ইসলামাবাদের দিকে তাকিয়ে বিশ্ব; শান্তির খোঁজে বৈঠকে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র
ইসলামাবাদের দিকে তাকিয়ে বিশ্ব; শান্তির খোঁজে বৈঠকে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র
editor
প্রকাশিত এপ্রিল ১১, ২০২৬, ০২:৪৭ পূর্বাহ্ণ
Manual5 Ad Code
অনলাইন ডেস্ক:
Manual4 Ad Code
ইরানের মূল লক্ষ্য : সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং হরমুজ প্রণালির ওপর নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা * যুক্তরাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য : হরমুজকে শর্তহীনভাবে উন্মুক্ত রাখা এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি মুছে ফেলা
নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তায় মুড়ে ফেলা হয়েছে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদ। মোড়ে মোড়ে টহল দিচ্ছে সেনাবাহিনী, শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো একেবারে সিলগালা করে দেওয়া হয়েছে। টানা ৪২ দিনের ধ্বংসযজ্ঞ আর চরম স্নায়ুচাপের পর এই শান্ত শহরেই আজ বহুল প্রতীক্ষিত শান্তি বৈঠকে মুখোমুখি হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের উচ্চপদস্থ প্রতিনিধিদল।
খাদের কিনারা থেকে বিশ্বকে ফেরানোর এই ঐতিহাসিক আয়োজনে পুরো বিশ্বের নজর এখন ইসলামাবাদের দিকে। আলোচনার টেবিলে ইরানের মূল লক্ষ্য থাকবে সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। অন্যদিকে ওয়াশিংটন মরিয়া থাকবে হরমুজকে শর্তহীনভাবে উন্মুক্ত রাখাসহ ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও প্রক্সি শক্তির ডানা পুরোপুরি ছেঁটে ফেলতে। এসব ইস্যু নিয়ে দুই পক্ষের অনড় অবস্থানের কারণে এ বৈঠক নিয়ে আশার আলো দেখা গেলেও পাশাপাশি চরম অনিশ্চয়তাও রয়েছে।
Manual5 Ad Code
এদিকে সাময়িক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও হরমুজ প্রণালি এখনো পুরোপুরি খোলেনি। অন্যদিকে লেবাননে হামলা অব্যাহত রেখেছে ইসরাইল। প্রথম শান্তি বৈঠক শুরুর আগে শুক্রবার এ দুই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটন ও তেহরান একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ এনেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে বলেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল চলাচলের ক্ষেত্রে ইরান ‘অত্যন্ত বাজে কাজ’ করছে। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমাদের চুক্তি এমন ছিল না। অন্যদিকে ইরান বলছে, লেবাননে ইসরাইলের অব্যাহত হামলা যুদ্ধবিরতির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। যুদ্ধবিরতি ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইসরাইলি বাহিনী লেবাননের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় ভয়াবহ হামলা চালায়, এতে ২৫০ জনেরও বেশি লেবানিজ নিহত হন।
ইরানের দাবি, লেবাননও এই চুক্তির আওতাভুক্ত। চুক্তির মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানও শুরুতে এই অবস্থানকে সমর্থন করেছিল। ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র বলছে, মার্কিন-ইরান যুদ্ধবিরতিতে লেবানন অন্তর্ভুক্ত নয়। তবে শুক্রবার নিজেদের অবস্থান থেকে কিছুটা সরে এসে ইসরাইল জানায়, লেবাননে যুদ্ধ বন্ধ ও হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করার লক্ষ্যে তারা লেবানন সরকারের সঙ্গে আলাদা আলোচনা শুরু করবে।
পালটাপালটি অভিযোগ থাকলেও পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে আজ প্রথম মার্কিন-ইরান শান্তি আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার কোনো আশঙ্কা আপাতত নেই বলছেন পশ্চিমা বিশ্লেষকরা। আলোচনা প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত একটি পাকিস্তানি সূত্র জানিয়েছে, সবকিছু ঠিকঠাক চলছে। লেবাননে সহিংসতা কমে এসেছে। এটিকে ইতিবাচক লক্ষণ হিসাবে উল্লেখ করে সূত্রটি বলে, উত্তেজনা কমেছে, এটি ভালো লক্ষণ।
সূত্রটি আরও জানায়, উভয় দেশের অগ্রগামী দল এরই মধ্যে ইসলামাবাদের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত পাঁচতারকা সেরেনা হোটেলে অবস্থান নিয়েছে। পুরো আলোচনা চলাকালে উভয় প্রতিনিধিদল এখানেই থাকবে। শুক্রবার সরাসরি কোনো বৈঠকের পরিকল্পনা না থাকলেও পাকিস্তান দুই পক্ষের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান করছে।
Manual7 Ad Code
