জ্ঞান ও বিদ্যার দেবী সরস্বতী আরাধনার দিন আজ। শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি)। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব সরস্বতী পূজা। সরস্বতী বৈদিক দেবী হলেও সরস্বতী পূজা বর্তমান রূপটি আধুনিককালে প্রচলিত হয়েছে। তবে প্রাচীনকালে তান্ত্রিক সাধকেরা সরস্বতী-সদৃশ দেবী বাগেশ্বরীর পূজা করতেন বলে জানা যায়। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মতে, দেবী সরস্বতী সত্য, ন্যায় ও জ্ঞানালোকের প্রতীক। বিদ্যা, বাণী ও সুরের অধিষ্ঠাত্রী। সনাতন ধর্মাবলম্বীরা মন্ত্র উচ্চারণ করে বিদ্যা ও জ্ঞান অর্জনের জন্য দেবী সরস্বতীর অর্চনা করবেন।
সরস্বতী পূজা উপলক্ষে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস বাণী দিয়েছেন। সরস্বতী পূজা উপলক্ষে হিন্দু সম্প্রদায়ের সবাইকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়ে বাণীতে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘‘বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। হাজার বছর ধরে এ দেশে জাতি, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে সব ধর্মের মানুষ পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সৌহার্দ্যের সঙ্গে মিলেমিশে বসবাস করে আসছেন। এ দেশ আমাদের সকলের। ধর্ম ও বর্ণভেদে নয়— বাংলাদেশ সব মানুষের জন্য এক নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ আবাসভূমি।’’
তিনি বলেন, ‘‘হিন্দু ধর্মমতে দেবী সরস্বতী সত্য, ন্যায় ও জ্ঞানের প্রতীক। তিনি বিদ্যা, বাণী ও সুরের অধিষ্ঠাত্রী। তিনি আমাদের অজ্ঞতার অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে যান। সরস্বতী পূজার এই পবিত্র উৎসব উপলক্ষে আমি প্রত্যাশা করি, আমাদের শিক্ষা যেন কেবল নিজের উন্নতির জন্য না হয়, বরং সমাজের উন্নতির জন্য হয়। আমরা যেন আমাদের জ্ঞান দিয়ে অন্যকে সাহায্য করি, দুর্বলদের পাশে দাঁড়াই এবং একটি সুন্দর সমাজ গড়ে তুলি। আমি হিন্দু ধর্মাবলম্বীসহ বাংলাদেশের সব নাগরিকের শান্তি, কল্যাণ ও সমৃদ্ধি কামনা করি।”
শাস্ত্রীয় বিধান অনুসারে, মাঘ মাসের শুক্লাপঞ্চমী তিথিতে সরস্বতী পূজা অনুষ্ঠিত হয়। এ তিথি বসন্ত পঞ্চমী নামেও পরিচিত। শ্বেত-শুভ্র বসনা স্বরসতী দেবীর এক হাতে বেদ, অন্য হাতে বীণা। এজন্য তাকে বীণাপানিও বলা হয়। সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, জ্ঞান ও বিদ্যার অধিষ্ঠাত্রী দেবী তার আশীর্বাদের মাধ্যমে মানুষের চেতনাকে উদ্দীপ্ত করতে প্রতি বছর আবির্ভূত হন ভক্তদের মাঝে। সরস্বতী খুশি হলে বিদ্যা ও বুদ্ধি অর্জিত হবে। ঐশ্বর্যদায়িনী, বুদ্ধিদায়িনী, জ্ঞানদায়িনী, সিদ্ধিদায়িনী, মোক্ষদায়িনী এবং শক্তির আঁধার হিসেবে সরস্বতী দেবীর আরাধনা করা হয়। তিনি বাগদেবী, বাগদেবী অর্থে তিনি নব হৃদ পবিত্র করেন। তিনি সুন্দর ও মর্ত্যবাক্যের প্রেরণকাত্রী। তিনি মহাসমুদ্রের মতো পরমাত্মার প্রকাশ করেন। তিনি সমুদয় মানব-মানবীর হৃদয়ে জ্যোতি সঞ্চারিত করেন। পরমাত্মার মুখ থেকে তার আবির্ভাব।
