আজ সোমবার, ১৩ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২৯শে আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বন্ধ ভারতের দ্বার, প্রশিক্ষণের গন্তব্য এখন পাকিস্তান

editor
প্রকাশিত মে ১৪, ২০২৬, ০৬:০৭ অপরাহ্ণ
বন্ধ ভারতের দ্বার, প্রশিক্ষণের গন্তব্য এখন পাকিস্তান

Manual3 Ad Code

অনলাইন ডেস্ক

দীর্ঘদিন ভারতের মুসৌরিই ছিল বাংলাদেশি সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশে প্রশিক্ষণের প্রধান গন্তব্য। তবে রাজনৈতিক পালাবদল, কূটনৈতিক টানাপোড়েন, চুক্তির মেয়াদ শেষ ও ভিসা জটিলতায় সেই কার্যক্রম এখন বন্ধ। তাই প্রথমবারের মতো উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণে পাঠানো হয়েছে পাকিস্তানে।

Manual8 Ad Code

নেতৃত্ব ও দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় সরকারের ১২ জন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বর্তমানে পাকিস্তানের লাহোরে অবস্থিত সিভিল সার্ভিস একাডেমিতে (সিএসএ) প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। গত ৪ মে শুরু হওয়া এই প্রশিক্ষণ চলবে ২১ মে পর্যন্ত। সফরে অংশ নেওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে একজন অতিরিক্ত সচিব এবং বাকি ১১ জন যুগ্ম সচিব পদমর্যাদার।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, কর্মকর্তাদের যাতায়াত, থাকা-খাওয়া ও প্রশিক্ষণের সব ব্যয় বহন করছে পাকিস্তান সরকার। বাংলাদেশ সরকারের এ সফরে কোনো আর্থিক সংশ্লিষ্টতা নেই। প্রশিক্ষণ শেষে দেশে ফিরে পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে অংশগ্রহণকারী কর্মকর্তাদের প্রতিবেদন জমা দিতে হবে।

প্রশিক্ষণ ভারতের দিকে ঝুঁকেছিল দীর্ঘদিন

বাংলাদেশের সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে গত এক দশকে প্রধান গন্তব্য ছিল ভারত। বিশেষ করে উত্তরাখণ্ড প্রদেশের মুসৌরিতে অবস্থিত লাল বাহাদুর শাস্ত্রী রাষ্ট্রীয় প্রশাসন একাডেমিতে নিয়মিত প্রশিক্ষণে যেতেন মধ্যম পর্যায়ের কর্মকর্তারা।

আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ২০১৪ সালে দিল্লিভিত্তিক ন্যাশনাল সেন্টার ফর গুড গভর্ন্যান্সের (এনসিজিজি) সঙ্গে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সমঝোতা স্মারক সইয়ের মধ্য দিয়ে এই কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। পরে ২০১৯ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি দুই দেশের মধ্যে দ্বিতীয় দফায় চুক্তি হয়। তৃতীয় দফায় ২০২৪ সালের ৩০ এপ্রিল ঢাকায় দুই পক্ষের মধ্যে চুক্তি সই হয়। সবশেষ এই চুক্তির মেয়াদ ছিল এক বছর। ২০৩০ সাল পর্যন্ত চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়েছিল।

Manual1 Ad Code

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সূত্র বলছে, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ঢাকা–দিল্লি কূটনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে এরপর বাংলাদেশি সরকারি কর্মকর্তাদের ভারতে প্রশিক্ষণে পাঠানো হয়নি।

Manual6 Ad Code

নেতৃত্ব ও দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় সরকারের ১২ জন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বর্তমানে পাকিস্তানের লাহোরে অবস্থিত সিভিল সার্ভিস একাডেমিতে (সিএসএ) প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। গত ৪ মে শুরু হওয়া এই প্রশিক্ষণ চলবে ২১ মে পর্যন্ত। সফরে অংশ নেওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে একজন অতিরিক্ত সচিব এবং বাকি ১১ জন যুগ্ম সচিব পদমর্যাদার।
ভারতে কী ধরনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো, তা জানতে কথা হয় প্রশাসন ক্যাডারের পাঁচজন কর্মকর্তার সঙ্গে, যাঁরা ইতিমধ্যে ১৪ দিনের প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তাঁরা বলেন, মূলত ভারতের সরকারব্যবস্থা কীভাবে চলে, তাদের রাস্তাঘাট কীভাবে নির্মিত হয়, স্থানীয় সরকার কীভাবে পরিচালিত হয়, এসব বিষয় বোঝানো হতো। কয়েকটি এলাকাও সরেজমিন দেখানো হতো।

