ক্ষুধা-দারিদ্র্যে দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে খারাপ অবস্থানে পাকিস্তান
ক্ষুধা-দারিদ্র্যে দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে খারাপ অবস্থানে পাকিস্তান
editor
প্রকাশিত অক্টোবর ১৫, ২০২৬, ০৬:১৫ অপরাহ্ণ
Manual7 Ad Code
অনলাইন ডেস্ক
অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা, খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তন ও যুদ্ধের প্রভাবে দক্ষিণ এশিয়ায় খাদ্যনিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। ২০২৬ সালের বৈশ্বিক ক্ষুধা সূচকে (জিএইচআই) দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থানে রয়েছে পাকিস্তান। বুধবার (১৪ অক্টোবর) প্রকাশিত ২০২৬ সালের বৈশ্বিক ক্ষুধা সূচকের প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
‘খাদ্যনিরাপত্তা ছাড়া কোনো নিরাপত্তা নেই’ (নো সিকিউরিটি উইদাউট ফুড সিকিউরিটি) এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে প্রতিবেদনটি যৌথভাবে প্রকাশ করেছে ওয়েলথাঙ্গারহিলফে, রুর বিশ্ববিদ্যালয় বোখুমের শান্তি ও সশস্ত্র সংঘাতবিষয়ক আন্তর্জাতিক আইন ইনস্টিটিউট এবং সুইজারল্যান্ডভিত্তিক সংস্থা হেলভেটাস।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ায় ক্ষুধা পরিস্থিতির উন্নতি কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে ২০১৮ সালের পর থেকে খাদ্যনিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে।
Manual2 Ad Code
পাকিস্তানে অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে। ফলে অনেক পরিবারের জন্য পর্যাপ্ত খাবার সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশটিতে অপুষ্টির মাত্রা ২০১৮ সালের নিম্ন পর্যায় থেকে বেড়ে মাঝারি পর্যায়ে পৌঁছেছে। একই সময়ে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে তীব্র অপুষ্টি বা ওয়েস্টিংয়ের হারও উচ্চ ঝুঁকির সীমার দিকে এগিয়েছে।
Manual4 Ad Code
তবে পাকিস্তানে শিশুদের বয়সের তুলনায় কম উচ্চতা বা স্টান্টিংয়ের হার কমছে। বিপরীতে, আফগানিস্তানে ২০১৮ সালের পর থেকে এ হার কিছুটা বেড়েছে। দুই দেশেই ২০০০ সালের তুলনায় শিশুমৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। আগে এ হার অত্যন্ত উচ্চ পর্যায়ে থাকলেও বর্তমানে তা মাঝারি পর্যায়ে নেমে এসেছে।
দক্ষিণ এশিয়ায় ক্ষুধা পরিস্থিতি এখনও উদ্বেগজনক
২০২৬ সালের বৈশ্বিক ক্ষুধা সূচকে দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক স্কোর ২৩ দশমিক ৫, যা গুরুতর ক্ষুধা পরিস্থিতির ইঙ্গিত দেয়। ২০০০ সালে এই স্কোর ছিল ৩৭ দশমিক ৫। অর্থাৎ দীর্ঘ সময়ে অগ্রগতি হলেও এর বেশির ভাগই হয়েছে ২০১৮ সালের আগে।
২০০০ সালের পর পাকিস্তান ও আফগানিস্তান উভয় দেশই ক্ষুধার ‘ভয়াবহ’ শ্রেণি থেকে ‘গুরুতর’ শ্রেণিতে এসেছে। তবে শিশুদের বয়সের তুলনায় কম উচ্চতার হার এখনো অনেক বেশি। প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার উচ্চ মাত্রা অব্যাহত থাকতে পারে।
অতিবৃষ্টি ও বন্যায় পাকিস্তান ও বাংলাদেশের কয়েকটি এলাকায় ফসলের ক্ষতি হয়েছে। অন্যদিকে, ২০২৬ সালের শস্য উৎপাদন মৌসুমে আফগানিস্তানে স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টিপাত এবং বেশি তাপমাত্রা ফসল উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
Manual6 Ad Code
