সারাদেশে ১১ মাসে ১৩ হাজার ৪৯১ জন আত্মহত্যা,দিনে গড়ে ৪১জন আত্মহত্যা
সারাদেশে ১১ মাসে ১৩ হাজার ৪৯১ জন আত্মহত্যা,দিনে গড়ে ৪১জন আত্মহত্যা
editor
প্রকাশিত জানুয়ারি ২৭, ২০২৬, ০৪:৪২ অপরাহ্ণ
Manual4 Ad Code
অনলাইন ডেস্ক:
প্রতিদিন রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে। পুলিশ সদরদপ্তর সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সারাদেশে ১৩ হাজার ৪৯১ জন আত্মহত্যা করেছেন। গড়ে দিনে আত্মহননের সংখ্যা ৪১। ডিসেম্বর মাসের পরিসংখ্যান তৈরি না হওয়ায় তথ্য পাওয়া যায়নি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির আর্থিক সহায়তায় জাতীয় জরিপ (২০২২-২৩) করেছে সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ, বাংলাদেশ (সিআইপিআরবি)। তারা বলছে, ২০২৩ সালে বাংলাদেশে ২০ হাজার ৫০৫ জন আত্মহত্যা করেন। পুলিশের হিসাব অনুযায়ী ২০২৪ সালে আত্মহত্যা করেছেন ১৩ হাজার ৯২০ জন।
সম্প্রতি আত্মহত্যা করেছেন এমন নারী-পুরুষের ১০টি পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে সমকাল। স্বজনের আত্মহত্যার কারণ জানতে চাওয়া হয় তাদের কাছে। তারা জানান, ঘটনার পেছনে রয়েছে পারিবারিক কলহ, দাম্পত্য সংকট, আর্থিক, সামাজিক চাপ, মানসিক জটিলতা ও বিষণ্নতা। এরা কেউ মানসিক চাপ বা বিষণ্নতা কমাতে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হননি।
Manual8 Ad Code
সর্বশেষ গতকাল সোমবার গাজীপুরের পুবাইলে রেলক্রসিংয়ে দুই সন্তানসহ ট্রেনের নিচে ঝাঁপিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করেন গৃহবধূ হাফেজা খাতুন মালা (৩৫)। গত ১৬ জানুয়ারি রাতে স্বামীর সঙ্গে দাম্পত্য কলহের জেরে রাজধানীর বড় মগবাজারে ভাড়া বাসায় আত্মহত্যা করেন গৃহবধূ শম্পা আক্তার রিভা (২৬)। গত ১৬ ও ১৭ জানুয়ারি দুই দিনে রাজধানীতে অন্তত ছয়জন আত্মহত্যা করেন।
আত্মহত্যার আগ মুহূর্তে স্বামী সুমনের মোবাইল ফোনে ভয়েস মেসেজ পাঠিয়েছিলেন শম্পা আক্তার রিভা। তিনি বলেছেন, ‘সুমন, আজ কিন্তু আমার কোনো দোষ ছিল না। আমি হাসিখুশিতে ভাইয়াকে ভাত দিলাম। তুমি আমাকে শাউটিং (চিৎকার) করে কথা বললা। তোমার থেকে আমি মোবাইল চাইনি। আমি কিন্তু আইছি তোমার কাছ আশ্রয় নিয়ে। তুমি সবাইকে বলছো, আমি এটা করি, ওটা করি …।’
মানসিক চাপ ও বিষণ্নতায় গত শনিবার খিলগাঁওয়ে শাহানুর রহমান (৪৪) নামে এক ব্যাংক কর্মকর্তা আত্মহত্যা করেন। তাঁর ভাই মোস্তাফিজুর রহমান জানান, প্রায় দুই মাস আগে শাহানুরের সঙ্গে স্ত্রীর বিচ্ছেদ হয়েছে। এ নিয়ে তিনি বিষণ্নতায় ভুগছিলেন। এ ছাড়া কিছু ব্যক্তিগত ঋণসহ বিভিন্ন বিষয়ে মানসিক চাপে ছিলেন।
Manual3 Ad Code
শম্পা আক্তার রিভার স্বামী মো. সুমন দাবি করেন, তাঁর স্ত্রী জেদি প্রকৃতির ছিলেন। সংসারে ছোটখাটো বিষয় নিয়ে তর্কবিতর্ক হলেও সেটি দীর্ঘ সময় মনের মধ্যে পুষে রাখতেন।
শম্পার বাবা আকরাম হোসেন বলেন, সুমন ও শম্পা প্রেম করে বিয়ে করেছিল। এরপরও তাদের দুজনের মধ্যে পারিবারিক কলহ দেখা দেয়।
ফরিদপুর মেডিকেল কলেজের মনোরোগবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘মানুষ কখনও একটি কারণে আত্মহত্যা করে না। একাধিক কারণ দীর্ঘ সময় ধরে মানুষের ভেতরে জমতে জমতে আত্মহত্যার প্রবণতা তৈরি হয়। মানুষের ব্যক্তিত্বও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে যারা নিয়মকানুন মেনে চলে, দায়িত্ববোধে তাড়িত হয়ে সমাজের জন্য নিজেকে বিলিয়ে দিতে চায়– এ ধরনের মানুষের মধ্যে আত্মহত্যার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।’
Manual8 Ad Code