এখন পর্যন্ত কতজন কর্মকর্তা ভারতে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন, এ তথ্য জানা যায়নি। তবে একটি সূত্র জানিয়েছে, সংখ্যাটি প্রায় তিন হাজার। মূলত মাঠ প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, সিনিয়র সহকারী সচিব, সিনিয়র সহকারী কমিশনার, সহকারী কমিশনার (ভূমি) এবং সমমর্যাদার প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা এই প্রশিক্ষণের জন্য নির্বাচিত হতেন।

কর্মকর্তারা বলেন, প্রশিক্ষণের জন্য ভারত ও পাকিস্তান—দুই দেশেই যাওয়া প্রয়োজন। তাঁদের মতে, বিদেশে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা বিনিময় ও নেতৃত্বের বিকাশ ঘটে। দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় দুই দেশের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্যও গুরুত্বপূর্ণ।

পাকিস্তানের আমন্ত্রণে কর্মকর্তাদের সেখানে প্রশিক্ষণে পাঠানো হয়েছে। তবে এখনো দেশটির সঙ্গে আনুষ্ঠানিক কোনো চুক্তি হয়নি। ভারতের সঙ্গে করা চুক্তি নবায়ন হয়েছে কি না, তা জানা নেই।
মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম, অতিরিক্ত সচিব, ক্যারিয়ার প্ল্যানিং ও প্রশিক্ষণ অনুবিভাগ, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়
প্রস্তাব ছিল পাকিস্তানে, এবার পেল সাড়া

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, লাহোরের সিভিল সার্ভিস একাডেমিতে প্রশিক্ষণের জন্য পাকিস্তান সরকার বিভিন্ন সময় চিঠি দিয়ে বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তাতে সাড়া দেওয়া হয়নি।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রসচিব, বর্তমানে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি পাকিস্তান সফরে গেলে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। তখন পাকিস্তানের পক্ষ থেকে কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণে পাঠানোর প্রস্তাবে ইতিবাচক সাড়া দেওয়া হয়।

এরপর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠনের পর পাকিস্তান সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে আমন্ত্রণপত্র পাঠায়। মূলত সেই আমন্ত্রণের ভিত্তিতেই এবার কর্মকর্তাদের পাকিস্তানে পাঠানো হয়েছে।

সরকারি সূত্রগুলোর ভাষ্য, প্রশাসনিক সক্ষমতা উন্নয়ন কর্মসূচির অংশ হিসেবে পাকিস্তানে বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের প্রতিনিধিদলের এটিই প্রথম আনুষ্ঠানিক সফর।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, বিভিন্ন দেশের সঙ্গে প্রশিক্ষণ ও সক্ষমতা উন্নয়ন সহযোগিতা বাড়ানোর অংশ হিসেবেই পাকিস্তানের সঙ্গে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো চুক্তি হয়নি।

জনপ্রশাসন বিশ্লেষকেরা বলছেন, দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক বাস্তবতায় পাকিস্তানে কর্মকর্তাদের পাঠানোর উদ্যোগ কূটনৈতিক বার্তা বহন করে। সরকারি কর্মকর্তাদের একক কোনো দেশে না পাঠিয়ে কয়েকটি দেশে পাঠানো উচিত বলে মত দেন তাঁরা।

Manual5 Ad Code

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সূত্র বলছে, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে বাংলাদেশি সরকারি কর্মকর্তাদের ভারতে প্রশিক্ষণে পাঠানো হয়নি। সবশেষ ২০২৩ সালের অক্টোবরে একটি দল ভারতে গিয়েছিল।
প্রশিক্ষণে যাঁরা গেছেন

পাকিস্তান সফরে যাওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে আছেন—স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব সালমা সিদ্দিকা মাহতাব, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ মোস্তফা জামাল হায়দার, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মো. আবু রায়হান মিঞা, যুগ্ম সচিব মো. তৌফিক ইমাম ও মো. রায়হান আখতার, যুগ্ম সচিব মুহাম্মদ আবদুস সালাম, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের যুগ্ম সচিব মো. ফিরোজ আহমেদ ও মুহাম্মদ মনিরুল ইসলাম।

