এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার বিষয় ও কর্মদিবস কমানোর পরিকল্পনা
এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার বিষয় ও কর্মদিবস কমানোর পরিকল্পনা
editor
প্রকাশিত জুন ৬, ২০২৬, ০৩:২৭ অপরাহ্ণ
Manual5 Ad Code
বাসস
দেশের বৃহৎ দুই পাবলিক পরীক্ষা এসএসসি ও এইচএসসির সময়কাল কমিয়ে আনা এবং শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ কমাতে বিদ্যমান পরীক্ষা পদ্ধতি সংস্কারের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার।
বিদ্যমান শিক্ষাক্রমের আওতায় পরীক্ষার বিষয় সংখ্যা যৌক্তিকীকরণ এবং পরীক্ষা গ্রহণের কর্মদিবস উল্লেখযোগ্য হারে কমাতে একটি কর্মপরিকল্পনা ও ধারণাপত্র তৈরি করেছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। সম্প্রতি এক পত্রের মাধ্যমে এ সংক্রান্ত প্রস্তাবিত কর্মপরিকল্পনা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের জন্য পাঠিয়েছে সংস্থাটি।
এ বিষয়ে এনসিটিবি চেয়ারম্যান মো. মাহবুবুল হক পাটওয়ারী বাসসকে জানান, একটি সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা প্রস্তুত করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ও পরবর্তী নির্দেশনার জন্য পাঠানো হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার আলোকে এ বিষয়ে একটি কর্মশালা আয়োজনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। কর্মশালায় দেশের প্রথিতযশা শিক্ষাবিদ, কারিকুলাম বিশেষজ্ঞ, মূল্যায়ন বিশেষজ্ঞ, অভিভাবক, শিক্ষার্থী, বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ডের প্রতিনিধি এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের ডাকা হবে। কর্মশালায় এ বিষয়ে উঠে আসা মতামতগুলো পর্যালোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’
এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে মনে করেন এনসিটিবি চেয়ারম্যান।
Manual1 Ad Code
এনসিটিবির ধারণাপত্রে বলা হয়, বর্তমানে এসএসসি পরীক্ষা গ্রহণে প্রায় ২৫-৩০ কর্মদিবস এবং এইচএসসি পরীক্ষায় ৩০-৩৫ কর্মদিবস বা তার চেয়েও বেশি সময় ব্যয় হয়। এই দীর্ঘ সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো পরীক্ষা কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ায় হাজার হাজার স্কুলে স্বাভাবিক পাঠদান বন্ধ থাকে, যা অন্যান্য শ্রেণির শিক্ষার্থীদের শিখন ঘণ্টা (লার্নিং আওয়ার্স) কমিয়ে দিচ্ছে।
Manual5 Ad Code
এছাড়া, দীর্ঘমেয়াদি পরীক্ষার কারণে পরীক্ষার্থীদের ওপর অসহনীয় মানসিক চাপ তৈরি হয়। শুধু তাই নয়, পরীক্ষা পরিচালনায় বিপুল সংখ্যক শিক্ষককে পাঠদান কার্যক্রম থেকে বিরত থাকা, পরীক্ষা পরবর্তী উত্তরপত্র মূল্যায়ন, ফলাফল প্রকাশ ও উচ্চশিক্ষায় ভর্তি প্রক্রিয়া বিলম্বিত হওয়ায় সেশনজটের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
এনসিটিবি জানিয়েছে, মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার আলোকে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের নিয়ে দুই দিনব্যাপী একটি কর্মশালা আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। যার মূল উদ্দেশ্যগুলো হচ্ছে- এসএসসি ও এইচএসসি’র বিদ্যমান বিষয় কাঠামো পর্যালোচনা করা, পরীক্ষার ব্যাপ্তি কমানোর কার্যকর কৌশল নির্ধারণ, প্রতিবছর ডিসেম্বরের মধ্যে এসএসসি পরীক্ষা গ্রহণের সম্ভাব্যতা যাচাই করা, দীর্ঘ কর্মদিবসের চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করা, ধারাবাহিক ও সামষ্টিক মূল্যায়নের অনুপাত নির্ধারণ এবং সুপারিশমালা বাস্তবায়নের রোডম্যাপ ও সম্ভাব্য ঝুঁকি প্রশমন কৌশল নির্ধারণ করা।
সংস্থাটি আরও জানায়, পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত, শ্রীলঙ্কা, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুরসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও তুলনামূলক বিশ্লেষণ করে ন্যূনতম কতটি বিষয়ে পরীক্ষা নেওয়া যৌক্তিক তা নির্ধারণ করা হবে। বর্তমান বিষয়গুলোর মধ্যে কোনগুলো একীভূত বা সমন্বিত করা যায়, আবশ্যিক ও ঐচ্ছিক বিষয়ের পুনর্বিন্যাস কীভাবে হবে, বিদ্যমান প্রশ্ন কাঠামো পর্যালোচনা, ব্যবহারিক মূল্যায়নের আধুনিকায়ন এবং বিদ্যালয়ভিত্তিক মূল্যায়নের পরিধি ও নির্ভরযোগ্যতার মতো বিষয়গুলো নিয়ে কর্মশালায় বিস্তারিত আলোচনা করা হবে। এরপর অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে চূড়ান্ত রূপরেখা তৈরি করা হবে।
