আজ শুক্রবার, ১৭ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২রা শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বাংলাদেশে কবে কাদের দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে?

editor
প্রকাশিত জানুয়ারি ১৩, ২০২৬, ০৩:৪৭ অপরাহ্ণ
বাংলাদেশে কবে কাদের দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে?

Manual4 Ad Code

অনলাইন ডেস্ক:

দায়মুক্তি! গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে ঘুরেফিরে বারবার সামনে এসেছে এই প্রসঙ্গ। সম্প্রতি এ নিয়ে আইন উপদেষ্টার বক্তব্যের পর আবার শুরু হয় আলোচনা-সমালোচনা।

Manual6 Ad Code

গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া ‘জুলাই যোদ্ধাদের’ দায়মুক্তি আইনটি কোন সময় অব্দি জারি করা হবে তা এখন পর্যন্ত পরিষ্কার নয়। তবে এবারও আইন করার ক্ষেত্রে অতীতেই ঘটনাগুলোই আলোচনায় আসছে।

কারণ বাংলাদেশের রাজনীতিতে এর আগেও অন্তত তিনবার আইন ও অধ্যাদেশ জারি করে দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে।

আর রাজনীতির বাইরে ২০১০ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধির জন্য আইন করে সংশ্লিষ্টদের দায়মুক্তি দেওয়া হয়।

দেখা যাচ্ছে শেখ মুজিবুর রহমান, জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়া, শেখ হাসিনা – সবার আমলেই দেওয়া হয়েছে দায়মুক্তির আইনি ভিত্তি। তবে এর কোনোটিই পরবর্তী সময়ে আর কার্যকর থাকেনি।

ফলে এই সময়ে এসে জুলাই যোদ্ধাদের দায়মুক্তি দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা ও যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন অনেকে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপটে দায়মুক্তি দেওয়ার উদাহরণ থাকলেও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তা বরাবরই ব্যবহার করা হয়েছে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে।

একইসাথে বিচার পাওয়া মানুষের মৌলিক অধিকার। ফলে আইন করে যদি সেই অধিকার হরণ করা হয়, তবে তা কখনো তা ‘সংবিধানসংগত হয় না’ বলেও তারা মনে করছেন।


ছবির ক্যাপশান,১৯৭৫ সালের ২৬শে সেপ্টেম্বর জারি করা ‘ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ’

Manual4 Ad Code

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রথমবারের মতো দায়মুক্তি দেওয়া হয় বিতর্কিত রক্ষীবাহিনীকে।

শেখ মুজিবুর রহমান রাষ্ট্রপতি থাকাকালে ১৯৭২ সালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় গঠিত এই আধাসামরিক বাহিনীর জন্য একটি অধ্যাদেশ জারি করা হয়।

রক্ষীবাহিনীর বিরুদ্ধে নানা ধরনের স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ নিয়ে সমালোচনা যখন বাড়ছিল, তখন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বদলে ১৯৭৪ সালে অধ্যাদেশে সংশোধনী এনে বাহিনীর সব কাজকে আইনসঙ্গত বলে ঘোষণা করে তৎকালীন সরকার।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, পরবর্তী সময়ে বিচারপতি দেবেশ চন্দ্র ভট্টাচার্য এই সংশোধনীকে অসাংবিধানিক বলে রুল জারি করেন।

পরে ১৯৭৫ সালের ১৭ই ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয়বারের মতো অধ্যাদেশের সংশোধনী আনা হয় এবং সেখানে নির্দিষ্ট অপরাধের জন্য শাস্তির উল্লেখ করা হয়।

একই বছর শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যাকাণ্ডের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে রক্ষীবাহিনী বিলোপ করে সেনাবাহিনীর অন্তর্ভুক্ত করা হয় এবং এসংক্রান্ত আদেশ রদ করা হয়।

আবার এই আদেশের এক সপ্তাহ আগেই, ২৬শে সেপ্টেম্বর দ্বিতীয়বারের মতো জারি করা হয় ‘ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ’।

এতে বলা হয়, শেখ মুজিব ও তার পরিবারের সদস্যদের হত্যাকারীদের বিচার করা যাবে না। চার বছর পর ১৯৭৯ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমলে সংসদে আইনটি অনুমোদন পায়।

২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার রাষ্ট্র ক্ষমতায় এলে সংসদে আইনটি বাতিল করা হয়, পরে কার্যকর হয় হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িতদের মধ্যে ছয়জনের বিচার ও শাস্তি।

২০০৩ সালের যৌথ অভিযান দায়মুক্তি আইন
ছবির ক্যাপশান,২০০৩ সালে ‘অপারেশন ক্লিনহার্টের’ সাথে সংশ্লিষ্টদের আইন করে দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছিল।

তৃতীয়বারের মতো বাংলাদেশে এই ঘটনা ঘটে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের সময় – ২০০৩ সালে। সেময় আইনশৃঙ্খলার যুক্তিতে পরিচালিত ‘অপারেশন ক্লিনহার্টের’ সাথে সংশ্লিষ্টদের জন্য যৌথ অভিযান দায়মুক্তি আইন করা হয়।

সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে ওই অভিযানে ৪০ জনেরও বেশি মানুষ হেফাজতে মারা যাওয়ার খবর প্রকাশিত হয় গণমাধ্যমে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসব মৃত্যু হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার কারণে ঘটেছে বলে দাবি করে তৎকালীন সরকার।