শান্তি বৈঠক উপলক্ষ্যে ইসলামাবাদের কেন্দ্রস্থল পুরোপুরি লকডাউন করা হয়েছে। তাড়াহুড়া করে সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে এবং হোটেলের চারপাশে ৩ কিলোমিটার (২ মাইল) এলাকা নিয়ে একটি ‘রেড জোন’ তৈরি করে কঠোর নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়েছে।
ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধিদলের পৌঁছানোর সঠিক সময় নিয়ে পাকিস্তানি কর্মকর্তারা মুখ খোলেননি। তবে শুক্রবার পাকিস্তানের উদ্দেশে রওয়ানা দিয়েছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধিদল। আজ আলোচনার আগেই তাদের পাকিস্তানে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
যুদ্ধের সময়কার স্বাভাবিক চিত্রের মতোই শুক্রবারও ইরানের নিজস্ব জাহাজগুলো কোনো বাধা ছাড়াই প্রণালি পার হয়েছে, যেখানে অন্য দেশের জাহাজগুলো আটকে ছিল। শুক্রবার যে কয়েকটি জাহাজ প্রণালি পার হয়েছে, তার মধ্যে ২০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল বহনে সক্ষম একটি ইরানি সুপারট্যাংকারও ছিল। অথচ যুদ্ধের আগে প্রতিদিন গড়ে ১৪০টি জাহাজ এই পথ দিয়ে চলাচল করত, যা ২ কোটি ব্যারেল তেল পরিবহণ করত।
এদিকে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতির প্রতিশ্রুতি পালন করলেই কেবল শান্তি আলোচনা ফলপ্রসূ হতে পারে। তিনি বলেন, লেবাননে ইসরাইলি হামলা বন্ধ করা এই চুক্তির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। ইসলামাবাদে প্রতিনিধিদল পাঠানো প্রসঙ্গে বাঘাই আরও বলেন, পাকিস্তান দুই পক্ষকেই আমন্ত্রণ জানিয়েছে এবং বিষয়টি এখনো পর্যালোচনাধীন। যদি সফরের বিষয়টি চূড়ান্ত হয়, তবেই প্রতিনিধিদলের তালিকা প্রকাশ করা হবে। খবর আলজাজিরা, রয়টার্স, বিবিসি, তাসনিম নিউজ ও এএফপিসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের।
যা চাইবে ইরান : বহুল আলোচিত ১০ দফা শান্তি প্রস্তাবই বৈঠকে তুলবে ইরান। এই প্রস্তাবে অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেওয়া সব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ, মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার এবং ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকারের স্বীকৃতির মতো বড় দাবিগুলো রয়েছে। ট্রাম্প এর মূল কিছু বিষয়, বিশেষ করে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন। জনসমক্ষে আসা এই প্রস্তাবের কিছু অংশের বিরোধিতা করলেও তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, নিষেধাজ্ঞা শিথিল ও শুল্ক সমন্বয়ের বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হতে পারে। যুদ্ধের প্রথম দিনেই নিহত বাবার স্থলাভিষিক্ত হওয়া ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি এখনো জনসমক্ষে আসেননি। তবে বৃহস্পতিবার এক কড়া বিবৃতিতে তিনি জানিয়েছেন, যুদ্ধের সব ক্ষয়ক্ষতির জন্য ইরান ক্ষতিপূরণ দাবি করবে। তিনি বলেন, যারা আমাদের দেশে হামলা চালিয়েছে, সেই অপরাধী আগ্রাসীদের আমরা অবশ্যই বিনা শাস্তিতে ছেড়ে দেব না।
যা চাইবে যুক্তরাষ্ট্র : অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র চায় ইরান তাদের ইউরেনিয়াম হস্তান্তর করুক, পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করুক, মিসাইল কর্মসূচি বাতিল করুক এবং আঞ্চলিক মিত্রদের প্রতি সমর্থন বন্ধ করুক। যুদ্ধ শুরুর দুদিন আগে ট্রাম্প যে আলোচনা থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন, এগুলো সেই পুরোনো দাবি।
Manual7 Ad Code
কারা থাকছেন এই বৈঠকে : হোয়াইট হাউজ জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইসলামাবাদে একটি প্রতিনিধিদল পাঠাচ্ছেন, যার মধ্যে রয়েছেন তার জামাতা জ্যারেড কুশনার, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এই বৈঠকের আয়োজক হিসাবে থাকবেন। অন্যদিকে ইরানি প্রতিনিধিদলে দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি উপস্থিত থাকবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কোথায় হবে বৈঠক : ইসলামাবাদের সেরেনা হোটেলেই এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে পারে। হোটেলটি অতিথিশূন্য করে ফেলা হয়েছে এবং আশপাশের সড়কগুলো বন্ধ করে সেনাবাহিনী নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে ফেলেছে। তবে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান শুক্রবার জানিয়েছে, বিকল্প ভেন্যু হিসাবে প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয়, শহরের কনভেনশন সেন্টার অথবা কোনো সুরক্ষিত সামরিক ঘাঁটির কথাও বিবেচনা করা হচ্ছে। তথ্য সুএঃ যুগান্তর