আজ শনিবার, ৫ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২১শে ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিএনপি-জামায়াত কি জাতীয় সরকার গঠন করবে?

editor
প্রকাশিত জানুয়ারি ৯, ২০২৬, ০১:৫০ অপরাহ্ণ
বিএনপি-জামায়াত কি জাতীয় সরকার গঠন করবে?

Manual7 Ad Code

অনলাইন ডেস্ক:

বাংলাদেশে ১২ই ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনের পর জাতীয় সরকার সরকার গঠনের কথা বলছে জামায়াতে ইসলামী। আর বিএনপি বলছে জাতীয় ঐকমত্যের সরকার গঠনের কথা।

প্রশ্ন উঠছে, বিএনপি ও জামায়াতের দুটি প্রস্তাবের মধ্যে কোনো যোগসূত্র আছে কি না অথবা কোনো পার্থক্য আছে কি না?

সম্প্রতি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে এক বৈঠকের পর জামায়াতের আমির শফিকুর রহমানের বক্তব্য ঘিরে জাতীয় সরকার গঠনের প্রশ্ন নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

যদিও সেই বৈঠকে জামায়তের আমির সুনির্দিষ্ট কোনো সরকার কাঠামোর কথা বলেননি।

কিন্তু তার বক্তব্যে এসেছে যে, নির্বাচনের পরপরই সরকার গঠনের আগে তারা বিএনপি নেতার সঙ্গে কথা বলতে চান। তারা জাতির স্থিতিশীলতার স্বার্থে সিদ্ধান্ত নিতে চান সবাই মিলেমিশে।

এই বক্তব্যকে ‘ইঙ্গিতপূর্ণ’ বলে বর্ণনা করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। তারা বলছেন, জামায়াত নির্বাচন পরবর্তী সরকার গঠনের বিষয়কে আলোচনায় রাখতে চাইছে বলে তাদের ধারণা।

ইতিমধ্যে আলোচনায় অনেক ডালা-পালা মেলেছে; শেষপর্যন্ত বিএনপি-জামায়াত মিলে জাতীয় সরকার গঠনের সম্ভবনা আছে কি না, আবারও কি একপক্ষীয় সংসদ হচ্ছে অথবা সংসদে বিরোধী দল থাকবে কি না-এ ধরনের নানা আলোচনা চলছে।

কেন এত আলোচনা
তারেক রহমানের সঙ্গে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমানের বৈঠকটি ছিল ভিন্ন এক প্রেক্ষাপটে।

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মৃত্যুর একদিন পর পহেলা জানুয়ারি দলটির গুলশানের কার্যালয়ে শোকবইয়ে স্বাক্ষর করতে গিয়েছিলেন শফিকুর রহমান। সে সময়ই জামায়াত নেতা বৈঠক করেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের সঙ্গে।

ভিন্ন এক পরিস্থিতিতে বৈঠক হলেও জামায়ত নেতা রাজনীতি ও নির্বাচনের পরে সরকার গঠনের প্রশ্নে তাদের দলের মনোভাব তুলে ধরেন।

বৈঠক শেষে জামায়াতের আমির সাংবাদিকদের বলেছিলেন,”আমরা বলেছি যে, পাঁচটা বৎসরের জন্য জাতির স্থিতিশীলতার স্বার্থে, একটা সুন্দর পরিবেশ ফিরিয়ে আনার স্বার্থে, আমরা সবাই মিলেমিশে ভালো কোনো চিন্তা করতে পারি কি না, সেটাও আমাদের চিন্তা করা দরকার।

Manual2 Ad Code

“আমরা এটাও বলেছি, নির্বাচনের পরপরই সরকার গঠনের আগেই আমরা ইনশা আল্লাহ বসব; খোলা মনে কথা বলব। জাতির জন্য আমরা চিন্তা করব; জাতির জন্য আমরা সিদ্ধান্ত নেব।”

