার্তা দেওয়া এবং চাপ প্রয়োগের চেষ্টা করা হচ্ছে।

চব্বিশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে গত দেড় বছরের বেশি সময়ে দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন চলছে।

দুই পক্ষে ভিসা কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে। দুই দেশেরই রাজনীতিবিদদের একাংশের বক্তব্য পাল্টা বক্তব্যে টানাপোড়েন বেড়েছে। এমনকি দুই দেশেই হাইকমিশনের সামনে বিক্ষোভের ঘটনায় হাইকমিশনারদের পাল্টাপাল্টি তলবের ঘটনাও ঘটেছে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, সবশেষ ক্রিকেটার মোস্তাফিজুর রহমানকে ভারতে আইপিএলে খেলতে না দেওয়া এবং এর প্রতিক্রিয়ায় টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অংশ নিতে ভারতে না যাওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত দুই দেশের সম্পর্ককে আরো জটিল করেছে।

এরইমধ্যে ভারতের কূটনীতিকদের পরিবারের সদস্যদের বাংলাদেশ থেকে সরিয়ে নেওয়ার যে বিষয়টি আলোচনায় এসেছে–– তাতে দুই দেশের সম্পর্ক আরেক দফা অবনতির দিকে এগোচ্ছে বলে মনে করছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা।

এদিকে, ভারতের পক্ষ থেকে আসলেই এরকম কোনো নির্দেশ দেওয়া হয়েছে কি না, এ বিষয়ে ভারতীয় হাইকমিশনের অন্তত দুইজন কর্মকর্তার কাছে জানতে চাইলে তারা জানান, অফিসিয়ালি বা আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো এই সিদ্ধান্ত পাননি তারা।

তবে একটি সূত্র বলছে, বাংলাদেশের বিদ্যমান নিরাপত্তা পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে সতর্কতা হিসেবে ভারতীয় মিশনগুলোয় কর্মরতদের উপর নির্ভরশীলদের ভারতে ফিরে যাওয়ার বিষয়ে উৎসাহিত করা হয়েছে।

Manual8 Ad Code

বিবিসি হিন্দির একটি প্রতিবেদনে জানানো হয়, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এখন বাংলাদেশকে ‘পরিবার-ছাড়া’ বা ‘নন ফ্যামিলি পোস্টিং’ হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ করেছে। এছাড়াও, তারা তাদের কূটনীতিকদের পরিবারের প্রত্যাবাসনের নির্দেশ দিয়েছে। এর অর্থ হলো বাংলাদেশ এখন পাকিস্তান, আফগানিস্তান বা সুদানের সমান শ্রেণীতে রয়েছে।

বাংলাদেশ কেন ভারতীয় কূটনীতিকদের নিরাপত্তা দিতে পারছে না–– এই প্রশ্নে বিবিসি হিন্দিকে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন ‘পুরোপুরি দ্বিমত’ পোষণ করে বলেছেন, “আমরা ভারতীয়দের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছি, এমন কোনো এভিডেন্স (প্রমাণ) নেই।”


মোস্তাফিজুর রহমান

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনসহ মোট পাঁচটি মিশন থেকে দেশটির কর্মকর্তাদের পরিবারের সদস্যদের সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে।

ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশন ছাড়াও চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী ও সিলেটে ভারতের সহকারী হাইকমিশন অবস্থিত।

বিবিসি হিন্দিতে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, বাংলাদেশকে একটি ‘নন-ফ্যামিলি’ পোস্টিং হিসেবে ঘোষণা করে ভারতের সিদ্ধান্ত পহেলা জানুয়ারি থেকে কার্যকর হয়েছে।

Manual7 Ad Code

ভারতীয় মিশনগুলোর কর্মকর্তাদের তাদের স্ত্রী ও সন্তানদের আট জানুয়ারির মধ্যেই ভারতে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিলো।

অর্থাৎ পনেরই জানুয়ারির মধ্যে ভারতীয় পাঁচটি মিশনের কর্মকর্তাদের পরিবারের সদস্যরা ঢাকা ত্যাগ করেছে।

যদিও নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ভারতীয় হাইকমিশনের একজন কর্মকর্তা জানান, “নির্দেশনার ব্যাপারে এখনও আমি কিছু অবগত নয়। মানে এ বিষয়ে কোনো ডিসিশন নেওয়া হলে সেটাতো পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আমাদের যেটা দিল্লিতে তারাই নেবে তো তাদের পক্ষ থেকেই জানানো হবে। যদি কিছু এ বিষয়ে জানানোর থাকে মিডিয়াকে বা সেগুলো এনে প্রেস রিলিজ দেওয়া হবে সেখান থেকেই।”

তবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই সিদ্ধান্তের আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা এখনো দেয়নি।

ভারতের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, নন-ফ্যামিলি পোস্টিং ভারতীয় কূটনীতিকদের জন্য সবচেয়ে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থাগুলোর একটি।

এই সিদ্ধান্তের ফলে বাংলাদেশকে এখন পাকিস্তান, আফগানিস্তান অথবা সুদানের কাতারে রাখা হচ্ছে।

এই বিষয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মি. হোসেন বিবিসি হিন্দিকে বলেছেন, “যদি ভারত বাংলাদেশকে পাকিস্তানের সমান স্তরে রাখে, তাহলে সেটা তাদের সিদ্ধান্ত। অবশ্যই এটা দুঃখজনক। কিন্তু আমি তাদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে পারবো না।”

এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ভারত অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।

গত বছর ডিসেম্বরে ভারতের রাজধানী দিল্লিতে বাংলাদেশ হাই কমিশনের কাছে পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে ফেলার চেষ্টা করেছে বিক্ষোভকারীরা

এ ধরনের সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ভারত বাংলাদেশের ওপর চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন।
‘বন্ধুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নয়’
চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারতে আশ্রয় দেওয়াসহ বিভিন্ন ইস্যুতে দেড় বছরে দুই দেশের সম্পর্কের টানাপোড়েন বেড়েই চলেছে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করেন।

দেশ দুটির সম্পর্কের এ ধরনের পরিস্থিতিতে ভারত বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগ করে আসছে; তা অস্বীকার করছে বাংলাদেশ।

গত ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ময়মনসিংহের ভালুকায় দীপু চন্দ্র দাস নামে এক হিন্দু যুবকের হত্যার প্রতিবাদ এবং সামগ্রিকভাবে হিন্দু নির্যাতনের অভিযোগ তুলে প্রতিবাদ জানাতে দিল্লিতে বাংলাদেশ হাই কমিশন অভিমুখে হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো বিক্ষোভও করেছে।

সর্বশেষ বাংলাদেশের খেলোয়ার মোস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএলের দল থেকে বাদ দেওয়া এবং তার প্রতিবাদে বাংলাদেশ ভারতে বিশ্বকাপ খেলতে অস্বীকৃতি জানানোর পর এই দুই দেশের মধ্যকার বৈরিতা আরও বেড়েছে।

বাংলাদেশের টিভি চ্যানেলে আইপিএল’এর ম্যাচ না দেখানোর সিদ্ধান্তও এসেছে।

ক্রিকেট ঘিরে দুই দেশের সম্পর্কের অস্থিরতার পটভূমিতে বাংলাদেশে ভারতীয় মিশনগুলোতে ‘নন-ফ্যামিলি’ পোস্টিং নিয়ে খবর নানা আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

সাবেক কূটনীতিক মুন্সী ফয়েজ আহমেদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, “এটা খুব বন্ধুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নয়, এটা বোঝা যাচ্ছে। তারপরেও সত্যি সত্যি যদি তারা নিরাপত্তার অভাব বোধ করে তবে নিয়ে যেতে পারে, কিন্তু এটা প্রথম নয়।”

বাংলাদেশ ছাড়াও এর আগে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন দেশে নানা রকম রাজনৈতিক উত্থান-পতন বা নানা কারণে ভারতের কূটনৈতিক মিশন সরিয়ে নেওয়ার নজির রয়েছে।

মি. আহমেদ জানান,এ ধরনের পরিস্থিতির পেছনে দ্বিপাক্ষিক কূটনীতির বিষয়টি নিশ্চিতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

একইসাথে, এমন সিদ্ধান্তে ভারত বাংলাদেশকে সম্পর্কের বিষয়ে নেতিবাচক একটি বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করছে বলে মনে করেন তিনি।

Manual2 Ad Code

“ভারতের পক্ষ থেকে একটি বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে বাংলাদেশকে যে তোমাদের সাথে সম্পর্ককে আর এগিয়ে নিয়ে যেতে পারছি না। বরং আরো সংকুচিত করার চিন্তাভাবনা করছি, এরকম একটা বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করছে হয়তো। একটা এক ধরনের চাপ তৈরি করা” বলেন এই কূটনীতিক।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, কেবল যুদ্ধ পরিস্থিতিতেই এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় তা নয়। বরং রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার সময় যখন কূটনীতিকরা নানা নেতিবাচক পরিস্থিতির সম্মুখীন হন, তখন এ ধরনের সিদ্ধান্ত আসে।

ভারত – বাংলাদেশ দুইপক্ষই একে অপরের ওপর চাপ সৃষ্টি করার জন্য এবং কূটনৈতিক বার্তা দেওয়ার ক্ষেত্রে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিচ্ছে বলে মনে করেন সাবেক কূটনীতিক মি. আহমেদ।

“সবসময় যে সত্যি সত্যি নিরাপত্তার অভাব হয়, তা নাও হতে পারে। অনেক সময় এটা একটা কূটনৈতিক বার্তা দেওয়ার জন্যও করা হয়” বলেন মি. আহমেদ।

তিনি মনে করেন, দুই দেশের স্বার্থেই সম্পর্ক উন্নয়ন ও আস্থার পরিবেশ তৈরি করা উচিত।

“বাংলাদেশের এখানে যেটা করা উচিত ভারতের সাথে আলোচনা করে আস্থার পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করা উচিত” বলেন মি. আহমেদ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক লাইলুফার ইয়াসমিন মনে করেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী নতুন বাংলাদেশের সম্পর্কে ভারতের কূটনীতিকদের আগ্রহ থাকলেও কট্টরপন্থী অংশ বাংলাদেশ সম্পর্কে পরিবর্তিত পরিস্থিতি বুঝতে দিচ্ছে না।

“দিল্লিতে পলিসি মেকারদের মধ্যে আগ্রহ আছে। কিন্তু তাদের চিন্তাধারা প্রকাশ পাচ্ছে না। তাদের মধ্যে কট্টরপন্থী যারা আছে, তারা এটা হতে দিচ্ছে না” বলেন মিজ ইয়াসমিন।

 

তথ্য সুএঃ বিবিসি বাংলা

Manual5 Ad Code