Manual2 Ad Code
সরস্বতী পূজা উপলক্ষে হিন্দু সম্প্রদায় বিশেষ করে শিক্ষার্থীরা বাণী অর্চনাসহ নানা ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন করবে। রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের মন্দির ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে পূজা ছাড়াও অন্য অনুষ্ঠানমালায় আছে পুষ্পাঞ্জলি প্রদান, প্রসাদ বিতরণ, ধর্মীয় আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সন্ধ্যা আরতি, আলোকসজ্জা প্রভৃতি।
Manual1 Ad Code
পূজা উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। জগন্নাথ হলকে ঘিরে রয়েছে নানা আয়োজন। এ বছর জগন্নাথ হল প্রশাসনের কেন্দ্রীয় পূজাসহ মোট ৭৬টি মণ্ডপে সরস্বতী পূজার আয়োজন হচ্ছে। এর মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭৪টি বিভাগ ও ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীরা এ পুণ্য আয়োজনে অংশগ্রহণ করবেন। দুদিনব্যাপী এ আয়োজনে থাকবে পুষ্পাঞ্জলি প্রদান, প্রসাদ বিতরণ, মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা ও রক্তদান কর্মসূচি। এ ছাড়াও হলের অভ্যন্তরে দর্শনার্থী শিশু-কিশোরদের চিত্তবিনোদন উপযোগী বেশ কিছু রাইড, খেলনা ও বিশুদ্ধ খাবারের দোকানের ব্যবস্থ্য রাখা হচ্ছে।
Manual3 Ad Code
জগন্নাথ হলের প্রাধ্যক্ষ দেবাশীষ পাল বলেন, ‘‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, উপ-উপাচার্য (প্রশাসন ও শিক্ষা), কোষাধ্যক্ষ ও প্রক্টরের সার্বক্ষণিক ও কার্যকর তত্ত্বাবধানের মাধ্যমে জগন্নাথ হল প্রশাসন হল উপাসনালয় তথা কেন্দ্রীয় পূজামণ্ডপ থেকে শুরু করে সমগ্র হল প্রাঙ্গণের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় লোকবল ও কারিগরি সহায়তা দিয়ে আমাদের পাশে রয়েছেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই), শাহবাগ থানা ও ফায়ার সার্ভিস।’’
পূজা উপলক্ষে সমগ্র জগন্নাথ হল সিসি ক্যামেরার আওতাধীন থাকবে। প্রবেশমুখে মেটাল ডিটেক্টরসহ অন্যান্য প্রযুক্তির ব্যবহার থাকবে। ছোট শিশুদের দুগ্ধ সেবনের জন্য বিশেষ নিরাপদ একটি কর্নার স্থাপন করা হয়েছে। কোনও ধরনের পটকা বা আতশবাজির ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়। এছাড়া যানবাহন নিয়ন্ত্রণের জন্য হল প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিশেষ স্টিকার সরবরাহ করা হয়েছে।
Manual8 Ad Code
এ ছাড়া ঢাকা রামকৃষ্ণ মঠ ও রামকৃষ্ণ মিশন, সিদ্ধেশ্বরী মন্দির, শাঁখারী বাজার, তাঁতি বাজার ও রমনা কালী মন্দিরসহ মণ্ডপে মণ্ডপে সরস্বতী পূজার আয়োজন করা হবে। সন্ধ্যা আরতি এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হবে। এ উপলক্ষে আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন থাকবে। এই পূজাকে ঘিরে ঢাক-ঢোল-কাঁসর, শঙ্খ ও উলুধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠবে বিভিন্ন পূজামণ্ডপ।