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত দক্ষিণ এশিয়ায়, ইরানসহ, প্রায় ২১ কোটি ৮০ লাখ মানুষ অপুষ্টিতে ভুগেছে। এ সংখ্যা বিশ্বজুড়ে অপুষ্টিতে থাকা মানুষের মোট সংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।
বিশ্বজুড়েও বাড়ছে ক্ষুধা
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় দুই দশকের অগ্রগতির পর বিশ্বজুড়ে ক্ষুধা পরিস্থিতি আবার খারাপ হচ্ছে। ২০২৬ সালে বৈশ্বিক ক্ষুধা সূচকের স্কোর দাঁড়িয়েছে ১৮ দশমিক ১, যা ২০১৮ সালের ১৭ দশমিক ৬-এর চেয়ে বেশি।
২০১৮ সালের পর থেকে ৩২টি দেশে ক্ষুধা বেড়েছে। আর ২০৩০ সালের মধ্যে ক্ষুধার মাত্রা অন্তত নিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনার লক্ষ্য অর্জনেও ৫৭টি দেশ পিছিয়ে পড়ার পথে রয়েছে।
ক্ষুধা সূচকের চারটি প্রধান নির্দেশকের মধ্যে তিনটিরই অবনতি হয়েছে। এগুলো হলো অপুষ্টির হার, শিশুদের বয়সের তুলনায় কম উচ্চতা এবং শিশুদের তীব্র অপুষ্টি। শুধু শিশুমৃত্যুর হার সামান্য কমেছে।
Manual2 Ad Code
যুদ্ধ ও জলবায়ু পরিবর্তনে বাড়ছে খাদ্যের দাম
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বর্তমানে রাষ্ট্রভিত্তিক সশস্ত্র সংঘাতের সংখ্যা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এর সঙ্গে ঘন ঘন চরম আবহাওয়ার ঘটনা যুক্ত হয়ে বিশ্বজুড়ে খাদ্যসংকট আরও তীব্র করছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইরানকে কেন্দ্র করে যুদ্ধ এবং হরমুজ ও বাব আল-মানদেব প্রণালিতে নৌপরিবহনে বিঘ্নের কারণে জ্বালানি, পরিবহন ও সার উৎপাদনের ব্যয় বাড়ছে। এর প্রভাব পড়ছে কৃষি উৎপাদন ও খাদ্যের বাজারদরে।
এছাড়া রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং কৃষ্ণসাগর দিয়ে পণ্য রপ্তানিতে বিধিনিষেধের কারণে গমের দাম বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এতে বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর মানুষের জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্য কেনা আরও কঠিন হয়ে উঠছে।
খাদ্যনিরাপত্তায় আন্তর্জাতিক সহায়তা কমছে
খাদ্যসংকট মোকাবিলায় আরেকটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে আন্তর্জাতিক অর্থায়ন কমে যাওয়া। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খাদ্যনিরাপত্তা খাতে আন্তর্জাতিক ব্যয় কমে ২০১৬-২০১৭ সালের পর্যায়ে নেমে এসেছে।
এর ফলে বিভিন্ন সহায়তা কর্মসূচি সংকুচিত হচ্ছে এবং জরুরি খাদ্য বরাদ্দ কমাতে হচ্ছে। সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠছে।
এ অবস্থায় মানবিক সহায়তা ও খাদ্যনিরাপত্তা-সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহে অর্থায়ন কমানোর সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে সরকারগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে প্রতিবেদনটির প্রণেতারা। ভবিষ্যতের খাদ্যসংকট প্রতিরোধ, আগাম ঝুঁকি শনাক্তকরণ এবং সংকট মোকাবিলায় পর্যাপ্ত অর্থায়ন নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনটির সামগ্রিক পর্যবেক্ষণ হলো, যুদ্ধ, জলবায়ুগত বিপর্যয় ও অর্থনৈতিক চাপ একসঙ্গে মোকাবিলা করা না গেলে বিশ্বজুড়ে ক্ষুধা কমানোর লক্ষ্য অর্জন আরও কঠিন হয়ে পড়বে। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার মতো জনবহুল অঞ্চলে খাদ্যের সহজলভ্যতা ও ক্রয়ক্ষমতা নিশ্চিত করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ।