আজ শুক্রবার, ২৩শে জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৯ই মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

আওয়ামী লীগ নেতারা ভারতের দিল্লিতে কেন বারবার সংবাদ সম্মেলন করছেন?

editor
প্রকাশিত জানুয়ারি ২০, ২০২৬, ১২:৩৪ পূর্বাহ্ণ
আওয়ামী লীগ নেতারা ভারতের দিল্লিতে কেন বারবার সংবাদ সম্মেলন করছেন?

Manual4 Ad Code

অনলাইন ডেস্ক:

ভারতের দিল্লির প্রেস ক্লাব অফ ইন্ডিয়ায় গত শনিবার ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ দুই সাবেক মন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনের পরে আগামী শুক্রবার ২৩শে জানুয়ারি দলটির আরও দুজন সাবেক মন্ত্রী সাংবাদিকদের মুখোমুখি হবেন। তবে দুটি অনুষ্ঠানের কোনোটিই বাংলাদেশে রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের দলীয় অনুষ্ঠান ছিল না।

Manual3 Ad Code

দুটি ভিন্ন সংগঠন আয়োজন করেছে এসব সংবাদ সম্মেলনের।

Manual2 Ad Code

গত শনিবারের সংবাদ সম্মেলনে হাজির ছিলেন সাবেক পররাষ্ট্র মন্ত্রী হাছান মাহমুদ ও সাবেক শিক্ষা মন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল। আগামী শুক্রবারের আলোচনা সভায় আবারও মি. নওফেলের হাজির থাকার কথা আছে, সঙ্গে থাকার কথা আরেক সাবেক মন্ত্রী মুহাম্মদ আলী আরাফাতের।

দিল্লির প্রেস ক্লাবে আয়োজিত অনুষ্ঠানটিই ছিল ২০২৪ এর পাঁচই অগাস্টে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পরে ভারতের মাটিতে আওয়ামী লীগ নেতাদের প্রথম সংবাদ সম্মেলন। তবে দলটির অনেকে নেতাই ভারতীয় গণমাধ্যমকে নানা ভাবে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন গত দেড় বছরের বেশি সময়ে।

Manual6 Ad Code

যদিও অনুষ্ঠানের অন্যতম আয়োজক লন্ডন প্রবাসী ব্যারিস্টার নিঝুম মজুমদার বিবিসি বাংলাকে বলেছেন যে, মি. হাছান মাহমুদ এবং মি. চৌধুরী কেউই আওয়ামী লীগের নেতা হিসাবে ওই সংবাদ সম্মেলনে আসেননি।

“বাংলাদেশে ২০২৪ সালের জুলাই-অগাস্টের বিক্ষোভ নিয়ে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয় বা ওএইচসিএইচআর যে তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, সেটি যে নিরপেক্ষ নয়, সেটা তুলে ধরতেই ওই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেছিলাম। মি. মাহমুদ আর মি. চৌধুরীরা সেখানে আওয়ামী লীগের নেতা হিসাবে আসেননি, ওই প্রতিবেদনটি যে একতরফা ভাবে তৈরি করা হয়েছে, সেটার জবাব দিতেই এসেছিলেন তারা,” বলছিলেন মি. মজুমদার।

তবে এই বিষয়ে দিল্লির সংবাদ সম্মেলনটি প্রথম নয়। মি. মজুমদার জানাচ্ছিলেন যে, এ নিয়ে তারা প্রথম সংবাদ সম্মেলন করেছিলেন জেনেভাতে। সেখানেই প্রথম বিষয়টি নিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সামনে হাজির হয়েছিলেন তারা।

ভলকার রিপোর্ট নিয়ে আওয়ামী লীগের বক্তব্য তুলে ধরেন বাংলাদেশের প্রাক্তন পররাষ্ট্র মন্ত্রী হাছান মাহমুদ

ভলকার রিপোর্টের ‘জবাব’

দিল্লিতে গত শনিবার, ১৭ই জানুয়ারি যে সংবাদ সম্মেলন হয়, সেটির আয়োজক ছিল ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস রিসার্চ ফাউন্ডেশন বা আইসিএফআর নামে একটি সংগঠন ও লন্ডনভিত্তিক একটি ল-ফার্ম।

জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয় বা ওএইচসিএইচআর জুলাই-অগাস্টের বিক্ষোভ নিয়ে যে প্রতিবেদন করেছিল, তার একটি ‘রিব্যুটাল’ বা জবাবি প্রতিবেদন তৈরি করেছে আইসিএফআর নামে সংগঠনটি।

ওই প্রতিবেদন তৈরি করেছেন যারা, তাদের অন্যতম হলেন লন্ডনভিত্তিক ব্যারিস্টার নিঝুম মজুমদার।

তিনি বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, “এ বিষয়ে আমরা প্রথম সংবাদ সম্মেলনটি করেছিলাম জেনেভাতে। আমরা চাইছিলাম দিল্লির গণমাধ্যমের কাছেও বিষয়টি তুলে ধরতে। আওয়ামী লীগের যে দুজন নেতা সংবাদ সম্মেলনে এসেছিলেন, তাদের নাম দলের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল বলেই আমি জানি।

