১৫ সেপ্টেম্বর ১৯৬৯: ‘জয় বাংলা’ স্লোগান কীভাবে সর্বপ্রথম উচ্চারিত হলো?
১৫ সেপ্টেম্বর ১৯৬৯: ‘জয় বাংলা’ স্লোগান কীভাবে সর্বপ্রথম উচ্চারিত হলো?
editor
প্রকাশিত সেপ্টেম্বর ১৬, ২০২৬, ০৩:০৫ অপরাহ্ণ
Manual6 Ad Code
অনলাইন ডেস্ক
‘জয় বাংলা’ স্লোগান কি শুধুই কোনো তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া, নাকি এর নেপথ্যে ছিল সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক পরিকল্পনা?
‘জয় বাংলা’ স্লোগান প্রথম শুনি ১৯৬৯ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর। ওই দিন জেনারেল ইয়াহিয়ার সামরিক জান্তার কঠোর নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ তৎকালীন ইকবাল হলের (বর্তমান সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) মাঠে মহান শিক্ষা দিবসের আলোচনা সভা আয়োজন করে। সেটা শেষ হওয়ার পরে জহুরুল হক হলের ক্যান্টিনের পশ্চিম পাশে ও পুকুরের পূর্ব পাশে আফতাব ভাইয়ের নেতৃত্বে ছাত্রলীগের কর্মী-সমর্থকেরা অনেকক্ষণ ধরে ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে চারপাশ মুখরিত করে তোলেন। সেখানে আরও ছিলেন গোলাম ফারুক ভাই, ফররুখ ভাই, মধু ভাই।
রায়হান ফেরদৌস মধু ভাই স্লোগান না দিলেও বাকি দুজন খুব সুন্দর করে স্লোগান দিতে পারতেন। আমি তখন গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাই স্কুলের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী, ছাত্রলীগ স্কুল শাখার সদস্য। আমার বন্ধু সা’দউল্লাহকে (প্রকৌশলী, এখন কানাডাতে আছেন) সঙ্গে নিয়ে জহুরুল হলের মাঠে গিয়ে পৌঁছাই। একটা চাপা উত্তেজনা; কারণ ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতাদের ওইদিনই (১৭ সেপ্টেম্বর ১৯৬৯) সামরিক আদালতে হাজির হওয়ার বিজ্ঞপ্তি সব দৈনিক পত্রিকার প্রথম পাতায় ছাপা হয়েছে।
Manual7 Ad Code
আমিও সকালে ‘দৈনিক পাকিস্তান অবজারভার’ পত্রিকাতে দেখেছি। আমাদের বাসায় ওই পত্রিকা রাখা হতো। যতদূর মনে পড়ে সামরিক শাসনকে উপেক্ষা করে জহুরুল হলের মাঠে জ্বালাময়ী বক্তৃতা করেছিলেন তোফায়েল আহমেদ, শামসুদ্দোহা, মাহবুব উল্লাহ প্রমুখ। মাহবুব উল্লাহ ভাই বেঁচে আছেন, বাকি দুজন সদ্যপ্রয়াত।
পরে মধু ভাইয়ের কাছ থেকে শুনেছি দু’দিন আগেই, ১৫ সেপ্টেম্বর মধুর ক্যান্টিনে ছাত্রলীগের কর্মীসভাতে এ স্লোগান প্রথম উচ্চারিত হয়। আফতাব ভাই প্রথম স্লোগান ধরেছিলেন। তিনি ওই সময় ছাত্রলীগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি, পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক হন। শেষ জীবনে তিনি বিএনপি-সমর্থক শিক্ষক ফোরামের সদস্য ছিলেন। আততায়ীর গুলিতে নিজের বাড়িতে নিহত হন; খুনিদের পরিচয় অজানা, আজও রহস্যাবৃত। ১৫ সেপ্টেম্বর ১৯৬৯ শিক্ষা দিবসকে সফল করার জন্য ছাত্রলীগের কর্মীসভা ডাকা হয়েছিল, সে কর্মীসভাতেই আফতাব ভাই স্লোগান ধরেন।
আফতাব ভাই কি হঠাৎ করেই এটা করেছেন? না।