প্রস্তাবিত এই কর্মশালায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি), মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর, দেশের সকল শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান ও পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকরা অংশ নেবেন। এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইআর) বিশেষজ্ঞ, এনসিটিবি প্রতিনিধি, অভিজ্ঞ প্রধান শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষার্থী প্রতিনিধি মিলিয়ে প্রায় ৯০ জন অংশীজন এই সুপারিশমালা প্রণয়নে যুক্ত থাকবেন।
বিশেষজ্ঞ প্যানেলে ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমেদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইইআর-এর পরিচালক অধ্যাপক হোসনে আরা বেগমসহ প্রথিতযশা শিক্ষাবিদদের রাখা হয়েছে। কর্মশালায় ৬টি পৃথক দল কাজ করবে। দলগুলো মূলত— এসএসসি ও এইচএসসির কোন বিষয়গুলো একীভূত করা যায় এবং ন্যূনতম কতটি বিষয়ে সামষ্টিক পরীক্ষা নেওয়া যৌক্তিক- সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা দেবে। এছাড়া মাদ্রাসা ও কারিগরি সিলেবাসের সাথে সাধারণ সিলেবাসের সামঞ্জস্য রক্ষার কৌশল এবং ব্যবহারিক পরীক্ষা ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন নিয়েও সুপারিশ করবে বিশেষজ্ঞ দল।
এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে একটি চূড়ান্ত সুপারিশমালা তৈরি করা হবে। যেখানে পুনর্বিন্যাসকৃত বিষয় কাঠামোর ছক, প্রস্তাবিত বিষয় সংখ্যা, পরীক্ষার মোট দিনসংখ্যা এবং গ্রেডিং ও সার্টিফিকেশন পদ্ধতির বিস্তারিত রূপরেখা থাকবে।
এনসিটিবি বলছে, এই সংস্কার বাস্তবায়িত হলে পাবলিক পরীক্ষার ব্যাপ্তি কমার পাশাপাশি শিক্ষাবর্ষের স্বাভাবিক পাঠদান কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে।
এনসিটিবি’র সদস্য (শিক্ষাক্রম) অধ্যাপক ড. এ কে এম মাসুদুল হক বলেন, মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় এনসিটিবি, ঢাকা শিক্ষা বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সমন্বয়ে এই প্রক্রিয়াটি এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘পরীক্ষার বিষয় সংখ্যা এবং কর্মদিবস কীভাবে কমানো যায়, সে বিষয়ে আমরা মন্ত্রণালয়ে একটি প্রাথমিক ধারণাপত্র দিয়েছি। তবে বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত নয়। পরীক্ষা সংক্রান্ত মূল বিষয়গুলো আন্তঃশিক্ষা বোর্ড পরীক্ষা পরিচালনা কমিটির সঙ্গে সমন্বয় করে নির্ধারিত হবে।’
পরীক্ষা ও বিষয় সংখ্যা কমানোর বর্তমান অগ্রগতি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে এনসিটিবির প্রধান সম্পাদক মুহাম্মদ ফাতিহুল কাদীর জানান, এনসিটিবি এ বিষয়ে কী করা যায়, তার একটি প্রাথমিক রূপরেখা মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে।
তিনি বলেন, ‘এই মুহূর্তে বিষয় ও কর্মদিবস কমানোর প্রক্রিয়ায় নতুন কোনো অগ্রগতি বা কার্যক্রম নেই। কারণ, আমাদের পুরো টিম এখন আগামী শিক্ষাবর্ষের বইগুলোর জরুরি পরিমার্জন (কারেকশন) এবং সেগুলো বইয়ে ইনসার্ট (অন্তর্ভূক্ত) করার মতো বিশাল কর্মযজ্ঞ নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছে।’
Manual8 Ad Code
তিনি আরও বলেন, পরীক্ষার সময় ও বিষয় সংখ্যা কমানোর বিষয়টি চূড়ান্তভাবে শিক্ষা বোর্ডগুলোর আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির মতামতের ভিত্তিতে কার্যকর হবে।
Manual4 Ad Code
এ বিষয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক বলেন, সম্প্রতি এক সভায় এ বিষয়ে প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট অংশীজনের মতামতের ভিত্তিতে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।