আজ শুক্রবার, ১৭ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২রা শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দাবি আদায়ে বারবার সড়ক অবরোধের প্রবণতা, দায় কার?

editor
প্রকাশিত জানুয়ারি ১৫, ২০২৬, ০৫:২০ অপরাহ্ণ
দাবি আদায়ে বারবার সড়ক অবরোধের প্রবণতা, দায় কার?

Manual3 Ad Code

অনলাইন ডেস্ক:

ঢাকা আজিমপুরের বাসিন্দা সৈয়দ আবিদ হুসাইন সামি একজন গণমাধ্যমকর্মী। বুধবার (১৪ জানুয়ারি) অফিশিয়াল কাজে তার ঢাকার বাইরে যাওয়ার কথা ছিল।

স্বাভাবিক সময়ে বাসা থেকে অফিসে যাওয়ার সময় হিসেব করেই বেরিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু বিপত্তি বাধে শাহবাগ মোড়ে এসে। তার ভাষ্যমতে, আড়াইঘণ্টা কেবল ওই মোড়েই দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। কারণ, সড়ক অবরোধ।

সাত কলেজের জন্য প্রস্তাবিত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাদেশ জারি ও সহপাঠী সাকিবুল হত্যার বিচার দাবিতে গতকাল ঢাকার অন্তত পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কে আন্দোলনে নামেন শিক্ষার্থীরা।

এতে পুরো শহর প্রায় অচল হয়ে পড়ে। স্থবির হয়ে যায় জনজীবন। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বেশ কিছু ভিডিওতে সড়কে আন্দোলনকারীদের সাথে বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়তে দেখা যায় আটকে পড়া বাস ও মোটরসাইকেল চালকসহ ভুক্তভোগী যাত্রীদের।

“আমি নিজে অন্তত ২০টা অ্যাম্বুলেন্স দেখেছি ,যেগুলো সাইরেন বাজাচ্ছে কিন্তু কোনোদিকে যাওয়ার উপায় নেই”, বলছিলেন মি. সামি।

Manual3 Ad Code

দাবি আদায় না হলে আজও সড়ক অবরোধের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।

পর্যবেক্ষকদের মতে, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দাবি আদায়ের জন্য সড়ক অবরোধের ঘটনা নতুন নয়। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সেই প্রবণতা অনেক বেশি দেখা গেছে।

এক্ষেত্রে সরকারের উদাসীনতার দিকেই আঙুল তুলছেন তারা। বলছেন, নিজেদের দাবিদাওয়ার বিষয়ে বিভিন্ন উপায়ে সরকারের সাথে যোগাযোগ করা হলেও সড়কে নামার আগ পর্যন্ত সেদিকে কর্ণপাত করে না কর্তৃপক্ষ।

বুধবার সায়েন্স ল্যাব মোড়ে অবস্থান নেয় আন্দোলনকারীরা, আটকে ছিল যানবাহন
দাবি আদায়ে বারবার সড়ক অবরোধের প্রবণতা, দায় কার?

ফলে আন্দোলনকারীরা একেই বেছে নেয় দাবি আদায়ের মোক্ষম উপায় হিসেবে।

আর ঢাকার মতো একটি জনবহুল শহরের জন্য যেখানে ২০ থেকে ২৫ শতাংশ সড়ক থাকা স্বাভাবিক, সেখানে এর পরিমাণ মাত্র সাড়ে সাত শতাংশ বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

ছবির ক্যাপশান,বুধবার অবরোধের কারণে ঢাকা শহর প্রায় অচল হয়ে পড়ে। স্থবির হয়ে যায় জনজীবন।

ফলে আন্দোলন ছাড়াও কোনো কারণে শহরের একটি অংশ বন্ধ হয়ে গেলে, অচল হয়ে পড়ে পুরো শহর।

এদিকে জনভোগান্তি কমাতে নিরাপত্তা বাহিনীকে বিভিন্ন সময় কঠোর হতে দেখা গেলেও সেক্ষেত্রে পক্ষপাতের অভিযোগ তুলেছেন কেউ কেউ। যদিও পুলিশ প্রশাসনের দাবি, সর্বোচ্চ সংযমের পরও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না এলে নিয়ম অনুসরণ করে কঠোর পদক্ষেপ নেন তারা।

একদিকে অবরোধ হলেই অচল পুরো শহর

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অনেক আগে থেকেই দাবি দাওয়া আদায়ে সড়কে নামেন আন্দোলনকারী বা বিক্ষোভকারীরা। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে এদিক দিয়ে রেকর্ড করেছে।

এই সরকার শপথ নেয়ার পর থেকে এক বছরে ঢাকা ও এর আশেপাশে এক হাজার ৬০৪টি সড়ক অবরোধের ঘটনা ঘটেছে বলে গত বছরের ৩১শে অগাস্ট গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন স্বরাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা মোঃ জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী।

বলার অপেক্ষা রাখে না পরবর্তী পাঁচ মাসে এই সংখ্যা আরও বেড়েছে।

বুধবার সড়ক অবরোধের সময় একটি ভিডিওতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে কয়েকজনকে মোবাইলে লুডু খেলতে দেখা যায়। একইসময় সব আটকে থাকায় উত্তেজিত ভুক্তভোগীদের সাথে তর্কে জড়ায় আরেকটি পক্ষ।

নগর বিশেষজ্ঞদের মতে, জনসাধারণের অনুপাতে ঢাকায় গড়ে ওঠেনি যথেষ্ট পরিকল্পিত সড়ক। ফলে দুর্ঘটনা কিংবা জরুরি পরিস্থিতির কারণে একটি সড়ক বন্ধ থাকলে তার প্রভাব পড়ে পুরো শহরে।

প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) এক্সিডেন্ট রিসার্চ ইন্সটিটিউটের সাবেক পরিচালক ড. মোঃ হাদিউজ্জামান বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, ঢাকায় যে পরিমাণ জনসংখ্যা রয়েছে পুরো বাংলাদেশের হিসেবে এর পরিমাণ প্রায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ। অন্যদিকে আয়তনের দিক থেকে ঢাকা বাংলাদেশের মাত্র শূন্য দশমিক দুই শতাংশ।

আন্দোলনকারীদের সাথে বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়তে দেখা যায় আটকে পড়া বাস ও মোটরসাইকেল চালকসহ ভুক্তভোগীদের

তার ওপর গণপরিবহণের ব্যবস্থাও খুব ভালোভাবে গড়ে ওঠেনি। ‘সড়কনির্ভর’ এই শহরে ২০ থেকে ২৫ শতাংশ সড়ক ‘গ্রিড প্যাটার্নে’ থাকা উচিত ছিল বলে জানান তিনি।

অর্থাৎ নানা কারণে সড়ক যদি বন্ধ থাকে তাহলে বিকল্প দিক থাকলে প্যারালাল আরেকটা রাস্তা ব্যবহার করতে পারে জনগণ। কিন্তু ঢাকায় সড়কগুলো সেভাবে নির্মাণ করা হয়নি।

আবার ঢাকায় সড়ক আছে মাত্র সাড়ে সাত শতাংশ। তার ওপর বিক্রেতা, পার্কিংয়ের মতো কারণে মোটাদাগে ব্যবহারযোগ্য সড়ক বাকি থাকে পাঁচ শতাংশেরও কম।

ফলে কেউ যদি ঢাকার একদিকের সড়ক বন্ধ করে দেয় পুরো শহর থমকে ‘শক ওয়েভ’ তৈরি করে অর্থাৎ কোথাও আটকে গেলে আর কোনো বিকল্প সড়ক খুঁজে পাওয়া যায় না বলে মন্তব্য করেন অধ্যাপক হাদিউজ্জামান।

“ঢাকা ভরাক্রান্ত। সড়কের পরিমাণ কম, ইলপ্ল্যানড (অপরিকল্পিত)। কোনো গ্রিড প্যাটার্ন নেই এবং অনাকাঙ্ক্ষিত বা সারপ্রাইজিং যে জিনিসগুলো আমরা দেখছি, এটাকে সামাল দেয়ার মতো সক্ষমতা আসলে ঢাকা শহরের নেই”, বলেন তিনি।

সরকারের উদাসীনতার অভিযোগ
দাবি আদায়ে সড়ক অবরোধের কারণ হিসেবে কর্তৃপক্ষের উদাসীনতাকেই কারণ হিসেবে দেখছেন বিশ্লষকরা।

