মাসের পর মাস পিছিয়ে অবশেষে বাংলাদেশের স্বপ্নের রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র আগামী নভেম্বর মাসে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনে আসছে। দেশের প্রথম এই পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি থেকে জাতীয় গ্রিডে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহের মধ্য দিয়ে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের যুগে প্রবেশ করবে জাতি।
Manual1 Ad Code
একই সঙ্গে বাংলাদেশ বিশ্বের ৩৩তম দেশ হিসেবে পারমাণবিক জ্বালানি ক্লাবে প্রবেশ করবে।
Manual5 Ad Code
বর্তমানে কেন্দ্রটি চালুর আগে প্রেসারাইজার পাইলট অপারেটেড রিলেটেড ভালব (পিওআরভি)-এর ত্রুটি সারানোর কাজ চলছে। এরপর বিদ্যুৎকেন্দ্রটিতে ফিউশন রিয়্যাকশন ঘটিয়ে পাওয়ার স্টার্টআপের কাজ শুরু হবে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদ্যুৎকেন্দ্রটির বিদ্যুৎ উৎপাদনে যাওয়ার আগে (বি-টু-ধাপে) দুই থেকে তিন সপ্তাহ এবং টারবাইন দিয়ে ৩০% স্ট্রিম তৈরিতে ছয় সপ্তাহ মিলে মোট ৯ সপ্তাহ বা দুই মাস সময় লাগবে।
Manual5 Ad Code
এ হিসেবে আইডিয়াল প্রোগ্রাম যদি অনুসরণ করা হয়, তা হলে আগামী নভেম্বর মাসে উৎপাদনে আসবে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। এক্ষেত্রে প্রতি ইউনিট পারমাণবিক বিদ্যুতের উৎপাদন খরচসহ বিদ্যুতের মূল্য দাঁড়াবে ১০ টাকার কম। তবে পামাণবিক চুল্লিতে ব্যবহৃত জ্বালানি বা স্পেন্ট ফুয়েল বিষয়ে এখনো রাশিয়া সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। এই বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপন্ন অন্যান্য ভারি বর্জ্য আলাদাভাবে সংরক্ষণের বিষয়েও কোনো উদ্যোগ না নেওয়ায় বিশেষজ্ঞ মহলে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
যেভাবে উৎপাদন হবে বিদ্যুৎ : রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলেন, বি-ওয়ান ধাপ থেকে ফুয়েল লোডিং শুরু হয়। এটি শেষে ফিউশন রিয়্যাকশন ঘটানো হয়। বি-টু ধাপকে কেউ কেউ ফিজিক্যাল স্টার্টআপও বলে। সহজ কথায় বি-টু ধাপের অর্থ হচ্ছে বিদ্যুৎকেন্দ্রে ফুয়েল লোড করা হয়েছে, ফিজিক্যাল স্টার্টআপ শেষ করা হয়েছে, এবার ফিউশন রিয়্যাকশন ঘটানো হবে। এই ফিউশন রিয়্যাকশন ঘটানোর অর্থই হচ্ছে এখানে এনার্জি বা তাপশক্তি তৈরি হবে।
এই তাপশক্তিকে স্ট্রিমে রূপান্তরিত করা হবে, সেই স্ট্রিম দিয়ে টারবাইন ঘোরানো হবে এবং টারবাইন ঘুরিয়ে শেষ পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে।
Manual4 Ad Code