তৎকালীন ছাত্রলীগ ঢাকা শহর শাখার সংগঠক হাবিব বাবুল ভাই (এখন জার্মান প্রবাসী) এর গোড়ার কথা জানিয়েছেন। সিন্ধুর জাতীয়তাবাদী নেতা জি এম সৈয়দের সংগঠনের নাম ছিল ‘জিয়ে সিন্ধ’—বাংলায় বললে দাঁড়ায় ‘জয় সিন্ধ’। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে পশ্চিম পাকিস্তানে সফরসঙ্গী হয়েছিলেন ছাত্রলীগের তৎকালীন সভাপতি আবদুর রউফ (পরবর্তীতে জাতীয় সংসদ সদস্য, আরও পরে গণফোরামে যোগদান, এখন প্রয়াত)। আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে ছয় দফা নিয়ে জিয়ে সিন্ধ আন্দোলনের নেতাদের আলোচনা হয়। মধুর ক্যান্টিনে রউফ ভাই ছাত্রলীগ কর্মীদের আড্ডায় সে কথা তুলেছিলেন। তখনই নাকি আফতাব ভাই বলে উঠেছিলেন, “সিন্ধীরা যদি জিয়ে সিন্ধ স্লোগান দিতে পারে, তাহলে আমরাও জয় বাংলা স্লোগান দিতে পারি।” উপস্থিত অধিকাংশ কর্মীই এতে উজ্জীবিত হন। কিন্তু ছাত্রলীগের একটা অংশ সেটা ভালোভাবে নেয়নি; তারা মনে করত এটা হঠকারী। তারা মনে করত আসন্ন পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ (ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি) নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানের সরকার গঠন করবে, আর ছাত্রলীগের স্বাধীনতাপন্থিরা (যারা জয় বাংলা স্লোগান দিচ্ছে) এসব হঠকারিতা করলে সে সুযোগ নষ্ট হতে পারে।
এটা উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, ১৯৬২ সাল থেকেই ছাত্রলীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল আলম খানের নেতৃত্বে ছাত্রলীগের অভ্যন্তরে যুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীন করার জন্য গোপন তৎপরতা সংগঠিত হয়। এটাকে সাংকেতিক ভাষায় ‘নিউক্লিয়াস’ বলা হতো; বাংলায় বলা হতো ‘মূল সংগঠন’। এর পুরো নাম ছিল ‘স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ’। আবদুর রাজ্জাক, কাজী আরেফ আহমেদকে নিয়ে সিরাজুল আলম খান ফজলুল হক হলের পুকুর পাড়ে, জহুরুল হক হলের মাঠে বসে স্বাধীনতা সংগ্রামের পরিকল্পনা করেছেন রাতের পর রাত। প্রতিটি সম্মেলনে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক যেন এ ‘নিউক্লিয়াসপন্থি’ হয়, সেভাবেই ছাত্রলীগ সংগঠনের অভ্যন্তরে সাংগঠনিক তৎপরতা চালাত এ ‘নিউক্লিয়াস’। আবদুর রাজ্জাক, খালেদ মোহাম্মদ আলী, আ স ম আবদুর রব, শাহজাহান সিরাজ সে ধারাবাহিকতায় ‘নিউক্লিয়াসপন্থি’ ছিলেন।
Manual1 Ad Code
১৯৭০ সালের ছাত্রদের প্রত্যক্ষ ভোটে প্রথম ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রলীগ একটি বাদে সব পদে জয়লাভ করে। আ স ম আবদুর রব সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন। আবদুল কুদ্দুস মাখন নির্বাচিত হন সাধারণ সম্পাদক (তিনি নিউক্লিয়াসপন্থি ছিলেন না)। ১৯৭০ সালে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কাউন্সিলে সভাপতি নির্বাচিত হন নূরে আলম সিদ্দিকী (তিনিও ‘নিউক্লিয়াসপন্থি’ ছিলেন না) ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন শাহজাহান সিরাজ। এ চারজনই ১৯৭১ সালের ১ মার্চ সামরিক জান্তা ইয়াহিয়ার নবনির্বাচিত পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দেওয়ার পর ছাত্রলীগের দুটি উপদলের মধ্যে বিভেদ আনুষ্ঠানিকভাবে মিটিয়ে ফেলেন।
