গ্যাস সংকটে আশুলিয়ার একাধিক কারখানায় উৎপাদন বন্ধ, ছাঁটাইয়ের শঙ্কা
গ্যাস সংকটে আশুলিয়ার একাধিক কারখানায় উৎপাদন বন্ধ, ছাঁটাইয়ের শঙ্কা
editor
প্রকাশিত আগস্ট ২০, ২০২৬, ০৬:০৮ অপরাহ্ণ
Manual8 Ad Code
অনলাইন ডেস্ক
তীব্র গ্যাস সংকটে আশুলিয়ার গ্যাসনির্ভর বেশ কয়েকটি কারখানার উৎপাদন কার্যক্রম কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। কোনো কোনো কারখানায় উৎপাদন সক্ষমতা ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে, আবার কোথাও পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে উৎপাদন। এতে একদিকে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার লোকসান গুনতে হচ্ছে।
অন্যদিকে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করে উৎপাদন সচল রাখার চেষ্টা করতে গিয়ে বাড়ছে ব্যয়। দীর্ঘস্থায়ী এই সংকট অব্যাহত থাকলে শ্রমিক ছাঁটাই বা জনবল কমানোর মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে বলেও জানিয়েছেন কয়েকটি কারখানার কর্মকর্তারা।
আশুলিয়ার কাঠগড়া আমতলা এলাকায় ফ্যাশন গ্লোব গ্রুপের কারখানা এ আর ও ওয়েট প্রসেসিং লিমিটেডে কয়েক সপ্তাহ ধরে কম সক্ষমতায় উৎপাদন চলার পর গতকাল সকালে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। বুধবার রাত পর্যন্ত কারখানাটিতে কার্যক্রম চললেও বৃহস্পতিবার সেখানে উৎপাদনের কোনো চিহ্ন দেখা যায়নি।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কারখানাটির তিনটি সেকশনের সবগুলোই বন্ধ। কারখানার ভেতরে শ্রমিকদের উপস্থিতি ছিল না। শুধু নিরাপত্তারক্ষী ও কয়েকজন কর্মকর্তা সেখানে অবস্থান করছিলেন।
কারখানাটির কর্মকর্তারা জানান, গ্যাস সংকট শুরুর পর থেকেই উৎপাদন ব্যাপকভাবে কমেছে। একপর্যায়ে উৎপাদন ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়। কারখানাটির দৈনিক উৎপাদন সক্ষমতা ৫০ হাজার পিস। কিন্তু বাইরে থেকে গ্যাস এনে সর্বোচ্চ ২০ হাজার পিস পর্যন্ত উৎপাদন করা সম্ভব হয়েছে। এরপরও কারখানার একটি অংশ বন্ধ রাখতে হয়েছে।
কারখানাটির ড্রাই প্রসেস, ওয়াশিং ও ফিনিশিং কোয়ালিটি সেকশনে ৮০ থেকে ৯০টি মেশিন রয়েছে। এর মধ্যে ২৪টি মেশিন বন্ধ রাখতে হচ্ছে। সরেজমিনে কারখানাটির গ্যাস মিটারে চাপ পাওয়া যায় ২.৫ পিএসআই।
Manual1 Ad Code
কর্মকর্তারা জানান, কারখানার উৎপাদন চালু রাখতে কমপক্ষে ১০ পিএসআই গ্যাসের চাপ প্রয়োজন। কিন্তু সেখানে গ্যাসের চাপ শূন্য থেকে সর্বোচ্চ ২.৫ পিএসআইয়ের মধ্যে ওঠানামা করছে। শুধু চাপ কম থাকাই নয়, কখনো ২.৫ পিএসআই চাপ পাওয়া গেলেও গ্যাসের মান খারাপ থাকায় সেটি ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না।
ফ্যাশন গ্লোব গ্রুপের কোম্পানি সচিব আরএকে লিটন জানান, তাদের ওয়াশিং প্ল্যান্টে উৎপাদন ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। সংকট মোকাবিলায় বাইরে থেকে গ্যাস এনে সিএনজি স্টেশনের মতো ব্যবস্থা করেও পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এতে প্রতি ঘণ্টায় অতিরিক্ত প্রায় ৩০ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। দিনের প্রায় অর্ধেক সময় গ্যাসের চাপ শূন্য থাকে বলেও জানান তিনি।
Manual2 Ad Code
তিনি আরও বলেন, সাভার-আশুলিয়ার গ্যাসনির্ভর অধিকাংশ কারখানাই একই পরিস্থিতির মুখোমুখি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পাকিজা গ্রুপের এক কর্মকর্তা জানান, গ্যাস সংকটের কারণে তাদের টেক্সটাইল কারখানা টানা ১৫ দিন ধরে পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। এতে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি টাকা করে লোকসান হচ্ছে। কারখানার নিরাপত্তারক্ষীরাও নিশ্চিত করেছেন, বর্তমানে ভেতরে কোনো শ্রমিক নেই।