জামায়াত নেতা তার এই বক্তব্যে নির্বাচন পরবর্তী সরকার কাঠামো নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো প্রস্তাব দেননি। কিন্তু নির্বাচনের পরে সরকার গঠনের আগে বিএনপির সঙ্গে বসতে চাওয়ার বিষয়টিই নানা আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা যেমন ওই বক্তব্যকেই ‘ইঙ্গিতপূর্ণ’ বলে মনে করছেন। জামায়াতের আমির শফিকুর রহমানও বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, তার বক্তব্যে একটা ‘ইঙ্গিত’ রয়েছে। যদিও তিনি ইঙ্গিতের বিষয়ে খোলাসা করেন নি।

কিন্তু তিনি বলেছেন, নির্বাচনের পরে দলগুলোর মধ্যে একমত্য ও সহযোগিতার মাধ্যমে দেশ পরিচালনার করার বার্তা তিনি দিয়েছেন।

এর কারণ ব্যাখ্যায় সফিকুর রহমানের বক্তব্য হচ্ছে, আওয়ামী লীগের দীর্ঘ সাড়ে পনেরো বছরের শাসনে দেশের অর্থনীতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিসহ সব ক্ষেত্রই ভেঙে পড়েছে। সেই পরিস্থিতি এখনও সামাল দেওয়া যায়নি।

সেখানে একমত্য ও সহযোগিতা ছাড়া কোনো দলের এককভাবে দেশ চালানো বেশ কঠিন বা চ্যালেঞ্জের। আর সেই বিবেচনা থেকে রাষ্ট্র পরিচালনায় সব দলের মধ্যে ঐকমত্য থাকা প্রয়োজন বলে জামায়াত মনে করছে।

তবে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর যে সম্পর্ক এখন প্রকাশ্য বা দৃশ্যমান, তাতে টানাপোড়েন বা এক ধরনের বৈরিতাও দেখা যাচ্ছে।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের শাসনের পতনের পর বিএনপির পুরোনো মিত্র জামায়াতই তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বি হয়ে উঠেছে। দল দুটির নেতাদের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য বা পাল্টাপাল্টি অভিযোগ করতে দেখা যাচ্ছে।

জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে দল দুটি নেতৃত্ব দিচ্ছে দুই শিবিরের।

বিশ্লেষকদের কেউ কেউ যদিও বলছেন, রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর যেহেতু একটা বড় দল আওয়ামী লীগ ও এর মিত্ররা রাজনীতিতে অনুপস্থিত। সেই শূন্যতায় নির্বাচনে একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক পরিবেশ দেখানো বা তৈরি করাও সক্রিয় দলগুলোর লক্ষ্য হতে পারে।

কিন্তু আওয়ামী লীগের শাসনের সময়ই সেই সরকার বিরোধী আন্দোলনে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে সম্পর্কের টানাপোড়েন প্রকাশ্যে আসে। তখন বিএনপি তাদের যুগপৎ আন্দোলনে জামায়াতকে সাথে রাখেনি। জামায়াত আলাদাভাবে আন্দোলন করেছে।

এমন প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষকদের অনেকে আবার মনে করেন, নিজ নিজ দলের রাজনৈতিক স্বার্থ থেকেই বিএনপি ও জামায়াতের সম্পর্কের টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে কয়েক বছর আগে; যা এখন বেড়েছে।

ফলে বিএনপি বা জামায়াত, যে দলই নির্বাচনে জয়ী হোক-তারা একে অপরের সরকারে অংশীদার হবে কি না, সেই প্রশ্ন রয়েছে বিশ্লেষকদের অনেকের।

তারা বলছেন, রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে বর্তমানে সক্রিয় সব দলই অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর তাদের প্রভাব আছে বলে মনে করছে এবং অনেক ক্ষেত্রে তারা ফলও পাচ্ছে। এই বাস্তবতায় দলগুলোর মধ্যে ক্ষমতার সঙ্গে থাকার আকাঙ্খা বেড়েছে।