“এখানে যেহেতু জাতি সংঘের ব্যাপার আছে, তাই আন্তর্জাতিক সম্পর্ক সম্বন্ধে যিনি অবগত, সেই হাছান মাহমুদ ছিলেন আর মি. নওফেল নিজে যেহেতু ব্যারিস্টার, তাই আইন সংক্রান্ত বিষয়ে কথা বলার জন্য তিনি হাজির ছিলেন সংবাদ সম্মেলনে। তারা কিন্তু আওয়ামী লীগ হিসাবে আসেননি,” জানাচ্ছিলেন মি. মজুমদার।

ওই সংবাদ সম্মেলনে হাজির থাকা বাংলাদেশের অন্যতম সাবেক মন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, “জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্কের প্রতিবেদন যে একপেশে ছিল নিরপেক্ষতাবিহীন ছিল, সেটা খুঁজে বার করেছে আইনজীবীদের একটি টিম। জাতিসংঘের ওই প্রতিবেদনে আমাদের সরকার পক্ষের বক্তব্যই তো ছিল না। অথচ তার ভিত্তিতে বিচার হয়ে গেল, মৃত্যুদন্ডও দেওয়া হয়ে গেল।

“এই বিষয়গুলি গণমাধ্যমের সামনে আনার দরকার ছিল। জেনেভা, ব্রাসেলস আর লন্ডনে ইতোমধ্যেই সেখানকার গণমাধ্যমের সামনে তুলে ধরা হয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় দিল্লিতে সংবাদ সম্মেলন হয়। আমি আইনজীবী হিসাবে সেখানে হাজির ছিলাম,” বলছিলেন মি. চৌধুরী।

তার কাছে জানতে চেয়েছিলাম যে নির্বাচনের আগে তাদের দেশের মানুষের কাছে কোনও রাজনৈতিক বার্তা দিতেই কি সংবাদ সম্মেলন করা হয়েছে বা এই সপ্তাহে আরও একবার সাংবাদিকদের মুখোমুখি হবেন তারা?

জবাবে তিনি বলেন, “এই যে নির্বাচন হতে চলেছে, এটা তো ইলেকশন নয়, সিলেকশন। তবে দিল্লির সংবাদ সম্মেলনের সঙ্গে ওই তথাকথিত নির্বাচনের কোনও সম্পর্ক নেই।”

তবে বাংলাদেশের নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের দুজন সাবেক মন্ত্রী সশরীরে ভারতীয় গণমাধ্যমের মুখোমুখি হলে যে বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে প্রশ্ন আসবেই, তাও আয়োজকরা জানতেন এবং এর জন্য প্রস্তুতও ছিলেন।

ভারতের অবস্থানরত আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা বিবিসি বাংলাকে বলেছেন যে বাংলাদেশের মানুষের কাছে তাদের রাজনৈতিক বক্তব্য পৌঁছিয়ে দেওয়ার জন্য ভারতের গণমাধ্যমই সব থেকে উপযুক্ত, তাই দিল্লিতে সংবাদ সম্মেলন করা হয়েছে।

দিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবে শেখ হাসিনার ২০০২ সালের একটি সংবাদ সম্মেলন

শেখ হাসিনা কি সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হবেন?

আগামী শুক্রবার ২৩শে অগাস্ট দিল্লিতেই যে আরেকটি আলোচনা সভা হতে চলেছে, সেটির শীর্ষক ‘সেভ ডেমোক্রেসি ইন বাংলাদেশ’ – বাংলাদেশে গণতন্ত্র বাঁচাও।

অনুষ্ঠানটির আয়োজন করেছে দিল্লিতে অবস্থিত ‘ফরেন করেসপেন্ডেন্টস ক্লাব অফ সাউথ এশিয়া’। সেখানে সশরীরে হাজির থাকবেন অন্যান্যদের মধ্যে সাবেক মন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল। ভার্চুয়াল মাধ্যমে যোগ দেবেন আরেক সাবেক মন্ত্রী মুহাম্মদ আলী আরাফত।

ওই আলোচনা সভার যে দুটি পোস্টার বিবিসি বাংলার হাতে এসেছে, তার একটিতে বড়ো করে শেখ হাসিনার ছবি দেওয়া আছে। এরকম শোনা যাচ্ছে যে শেখ হাসিনাও ওই আলোচনা সভায় ভার্চুয়ালি হাজির হতে পারেন।

কিন্তু আওয়ামী লীগের একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলেও শেখ হাসিনার যোগ দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা যায়নি।

তা যদি হয়, তাহলে ২০২৪ সালের পাঁচই অগাস্ট ভারতে চলে আসার পরে এই প্রথমবার তিনি ভারতীয় গণমাধ্যমের মুখোমুখি হবেন। যদিও ইংরেজি – বাংলা মিলিয়ে ভারতের অনেক সংবাদপত্র এবং সংবাদ পোর্টালকেই ইমেইলের মাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন তিনি।