তবে এর আগেই ১৯৭০-এর নির্বাচনের পরপরই ১৯৭১-এর ফেব্রুয়ারি মাসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নির্বাচনে জয়ী আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা হস্তান্তরে বাধা সৃষ্টিতে পশ্চিম পাকিস্তানিদের ষড়যন্ত্র আঁচ করতে পেরে এ দুই উপদলকে একত্র করেন এবং সাবেক ছাত্রলীগ নেতাদের নিউক্লিয়াসে শেখ ফজলুল হক মণি ও তোফায়েল আহমেদকে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য সিরাজুল আলম খান ও আবদুর রাজ্জাককে নির্দেশ দেন। বঙ্গবন্ধু জেলখানায় থাকাকালে বেগম মুজিবের মাধ্যমে এ নিউক্লিয়াসের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তোলেন। ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা বাতিল ও বঙ্গবন্ধুসহ সকল রাজবন্দীকে মুক্ত করার গণবিস্ফোরণে পরিণত করার জন্য এ ‘নিউক্লিয়াস’ সুশৃঙ্খলভাবে আন্দোলনকে সারা দেশে সংগঠিত করে। এ নিউক্লিয়াসের পরিকল্পনায় তোফায়েল আহমেদ ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের বিশাল সমাবেশে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি দেন।
Manual2 Ad Code
১৯৭১ সালের ১ মার্চ ডাকসু ও ছাত্রলীগের চার নেতা একত্রে ‘স্বাধীন বাংলাদেশ ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন করেন। সেদিন রাতের বেলা জহুরুল হক হলে ছাত্রলীগের সাবেক চার নেতা—শেখ ফজলুল হক মণি, সিরাজুল আলম খান, আবদুর রাজ্জাক ও তোফায়েল আহমদ তৎকালীন (১৯৭১-এর ১ মার্চ) চার ছাত্রনেতার সঙ্গে মিলে পুরো মার্চ মাস স্বাধীনতার লক্ষ্যে গণবিস্ফোরণকে পরিচালনা করেন। মুক্তিযুদ্ধকালে তারা ‘বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স’ (বিএলএফ) নামে সংগঠিত হন, যা মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিকে ‘মুজিব বাহিনী’ নাম ধারণ করে।
ষাটের দশক থেকে নিউক্লিয়াসপন্থিরা শুধু ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বেই নয়; সব বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজে এমনকি স্কুলে স্বাধীন বাংলাদেশের পক্ষে গোপনে কর্মী রিক্রুট করতেন। গোপনে স্বাধীনতার লিফলেট বিতরণ, দেয়াল লিখন ও ছাত্রদের বাইরে স্বাধীনতার পক্ষে কর্মী সংগ্রহ করত এ নিউক্লিয়াস। ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের পরপরই আওয়ামী লীগের শ্রমিক সংগঠন ‘জাতীয় শ্রমিক লীগ’ গড়ে তোলেন সিরাজুল আলম খান। উদ্দেশ্য ছিল স্বাধীনতা সংগ্রামে শ্রমিক সমাজকে সম্পৃক্ত করা। আরও অনেক তৎপরতা চালিয়েছে এ নিউক্লিয়াস।
মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশকে স্বাধীন করার সচেতন প্রয়াসের প্রতিফলন থেকেই আফতাব আহমেদ এ স্লোগান তোলেন, যা নিউক্লিয়াসের নেতৃবৃন্দ সোৎসাহে অনুমোদন করেন। এর সঙ্গে আরও অনেক স্লোগান পরবর্তীতে যুক্ত হয়; যেমন: ‘তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা মেঘনা যমুনা’, ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর’, ‘বাঁশের লাঠি তৈরি কর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর’ ইত্যাদি। ‘জয় বাংলা’ দিয়ে শুরু করে একে একে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা নকশা করা, জাতীয় সংগীত নির্বাচন করা, স্বাধীনতার ইশতেহার রচনা প্রভৃতির মধ্য দিয়ে নিউক্লিয়াস তথা স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের মধ্য দিয়েই তাদের স্বপ্নের বাস্তবায়ন প্রত্যক্ষ করেছে।
মুশতাক হোসেন সাবেক সাধারণ সম্পাদক, ডাকসু। স্থায়ী কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল – বাংলাদেশ জাসদ।