দায়মুক্তি দেওয়ার আইনটি চ্যালেঞ্জ করে রিট করা হলে ১২ বছর পর ২০১৫ সালে একে অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্ট।

Manual5 Ad Code

যদিও বাতিল ঘোষিত দায়মুক্তি আইনটি আইন ও বিচার মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে এখনো কার্যকর দেখানো হচ্ছে। সংসদেও বিলুপ্ত হয়নি আইনটি।

দায়মুক্তি নিয়ে সংবিধান বিশেষজ্ঞ শাহদীন মালিক বিবিসি বাংলাকে বলেন, “বিচার চাওয়ার অধিকারটা হলো আমার এক নম্বর মৌলিক অধিকার। আপনি বিচার চাইতে পারবেন না, এটা তো কোনো আইন করে বন্ধ করা কখনো সংবিধানসংগত হয় না”।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমানের মতে, জাতি গঠনের সাথে দায়মুক্তির সম্পর্ক রয়েছে। জাতীয় অখণ্ডতা ও সম্প্রীতি ধরে রাখতে এবং ভবিষ্যতে এ নিয়ে যেন কোনো ঝামেলা তৈরি না হয় এজন্য দায়মুক্তির প্রসঙ্গটা আসে।

কিন্তু বাংলাদেশে বরাবরই তা রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “কতিপয় ব্যক্তিকে কিংবা কতিপয় গোষ্ঠীকে কিংবা একটা বিশেষ বাহিনীকে কিংবা একটা রাজনৈতিক দলকে রক্ষা করার জন্য এই আইনগুলো করা হয়েছে”।

ছবির ক্যাপশান,সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও সিনিয়র আইনজীবী শাহদীন মালিক

মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ টেনে ‘জুলাই যোদ্ধাদের’ দায়মুক্তি কতটা যৌক্তিক?
২০২৪ সালের পাঁচই অগাস্ট গণঅভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে এর তিনদিন পর গঠিত হয় অন্তর্বর্তী সরকার।

গত ১৭ মাসে আন্দোলনের সাথে সংশ্লিষ্ট এবং সরকারে থাকা উপদেষ্টাদের কয়েকজনকে ‘জুলাই যোদ্ধাদের’ দায়মুক্তি দেওয়া নিয়ে আলাপ তুলতে দেখা গেছে। জুলাই সনদেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এই বিষয়টি।

সবশেষ হবিগঞ্জে থানায় বসে একজন সমন্বয়কের পুলিশ কর্মকর্তাকে হুমকি দেওয়া এবং ঢাকা থেকে চাঁদাবাজির অভিযোগে আটককৃত আরেকজন সমন্বয়ককে ঘিরে যখন আলোচনা তৈরি হয়েছে, তার মধ্যেই গত বৃহস্পতিবার ‘জুলাই যোদ্ধাদের’ দায়মুক্তি নিয়ে আইন বিষয়ক উপদেষ্টা আসিফ নজরুল নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একটি পোস্ট দেন।

“জুলাই যোদ্ধারা জীবনবাজি রেখে দেশকে ফ্যাসিস্ট শাসন থেকে মুক্ত করেছিল। অবশ্যই তাদের দায়মুক্তির অধিকার রয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানকালে ফ্যসিষ্ট শেখ হাসিনার খুনীদের বিরুদ্ধে তারা যে প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম করেছিল সেজন্য তাদের দায়মুক্তি দিয়ে আইন প্রণয়নের প্রয়োজনও রয়েছে”, লেখেন তিনি।

একইসাথে বাংলাদেশের সংবিধানের ৪৬ অনুচ্ছেদে দায়মুক্তির আইনের বৈধতা রয়েছে উল্লেখ করে ১৯৭৩ সালে মুক্তিযুদ্ধের পর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য দায়মুক্তি আইনের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন।

তবে এমন তুলনার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

Manual6 Ad Code

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান
ছবির ক্যাপশান,

“ওইটা ছিল পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে, বিশেষ একটা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে। আর এটা একটা সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন ছিল, উইদইন দ্য কান্ট্রি (দেশের ভেতরে)। সুতরাং এই দুইটার মধ্যে কখনো তুলনা হয় না”, বলছিলেন অধ্যাপক রহমান।

তিনি আরও বলেন, “আপনি যদি দায়মুক্তির কথা আনেন, তাহলে কীসের জন্য আপনি দায় দিচ্ছেন? আপনি কী অপরাধ করলেন যে আপনি দায়মুক্তি চান? এখন আপনি যদি বলেন, আমি পুলিশ মেরে ফেলেছি, থানা জ্বালিয়ে দিয়েছি, আমি খুন করেছি, লুট করেছি – আমাকে দায়মুক্তি দেন – এটাতো ন্যায্য না”।

একই কথা বলছিলেন শাহদীন মালিকও। তার মতে, বিচার না করে দায়মুক্তি দেওয়ার বিষয়টি ইতিহাসে ভালো চোখে দেখা হবে না।

“এখন হয়তো বিপ্লবোত্তর এক, দেড় বছর হয়েছে। আমাদের মননে-চেতনায় অনেক বেশি দাগ কেটেছে। কিন্তু ১৫ বছর পরে তো লোকে ভাবা শুরু করবে, এটা কী হলো? তাদের এত লোক মেরে ফেলেছে, হত্যাকাণ্ড হয়েছে, তাদের দায়মুক্তি কেন দেওয়া হলো – এই প্রশ্নগুলো আসবে,” বলেন তিনি।

তথ্য সুএঃ বিবিসি বাংলা