বিবিসিও ইমেইলেই তার সাক্ষাৎকার নিয়েছে।

আবার ভার্চুয়াল মাধ্যমেই শেখ হাসিনা নিয়মিত তার দলের নেতা-কর্মীদের আলোচনা সভাগুলিতে যোগ দেন। কিন্তু সবই শুধু অডিও মাধ্যমে – ভিডিওতে নয়।

গত শনিবারের সংবাদ সম্মেলনে কথা বলছেন বাংলাদেশের প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল

গত শনিবার যে সংবাদ সম্মেলন করা হয় ‘ভলকার রিপোর্ট’ নিয়ে, তা যে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কৌশলের অংশ, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

যদিও বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ নিতে পারছে না, তবে তারা নিয়মিতই বিভিন্ন মাধ্যমে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরছে। সেসব প্রচারে অবশ্য বিধি নিষেধ জারি করেছে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এমন একটা সময়ে ‘ভলকার রিপোর্ট’ কে সামনে রেখে বা বাংলাদেশের গণতন্ত্রের কথা বলে পক্ষান্তরে রাজনৈতিক প্রচারই করছে আওয়ামী লীগ।

এটা তাদের একটা রাজনৈতিক কৌশল বলে মন্তব্য করছিলেন প্রেস ক্লাব অফ ইন্ডিয়ার প্রেসিডেন্ট গৌতম লাহিড়ী।

Manual6 Ad Code

ঘটনাচক্রে তাদের ক্লাবেই গত শনিবারের সংবাদ সম্মেলন আয়োজিত হয়েছিল এবং তিনি নিজেও হাজির ছিলেন ওই সংবাদ সম্মেলনে।

বিবিসি বাংলাকে তিনি বলছিলেন, “গত শনিবারের ওই অনুষ্ঠানটি তো আওয়ামী লীগের নামে করা হয়নি, লন্ডনভিত্তিক একটি ল-ফার্ম এটার দায়িত্বে ছিল বলেই জানি। আবার সেখানে মানবাধিকারের বিষয়টা সামনে রাখা হয়েছিল। জুলাই-অগাস্টের বিক্ষোভ নিয়ে যে ভলকার রিপোর্ট তৈরি হয়েছে, তার ত্রুটি বিচ্যুতিগুলি ভারতীয় গণমাধ্যমকে, বিশেষত ইংরেজি ভাষার পত্রপত্রিকাগুলির সামনে তারা তুলে ধরতে চেয়েছেন। তবে স্বাভাবিকভাবে আওয়ামী লীগের প্রাক্তন মন্ত্রীদের রাজনৈতিক প্রশ্নও করা হয়েছে।”

তার কথায়, “বাংলাদেশের মানুষ তো ভারতীয় গণমাধ্যমের খবরাখবর প্রচুর পড়েন, তাই এদের মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষের কাছে তারা বার্তা দিতে চেয়েছেন বলে আমার মনে হয়।”

বাংলাদেশে রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ একাধিক নেতাও এই একই কথা বলেছেন। তাদের কথায়, “বিশ্বের অন্যান্য দেশের রাজধানীতে এর আগে ভলকার রিপোর্ট নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করা হলেও সেখানকার গণমাধ্যমের বাংলাদেশ নিয়ে অতটা আগ্রহ থাকবে না, যতটা আগ্রহ দেখাবে ভারতীয় গণমাধ্যম। আবার দিল্লির বদলে কলকাতায় হলে হয়ত আরও বেশি আগ্রহ দেখাত পত্রপত্রিকাগুলো।

কিন্তু গৌতম লাহিড়ী বলছিলেন যে সেদিনের সংবাদ সম্মেলনের আয়োজকদের টার্গেট সম্ভবত ছিল ভারতের জাতীয় গণমাধ্যম।

তিনি বলছিলেন যে আওয়ামী লীগের নেতাদের সংবাদ সম্মেলন করতে ভারত সরকারের কাছ থেকে কোনও অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল কি না, সেটা তিনি জানেন না।

“আয়োজকরা আমাদের সরকারের অনুমোদন নিয়েছিলেন কি না জানা নেই। তবে সরকার তো বাধা দেয় নি। যদি সরকার না চাইত তাহলে তো এ ধরনের অনুষ্ঠান করা যেত না। আমার মনে আছে, চার-পাঁচ বছর আগে যুক্তরাজ্যের হাউস অব লর্ডসের সদস্য লর্ড অ্যালেক্স কার্লাইল বিএনপির কোনো একটা বিষয়ে প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করতে চেয়েছিলেন। ফোন করে সরকারের তরফে বলা হয়েছিল যে ওই আয়োজনটা না করতে দেওয়াই উচিত। পরে একটি হোটেলে তিনি ভার্চুয়াল মাধ্যমে সংবাদ সম্মেলন করেছিলেন।”

 

তথ্য সুএঃ বিবিসি বাংলা