তিনি জানান, যখন মানসিক স্বাস্থ্য বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে, তখন আত্মহত্যার ঝুঁকি তৈরি হয়। সময়মতো ও বিজ্ঞানভিত্তিক চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে আত্মহত্যা অনেকাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব।
সম্পর্কজনিত বিরোধ ও পারিবারিক সংকট
গত ১৭ জানুয়ারি রাতে মিরপুর ১০ নম্বর এলাকার বাসায় কলেজ শিক্ষার্থী সানজিদা ইসলাম মিম (১৯) আত্মহত্যা করেন। তিনি মিরপুর ইংলিশ ভার্সন স্কুল অ্যান্ড কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রী।
মিমের ভাই সাখাওয়াত হোসেন বলেন, তাঁর বোনের সঙ্গে সাত বছর ধরে এক তরুণের সম্পর্ক ছিল। এরই মধ্যে মিমের পাশাপাশি ওই তরুণ আরেক তরুণীর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলে। কিছুদিন আগে বিষয়টি মিম জানতে পারেন। তরুণীর সঙ্গে ওই ছেলের অন্তরঙ্গ একটি ছবি মিমের মোবাইল ফোনে পাঠিয়ে দেন। এসব মানতে পারেননি মিম। এ কারণে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন।
Manual6 Ad Code
এর আগের দিন ১৬ জানুয়ারি ডেমরার পূর্ব বক্সনগরের ভাড়া বাসায় আত্মহত্যা করেন তৈরি পোশাক কারখানার শ্রমিক মোছা. কোহিনুর (৪০)। স্বজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আনুমানিক এক দশক আগে কোহিনুর ও ফারুক হোসেন দম্পতির একমাত্র মেয়ে সুমাইয়া গ্রামের বাড়ি খুলনার কয়রায় আত্মহত্যা করেছিল। তখন সুমাইয়ার বয়স ১১ বছর। এক ছেলে মো. হাসান ও স্বামীকে নিয়ে সংসার ছিল তাদের। স্বামী দিনমজুর।
কোহিনুরের ভাই মিজানুর যশোর থেকে মোবাইল ফোনে বলেন, ‘আমার বোনের আত্মহত্যার কারণ জানি না। কোহিনুর গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে এসেছিল, তখন তার মধ্যে কোনো বিষণ্নতা দেখতে পাইনি। ১৪ জানুয়ারি ঢাকায় যায়। এরপর শুনি সে মারা গেছে। এমন কী হলো যে, ঢাকায় যাওয়ার একদিন পরই আত্মহত্যার পথ বেছে নিল?’ তিনি জানান, বহু বছর আগে তাঁর আরেক বোনও আত্মহত্যা করেছেন।
কোহিনুরের স্বামী ফারুক হোসেনের দাবি, তাদের মধ্যে ওইদিন ঝগড়াঝাঁটি হয়নি। স্ত্রীর আত্মহত্যার কারণ তিনি জানেন না দাবি করে বলেন, ‘আমি গ্যাসের সিলিন্ডার কিনতে গিয়েছিলাম। পরে বাসায় ফিরে দেখি ভেতর থেকে দরজা বন্ধ।’
একা হওয়া নয়, বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা জরুরি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক সমকালকে বলেন, রাষ্ট্রে সবার জন্য কার্যকর জীবন কাঠামো না থাকায় সংকট দেখা দিলে সামাজিক টানাপোড়েন তৈরি হয়। সেই চাপ যখন ব্যক্তিজীবনে সরাসরি আঘাত হানে, তখন অনেকে আত্মহননের পথ বেছে নেয়।
ন্যূনতম জীবনমান নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে, সেটি হতাশার বড় কারণ উল্লেখ করে ড. তৌহিদুল বলেন, রাষ্ট্রীয়ভাবে সবার জন্য কার্যকর জীবন কাঠামো গড়ে তুলতে না পারলে সংকটের সময় মানুষ একা হয়ে পড়ে। সম্পর্কজনিত বিরোধ, সামাজিক অসহযোগিতা এবং ন্যূনতম জীবনমানের অনিশ্চয়তা মানুষের মধ্যে গভীর হতাশা তৈরি করে। বিশেষ করে যারা সামাজিক ও মানসিকভাবে দুর্বল, তারা এমন পরিস্থিতিতে মৃত্যুকে মুক্তি মনে করে।
পুলিশ সদরদপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, আত্মহত্যা রোধে পারিবারিক বিরোধ বা মানসিক সংকটের ঘটনায় দ্রুত হস্তক্ষেপ, কমিউনিটি পুলিশিং ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন। পাশাপাশি জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সহায়তা, কাউন্সেলিং, সামাজিক ও স্বাস্থ্য সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। এ ছাড়া জরুরি মুহূর্তে আত্মহত্যার ঝুঁকির তথ্য পেলে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশ, অ্যাম্বুলেন্স ও প্রয়োজনীয় সহায়তা পাঠিয়ে জীবন রক্ষায় দ্রুত ভূমিকা রাখে।