বৃহস্পতিবার সকালে কয়েকজন শ্রমিক কারখানার গেটে এলেও তাদের ভেতরে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি এবং ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
রিং শাইন টেক্সটাইল লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অনিরুদ্ধ পিয়াল বলেন, ডাইং কারখানাটি কাগজে-কলমে চালু থাকলেও গ্যাসের চাপ না থাকায় কার্যত কোনো উৎপাদন হচ্ছে না।
তিনি বলেন, ‘সব শ্রমিক বসে অলস সময় কাটাচ্ছেন।’ তিনি জানান, এতে প্রতিদিন ১১ কোটি টাকা লোকসান হচ্ছে। কারখানাটির দৈনিক উৎপাদন সক্ষমতা ৯০ টন হলেও বর্তমানে দুই টনও উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না।
গ্যাসের চাপ অনিয়মিত থাকায় লোকসান আরও বাড়ছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘যখন সামান্য গ্যাসের চাপ পাওয়া যায়, তখন আমরা সব মেশিন চালু করি। কিন্তু মেশিনগুলো গরম হতে না হতেই গ্যাস চলে যায়… প্রতিটি ব্যাচে ৮ থেকে ১০ কোটি টাকা মূল্যের পণ্য থাকে।’
কারখানাটিতে ৯৭৫ জন শ্রমিক কর্মরত, যাদের বেতন পরিশোধ করতেই হবে। ডিইপিজেডের আওতাধীন কারখানা হওয়ায় প্রতি মাসের ১০ তারিখের মধ্যে শ্রমিকদের বেতন পরিশোধ করা বাধ্যতামূলক।
জনবল কমানোর হুঁশিয়ারি কারখানাগুলোর
জামগড়ার লিটল স্টার স্পিনিং মিলের চেয়ারম্যান খোরশেদ আলম বলেন, একাধিক জ্বালানি উৎস ব্যবহার করেও তাদের মিলকে সক্ষমতার মাত্র ৪০ শতাংশ উৎপাদনে চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। গ্যাস ব্যবহার করে বর্তমানে কোনো উৎপাদনই সম্ভব হচ্ছে না। বিদ্যুতের মাধ্যমে প্রায় ২৫ শতাংশ উৎপাদন করা হচ্ছে। বাকি উৎপাদন সক্ষমতার কিছু অংশ সৌরবিদ্যুৎ ও ব্যাটারির মাধ্যমে পূরণের চেষ্টা চলছে।
বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের কারণে উৎপাদন ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে জানান তিনি। তার হিসাবে, উৎপাদন ব্যয় প্রায় ১২ শতাংশ বেড়েছে। প্রতি পাউন্ড সুতা উৎপাদনে অতিরিক্ত ১৪ থেকে ১৫ টাকা খরচ হচ্ছে। এদিকে গ্যাসের চাপ সর্বোচ্চ ১ থেকে ১.৫ পিএসআই পর্যন্ত উঠছে, যা জেনারেটর চালানোর জন্যও যথেষ্ট নয়।
সংকট মোকাবিলায় মিলটি তিন শিফটে উৎপাদন রেশনিং করে চালানো হচ্ছে। ছয়টি সেকশনের মধ্যে বর্তমানে মাত্র দুটি চালু রাখা হয়েছে। শ্রমিকদের বেতন পরিশোধের প্রয়োজনেই লোকসান হলেও সুতা বিক্রি করতে হয়েছে বলে জানান খোরশেদ আলম। তিনি বলেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে অন্তত ৩০ শতাংশ জনবল কমানো ছাড়া তাদের আর কোনো উপায় থাকবে না।
Manual3 Ad Code
তবে শিল্পাঞ্চলের কারখানা বন্ধের বিষয়ে ভিন্ন তথ্য দিয়েছে শিল্প পুলিশ। শিল্প পুলিশ-১-এর সুপারিনটেনডেন্ট মোহাম্মদ মমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, গ্যাস সংকটের কারণে আশুলিয়া অঞ্চলের কোনো কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার তথ্য তাদের কাছে নেই।
Manual7 Ad Code
তিনি জানান, মুন্নু সিরামিকস এক বা দুই দিন বন্ধ ছিল। এ ছাড়া প্রীতি অ্যাপারেলসসহ আরও একটি কারখানা একই সময়ে সমস্যায় পড়েছিল। তবে গ্যাসের চাপ স্বাভাবিক থাকলে এসব কারখানা আবার সমস্যায় পড়ে না বলে জানান তিনি। তথ্য সুএঃ ইত্তেফাক