“কোনো সমস্যা নিয়ে, কোনো দাবি দাওয়া নিয়ে নিয়মতান্ত্রিকভাবে আলোচনা কিংবা বিতর্ক কিংবা সরকারের সাথে একটা মতবিনিময় বা যুক্তিযুক্তভাবে অগ্রসর হওয়া- এই প্রক্রিয়াটাই বাংলাদেশে ঠিকমতো দাঁড়ায়নি”, বলছিলেন অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ।

স্মারকলিপি, চিঠি বা লিখিত উপায়ে যোগাযোগ করা হলে কর্তৃপক্ষের দিক থেকে কোনো জবাব, এমনকি গণমাধ্যমের মনোযোগ পাওয়া যায় না বলে মন্তব্য করেন তিনি। তবে একই বিষয়ে যদি প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয়, তখন তা যেমন খবরের শিরোনাম হয়, তেমনি নজরেও আসে সরকারের।

ফলে এই প্রবণতা না বদলালে একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি হতে থাকবে বলে মনে করেন অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ।


অবরোধের কারণে ভোগান্তিতে পড়েন যাত্রীরা

গতকাল ছড়িয়ে পড়া আরেকটি ভিডিওতে দেখা যায় ফার্মগেট এলাকায় আন্দোলনকারীরা সড়কে ব্যারিকেড দেয়ার চেষ্টা করলে তাদের বাধা দেয় দায়িত্বরত নিরাপত্তা বাহিনীর কয়েকজন সদস্য। এসময় দুই পক্ষের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনাও ঘটে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মোঃ আনিছুর রহমানের দাবি, এধরনের ঘটনাগুলোর ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ধৈর্য ও সংযমের পরিচয় দেয় নিরাপত্তা বাহিনী। কিন্তু তারপরও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না এলে পিআরবি বা পুলিশ রেগুলেশন্স বেঙ্গলের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেন তারা।

Manual4 Ad Code

“প্রথমে বোঝাবো, তারপর ওয়ার্নিং দেবো, এরপর আমরা জলকামান ইউজ করবো, এরপর সাউন্ডগ্রেনেড ইউজ করবো, এভাবে আস্তে আস্তে জিনিসটার মাত্রাটা আমরা বাড়াই”, বলেন মি. রহমান।

পর্যবেক্ষকরা বলছেন, সড়ক অবরোধের মতো কর্মকান্ডে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের সংশ্লিষ্টতা থাকলেও যে ক’বার নিরাপত্তা বাহিনীকে বলপ্রয়োগ করতে দেখা গেছে, তা ছিল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক বা শ্রমিক শ্রেণির ওপর।

Manual7 Ad Code

“সরকার আবার দেখে কাকে মার দেয়া যায়, কাকে দেয়া যায় না। শ্রমিকদের মার দেয়া যায়, প্রাথমিক শিক্ষকদের মার দেয়া যায়। কিন্তু এখন যেহেতু শিক্ষার্থীদের গায়ের জোর বেশি তুলনামূলকভাবে, সুতরাং তারা এসে ঘেরাও করছে, অবরোধ করছে”, বলেন অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ।

যদিও সেই বক্তব্য মানতে রাজি নন অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মোঃ আনিছুর রহমান। বরং এসব ক্ষেত্রে বয়সের দিকটিকে গুরত্ব দেয়া হয় বলে জানান তিনি। বলেন, কোথাও ২০ বছরের কম বয়সী মানুষজন জড়ো হলে তাদের আলাদাভাবে চিন্তা করা হয়। কারণ ‘সাইকোলজিক্যাল ইমোশন’ বা মানসিক আবেগ সেক্ষেত্রে একটি ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়ায়।

Manual5 Ad Code

এই বয়সীদের মধ্যে ‘ফুল ম্যাচিউরিটি আসে না’। “এখন ম্যাচিউরড এবং ইমম্যাচিউরডদের একই দৃষ্টভঙ্গিতে দেখা হলে টোটাল জাস্টিস এনসিওর (নিশ্চিত) করা যায় না”, বলেন তিনি।

 

তথ্য সুএঃ বিবিসি বাংলা