লেখক ও বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, জামায়াত ক্ষমতার সাথে থাকতে চায়। সেকারণে দলটির পক্ষ থেকে নির্বাচনের পর সরকার গঠনের আগে বিএনপির সঙ্গে আলোচনা চেয়েছে।

যদিও জামায়াত নেতারা এ বক্তব্য মানতে রাজি নয়। তারা যেই সরকার গঠন করুক, সেই সরকারের সব দলের সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার কথা যুক্তি হিসেবে তুলে ধরছে।

জামায়াত কি বিএনপির সঙ্গে সরকারে থাকতে চায়?
নির্বাচনের পরে জাতীয় সরকার গঠনের কথা বলছে জামায়াত। এটি তাদের দলের প্রস্তাব। তবে দলটির আমির জানিয়েছেন, তাদের তিনটি শর্ত আছে।

Manual3 Ad Code

প্রথমত, দুর্নীতিকে কোনোভাবে প্রশ্য় দেওয়া যাবেনা; দমনে কঠোর অবস্থানে থাকতে হবে। দ্বিতীয়ত, সরকার বিচার বিভাবে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। আর তৃতীয় শর্ত হচ্ছে, জুলাই আন্দোলনের চেতনায় যে সব সংস্কার প্রস্তাবে সব দল একমত হয়েছে, সেগুলো কাগজে-কলমে না রেখে বাস্তবায়ন করতে হবে।

জামায়াত যদি নির্বাচনে জয়ী হয়, তাহলে এই তিন শর্তে যারা সম্মত থাকবে তাদের নিয়ে দলটি জাতিয় সরকার গঠন করবে।

জামায়াতের আমিরের বক্তব্য হচ্ছে, তারা কোনো সরকারে গিয়ে সেই সরকারের দুর্নীতির দায় নিতে রাজি নন।

তার এই বক্তব্য বিএনপির দিকেই ইঙ্গিত করে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করেন। তারা বলছেন, বিএনপিকে বাদ রাখার চিন্তা থেকেই জামায়াত তিনটি শর্তের কথাও বলছে।

তবে সরকার গঠনের আগে বিএনপি নেতার সঙ্গে আলোচনা চেয়ে জামায়াত নেতা যে বক্তব্য দিয়েছেন, তাতে তাতে দলটি বিএনপির সঙ্গে সরকারে যেতে চায় কি না, সেই প্রশ্ন আলোচনায় রয়েছে।

জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান বলেছেন, জামায়াতকে বাদ দিয়েই বিএনপি ঐকমত্যের সরকার গঠনের কথা বলে আসছে। একইসঙ্গে তিনি বলেন, বর্তমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় রাষ্ট্র পরিচালনায় সবদলের ঐকমত্য ও সহযোগিতার বিষয় তারা সামনে আনছেন।

জামায়াত সরকার গঠনের সুযোগ পেলে তাদের জাতীয় সরকারের প্রস্তাব নিয়ে এগোবে। আর বিএনপি সরকার গঠন করতে পারলে সেই সরকারের তারা সহোগিতা করতেচায়।

Manual5 Ad Code

ইসলামী আন্দোলন, জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপিসহ যে ১০টি দল জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনের আসনসমঝোতা করছে, সেই দলগুলোও তিন শর্তে জাতীয় সরকার গঠনের প্রস্তাবের পক্ষে রয়েছে।

Manual7 Ad Code

এছাড়া এই দলগুলোর কোনো কোনো দল অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের সময় জাতীয় সরকার গঠনের প্রস্তাব তুলেছিল। বিএনপি ও এর মিত্ররা রাজি না হওয়ায় তখন দলগুলোর প্রতিনিধি নিয়ে জাতীয় সরকারগঠন করা হয়নি বলে একাধিক রাজনীতিক জানিয়েছেন।

 

তথ্য সুএঃ বিবিসি বাংলা