আজ পহেলা বৈশাখ, বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন। এদিন নানা আয়োজনে বর্ষবরণ করা হয়ে থাকে দেশে। ভোরের নতুন সূর্য ওঠার মধ্য দিয়ে ১৪৩৩ বঙ্গাব্দের প্রথম প্রভাতে শুরু হবে বর্ষবরণ। পহেলা বৈশাখ মানেই একসময়- হালখাতার মৌসুম। ডিজিটাল বাংলাদেশে সেই পরিবেশ আর নেই।
তবে আনন্দের আবহে নানান আয়োজনে বর্ষবরণের ক্ষেত্রে যুক্ত হয়েছে নতুন মাত্রা। বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন, পহেলা বৈশাখে বর্ণিল উৎসবে মেতে ওঠে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশ। প্রতি বছর দিনটি জাঁকজমকপূর্ণভাবে উদযাপনের জন্য জাতীয় পর্যায়ে ব্যাপক কর্মসূচিও নেওয়া হয়। তার ব্যতিক্রম হয়নি এবারও। শুভ নববর্ষ উপলক্ষে বাণী দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
Manual3 Ad Code
প্রধানমন্ত্রী তার বাণীতে উৎসবমুখর বাংলা নববর্ষের এই দিনে দেশবাসীসহ সব বাঙালিকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন। পহেলা বৈশাখ সরকারি ছুটির দিন। এদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের উদ্যোগে ‘শোভাযাত্রা’ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়েছে। ছায়ানট ভোরে রমনা বটমূলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আসর বসাবে। বাংলা নববর্ষের অনুষ্ঠান আবশ্যিকভাবে জাতীয় সংগীত ও ‘এসো হে বৈশাখ’ গান পরিবেশনের মাধ্যমে শুরু হবে।
বাংলা নববর্ষের তাৎপর্য, ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’র ইতিহাস ও ইউনেসকোর বিশ্ব সংস্কৃতির ঐতিহ্য হিসেবে। একসময় নববর্ষ পালিত হতো ঋতুধর্মী উৎসব হিসেবে। তখন এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল কৃষির। কারণ, কৃষিকাজ ছিল ঋতুনির্ভর। পরে কৃষিকাজ ও খাজনা আদায়ের সুবিধার জন্য মুঘল সম্রাট আকবরের সময়ে বাংলা সন গণনার শুরু হয়। হিজরি চান্দ্রসন ও বাংলা সৌর সনের ওপর ভিত্তি করে প্রবর্তিত হয় নতুন এই বাংলা সন। মূলত ১৫৫৬ সালে কার্যকর হওয়া বাংলা সন প্রথম দিকে পরিচিত ছিল ফসলি সন নামে। পরে তা পরিচিত হয় বঙ্গাব্দ নামে।
Manual6 Ad Code
কৃষিভিত্তিক গ্রামীণ সমাজের সঙ্গে বাংলাবর্ষের ইতিহাস জড়িয়ে থাকলেও এর সঙ্গে রাজনৈতিক ইতিহাসেরও সংযোগ ঘটেছে। পাকিস্তান শাসনামলে বাঙালি জাতীয়তাবাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয় বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের। আর ষাটের দশকের শেষে তা বিশেষ মাত্রা পায় রমনা বটমূলে ছায়ানটের আয়োজনের মাধ্যমে।
Manual4 Ad Code
এ সময় ঢাকায় নাগরিক পর্যায়ে ছায়ানটের উদ্যোগে সীমিত আকারে বর্ষবরণ শুরু হয়। অতীতে বাংলা নববর্ষের মূল উৎসব ছিল হালখাতা। এটি পুরোপুরিই একটি অর্থনৈতিক ব্যাপার। গ্রামগঞ্জে-নগরে ব্যবসায়ীরা নববর্ষের প্রারম্ভে তাদের পুরোনো হিসাব-নিকাশ সম্পন্ন করে হিসাবের নতুন খাতা খুলতেন। এ উপলক্ষে তারা নতুন-পুরাতন খদ্দেরদের আমন্ত্রণ জানিয়ে মিষ্টি বিতরণ করতেন এবং নতুনভাবে তাদের সঙ্গে ব্যবসায়িক যোগসূত্র স্থাপ পন করতেন। চিরাচরিত এ অনুষ্ঠানটি আজও অনেক জায়গায় পালিত হয়। একাত্তরের মহান স্বাধীনতার পর ধীরে ধীরে এই উৎসব নাগরিক জীবনে প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে।
এবারের শোভাযাত্রার মূল কাঠামোর মধ্যে থাকছে চার চাকার কাঠের হাতি, কিশোরগঞ্জের টেপা পুতুল, শান্তির পায়রা, মোরগ ও দোতারা। এর পাশাপাশি মাছ, বাঘ ও হরিণ শাবক, ছাগল ও ছাগশিশু, কাকাতুয়া, ময়ূর ও ঘোড়া। এ ছাড়া বিভিন্ন মুখোশের মধ্যে থাকছে রাজা-রানি মুখোশ, প্যাঁচা, বাঘ, সিংহ, খরগোশ প্রভৃতি।
চারুকলার শিক্ষক শিক্ষার্থীরা জানান, প্রতিটি মোটিফের সঙ্গে বাংলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য মিশে আছে। রংতুলির আঁচড়ে তারা সেই ইতিহাসকে তুলে ধরছেন।
মূল কাঠামোর মধ্যে আছে টেপা পুতুল কিশোরগঞ্জের সংস্কৃতিকে মনে করিয়ে দেবে, মোরগের পেছনে সূর্যের কাঠামো দিয়ে গ্রামীণ সকালের চিত্র ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে। শান্তির বার্তা দেবে পায়রা, আর লোকঐতিহ্যের প্রতীক হিসেবে থাকছে সোনারগাঁয়ের কাঠের হাতি। আর বাংলার লোকসংস্কৃতি, বাউল ঐতিহ্য ও গ্রামীণ ঐতিহ্যের প্রতীক হিসেবে থাকছে দোতারা।
এছাড়া ভয়কে জয় করার প্রত্যয় নিয়ে বাংলা নতুন বছরের ভোরে কণ্ঠ ছেড়ে গান গাইবে ছায়ানট। ছায়ানটের নববর্ষ বরণের প্রভাতি অনুষ্ঠানের মূল ভাবনা নির্ধারণ করা হয়েছে—‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির’।
পহেলা বৈশাখের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে বাঙালির অসামপ্রদায়িক এবং গণতান্ত্রিক চেতনার বহিঃপ্রকাশ ঘটতে থাকে। কালক্রমে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান এখন শুধু আনন্দ-উল্লাসের উৎসব নয়, এটি বাঙালি সংস্কৃতির একটি শক্তিশালী ধারক-বাহক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। শুধু তাই নয়, উৎসবের পাশাপাশি স্বৈরাচার-অপশক্তির বিরুদ্ধে প্রতিবাদও এসেছে পহেলা বৈশাখের আয়োজনে। ১৯৮৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে বের হয় প্রথম মঙ্গল শোভাযাত্রা। ২০১৬ সালের ৩০ নভেম্বর ইউনেসকো এই শোভাযাত্রাকে বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মর্যাদা দেয়।