এ ছাড়া এই দলে আরও আছেন—স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব এ এফ এম এহতেশামূল হক, স্থানীয় সরকার বিভাগের যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ সামছুল হক, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মো. জিল্লুর রহমান এবং বিসিএস প্রশাসন একাডেমির যুগ্ম সচিব জিয়া আহমেদ সুমন।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ক্যারিয়ার প্ল্যানিং ও প্রশিক্ষণ অনুবিভাগের (সিপিটি) অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, পাকিস্তানের আমন্ত্রণে কর্মকর্তাদের সেখানে প্রশিক্ষণে পাঠানো হয়েছে। তবে এখনো দেশটির সঙ্গে আনুষ্ঠানিক কোনো চুক্তি হয়নি।

প্রশিক্ষণের জন্য বাংলাদেশের কর্মকর্তাদের ভারতেও যাওয়া উচিত, পাকিস্তানেও যাওয়া উচিত। প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকা প্রয়োজন। কারণ, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও প্রশাসনিক বাস্তবতায় এসব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের মিল আছে।
এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার, সাবেক রেক্টর, বিপিএটিসি ও সাবেক সচিব
আবার ভারতের আমন্ত্রণ

অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছর পেরিয়ে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর ঢাকা–দিল্লি সম্পর্ক জোড়া লাগার ইঙ্গিত দৃশ্যমান। এর মধ্যে ভারত নতুন করে বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ প্রশিক্ষণের আমন্ত্রণ জানিয়েছে। ইন্ডিয়ান টেকনিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশনের (আইটিইসি) আওতায় বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কোর্সে অংশ নিতে মধ্যম পর্যায়ের কর্মকর্তাদের আবেদন আহ্বান করা হয়েছে।

গত ৩ মে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ভারতের ওই আমন্ত্রণপত্রের ওপর ভিত্তি করে দেশটিতে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কোর্সে অংশগ্রহণের জন্য মধ্যম পর্যায়ের কর্মকর্তাদের আবেদন করতে বলেছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, আগের প্রশিক্ষণটি ছিল শুধু বাংলাদেশের কর্মকর্তাদের জন্য। নতুন করে যে প্রস্তাবটি দেওয়া হয়েছে, তা বিশ্বের অন্যান্য দেশের কর্মকর্তাদের সঙ্গে করতে হবে, এককভাবে নয়। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কমসংখ্যক কর্মকর্তা এ প্রশিক্ষণের সুযোগ পাবেন। এ ছাড়া শর্তও বেশ জটিল। তবু ভারতে নতুন করে প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়টি ইতিবাচক।

জনপ্রশাসন বিশ্লেষকেরা বলছেন, দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক বাস্তবতায় পাকিস্তানে কর্মকর্তাদের পাঠানোর উদ্যোগ কূটনৈতিক বার্তা বহন করে। সরকারি কর্মকর্তাদের একক কোনো দেশে না পাঠিয়ে কয়েকটি দেশে পাঠানো উচিত বলে মত দেন তাঁরা।
বাংলাদেশ লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণকেন্দ্রের (বিপিএটিসি) সাবেক রেক্টর ও সাবেক সচিব এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার প্রথম আলোকে বলেন, প্রশিক্ষণের জন্য বাংলাদেশের কর্মকর্তাদের ভারতেও যাওয়া উচিত, পাকিস্তানেও যাওয়া উচিত। প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকা প্রয়োজন। কারণ, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও প্রশাসনিক বাস্তবতায় এসব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের মিল আছে। ভারতের সঙ্গে করা চুক্তি যদি নবায়ন না হয়ে থাকে, সেটি নবায়ন হওয়া দরকার।

এই ধরনের প্রশিক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, ভারত কিংবা পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসের মান বাংলাদেশের চেয়ে উন্নত। তবে বিদেশে প্রশিক্ষণ নিয়ে কর্মকর্তারা দেশে ফিরে বাস্তবে কতটা অবদান রাখছেন, সেই মূল্যায়নও হওয়া দরকার।

তথ্য সুএঃ প্রথম আলো