যে ধাপে আটকে আছে কাজ : সর্বশেষ পাওয়া তথ্যানুযায়ী, এই প্রকল্প নির্মাণে জড়িতরা এখনো ফিউশন রিয়্যাকশনে যেতে পারেননি। ফিউশন রিয়্যাকশনে যাওয়ার আগে গুরুত্বপূর্ণ একটি পরীক্ষা আছে। একে বলা হয়, প্রেসারাইজার পাইলট অপারেটেড রিলেটেড ভালব (পিওআরভি)। এই পরীক্ষাটিতে গত দেড় মাস ধরে সফল হওয়া যায়নি। এই পরীক্ষায় দেড় মাস আগে সফল হলে এখন ফিউশন রিয়্যাকশন ঘটিয়ে পাওয়ার স্টার্টআপে যাওয়া যেত। আবার পিওআরভি শেষে যখন ফিউশন রিয়্যাকশন ঘটানো হবে তখন সেই পরীক্ষাতেও কারিগরি ত্রুটি দেখা দিতে পারে। এক্ষেত্রে শিডিউল অনুযায়ী রূপপুরের কাজ সময়মতো শেষ হওয়া নিয়ে কিছু অনিশ্চয়তা থেকে যায়।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে নির্মাণের প্রকল্প পরিচালক ড. মো. কবীর হোসেন গত ২৬ আগস্ট বলেন, আইডিয়াল প্রোগ্রাম যদি অনুসরণ করি তাহলে আগামী নভেম্বরের মধ্যে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি উৎপাদনে যেতে পারে বলে আশা করছি। কিন্তু শেষ মুহূর্তে কোনো পরীক্ষায় আটকে গেলে সময় আরো পেছাতে পারে।
দুই ডিজিটের নিচে থাকবে বিদ্যুতের দাম : ২০১৬ সালে রূপপুর প্রকল্পের প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ ধরা হয় ৪ টাকা ৬৫ পয়সা। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)-এর সঙ্গে রূপুপুর প্রকল্প কর্তৃপক্ষ বিদ্যুতের দাম নির্ধারণে কয়েকবার বৈঠক করেছে। পিডিবি এ বিষেয় রূপুপুর কর্তৃপক্ষের কাছে কিছু তথ্য চেয়েছে। এই তথ্যগুলোর বিষয়ে সুরাহা হলে পিডিবির সঙ্গে রূপপুরের বিদ্যুৎ-এর দাম নিয়ে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হবে। প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের উৎপাদন খরচের সঙ্গে অপারেশনার কস্ট, ইন্স্যুরেন্স যুক্ত হবে। তবে এই মূল্য দুই ডিজিট হবে না বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। এক্ষেত্রে রূপপুরের প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের মূল্য ১০ টাকার নিচে থাকতে পারে বলে জানিয়েছেন রূপপুরের প্রকল্প পরিচালক ড. মো. কবীর হোসেন।
স্পেন্ট ফুয়েল নিয়ে চূড়ান্ত হয়নি সিদ্ধান্ত : স্পেন্ট ফুয়েল হলো যে ফুয়েল রাশিয়া থেকে আনা হয়েছে রূপপুরের জন্য। এই ফুয়েল জ্বালানো হবে। এরপর তা ১০ বছর পরও রিয়্যাক্টরে সংরক্ষণ করা যাবে। তা বাইরে আনার প্রয়োজন হবে না। রাশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের সরকার টু সরকারের যে চুক্তি হয়েছে সেটি হচ্ছে রূপপুরে বাংলাদেশে যে ফুয়েল আনা হবে এটি রাশিয়া নিজের দেশে ব্যবস্থাপনার জন্য নিয়ে যাবে। এজন্য রাশিয়াকে কী পরিমাণ টাকা দিতে হবে এই বাণিজ্যিক চুক্তি এখনো হয়নি। যেহেতু এই ফুয়েল ১০ বছর সংরক্ষণ করা যাবে এজন্য এখনই এই বিষয়টি নিয়ে খুব তাড়াহুড়ো নেই বাংলাদেশের।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক ড. মো. শফিকুল ইসলাম গতকাল বলেন, স্পেন্ট ফুয়েলের চেয়েও এ মুহূর্তে যে বিষয়টি নিয়ে আমাদের বেশি চিন্তা সেটি হচ্ছে এই বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে যাওয়ার পর থেকে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ ভারি বর্জ্য তৈরি হবে। এই বর্জ্যগুলো রাখার জন্য এখন পর্যন্ত কোনো সংরক্ষণাগার তৈরি হয়নি। এই বর্জ্যগুলোর ব্যবস্থাপনা নিয়ে কর্তৃপক্ষকে দ্রুত উদ্যোগ নিতে হবে।