মহিউদ্দিন আহমদের কলাম; ডেডলাইন ১২ ফেব্রুয়ারি: ইলেকশনে কে জিতবে?
মহিউদ্দিন আহমদের কলাম; ডেডলাইন ১২ ফেব্রুয়ারি: ইলেকশনে কে জিতবে?
editor
প্রকাশিত ফেব্রুয়ারি ৬, ২০২৬, ০৩:২২ অপরাহ্ণ
Manual5 Ad Code
অনলাইন ডেস্ক:
Manual7 Ad Code
যাঁর সঙ্গেই দেখা হয়, একটাই প্রশ্ন, ‘ইলেকশনে কে জিতবে।’ জাতীয় সংসদের নির্বাচন দরজায় কড়া নাড়ছে। কয়েক দিন বাদেই ভাগ্য পরীক্ষায় নামছেন কয়েক হাজার দেশসেবক। সেই সঙ্গে ঝুলে আছে কোটি কোটি মানুষের নসিব, অনেকটা কাঁটাতারে ঝুলন্ত ফেলানীর লাশের মতো। ফেলানীরা বেঁচে থাকার জন্য কত কী–ই না করে।
প্রতিকূল সমাজ আর বৈরী সময় তাদের বাঁচতে দেয় না। আমরাও খড়কুটো আঁকড়ে ধরে কোনোরকমে ভেসে বেড়াচ্ছি। খুঁজছি কূলের নাগাল। আশা আছে, একদিন ডাঙায় পৌঁছাতে পারব। নাকি ডুবে মরব জলে। নিজেদের সঁপে দিয়েছি নিয়তির হাতে।
একসময় এ দেশে মার্ক্সবাদের চর্চা হতো বেশুমার। মার্ক্সের দুনিয়ায় নিয়তির ঠাঁই নেই। সেখানে পরিবর্তনের অনুঘটক হলো সমাজের অগ্রগামী অংশ, যাঁরা শ্রেণিদ্বন্দ্বকে কাজে লাগিয়ে অতীত ঝেড়ে ফেলে সামনে এগোন। এখন মার্ক্স ইতিহাস থেকে বৃন্তচ্যুত হয়ে পুরাণে ঠাঁই নিয়েছেন। তাঁকে নিয়ে পূজা-অর্চনা হয়। তিনি সমাজবিজ্ঞানচর্চার যে নতুন ধারার সূচনা করেছিলেন, সেটি মরচে পড়ে অকেজো-অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে। অবচেতনে যে অদৃষ্টবাদ বাসা বেঁধেছিল, তার এখন রমরমা।
Manual8 Ad Code
নির্বাচন সামনে রেখে দেশসেবকেরা কোমর বেঁধে নেমেছেন। তাঁদের কথা বদলে যাচ্ছে। তাঁরা প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি বইয়ে দিচ্ছেন। মানুষের যত ইহজাগতিক চাহিদা আছে, সবই তাঁরা পূরণ করবেন। এ নিয়ে তাঁদের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই। অনেকটা ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের নিলামের মতো। এ যদি বলে আমি এত দেব, তো ও বলে আমি দেব তার চেয়ে বেশি। একপর্যায়ে প্রতিশ্রুতি হয়ে যায় আকাশছোঁয়া।
শুধু কথা নয়, সুরও যাচ্ছে পাল্টে। একজন রাজনীতিবিদ যে কত বিনয়ী হতে পারেন, নির্বাচন না এলে বোঝা যায় না। তাঁরা বাড়ি বাড়ি যাচ্ছেন, মাঠে-ঘাটে, হাটে-বাজারে ঘুরছেন, আমজনতার সঙ্গে হাত মেলাচ্ছেন, কোলাকুলি করছেন, হাসিমুখে কুশল জানতে চাচ্ছেন, হাতজোড় করে সমর্থন ভিক্ষা করছেন। আমরা যেন এক রূপকথার জগতে চলে এসেছি। এখানে সবাই দেবদূত।
দেশের সবচেয়ে বড় ভোটব্যাংক হলো মুসলমান। সংখ্যায় তাঁরা নব্বই ভাগ। এটি তো হাতছাড়া করা যায় না। মুসলমানের পরিচয় নাকি পোশাকে। দেখা যাচ্ছে, অনেক দেশসেবকের মাথায় টুপি কিংবা ঘোমটা। দেশে টুপির উৎপাদন ও বিপণন বেড়ে গেছে বলে মনে হয়। পণ্যের পসরা নিয়ে হাজির হচ্ছেন স্বপ্নের ফেরিওয়ালারা। কেউ মেটাবেন ইহকালের চাহিদা। কেউ দেবেন পরকালের চিরস্থায়ী সুখের টিকিট।
দেশসেবকেরা যতই ভালো মানুষ হন না কেন, তাঁদের মধ্যে আছে দলাদলি। তাঁরা একেকজন একেকটি গোষ্ঠীর পক্ষভুক্ত। এগুলোকে আমরা বলি রাজনৈতিক দল। দলের লোক দলবাজি করবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তাঁরা যেভাবে একে অন্যের বিরুদ্ধে তেড়েফুঁড়ে ওঠেন, আস্তিন গোটান, আস্ফালন করেন, তাতে মনে হয়, নির্বাচনে জেতা মানে হাতে স্বর্গ পাওয়া আর হেরে যাওয়া মানে স্বর্গ হইতে পতন। অতএব যেভাবেই হোক, জিততে হবে। একটি আসনে তো জিতবে একজনই। সবাই জয়ের জন্য মরিয়া হলে যা হয়—হম্বিতম্বি আর গালাগাল থেকে মারামারি, তারপর খুনোখুনি। এটি আর প্রতিযোগিতা থাকে না। এটি হয় যুদ্ধ। এই যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে।
Manual8 Ad Code
কথা হচ্ছিল নিয়তি নিয়ে। আমরা ভোট দিয়ে যে তিন শ দেবদূত বেছে নেব, তাঁদের হাতে আমাদের জীবন জমা রাখব পাঁচ বছরের জন্য। আমাদের একটাই আশা, তাঁরা তাঁদের নিয়ত পূরণ করবেন। তাঁদের অমৃত বচন আমাদের মনে থাকবে এবং তাঁরাও সেটি ভুলে যাবেন না। আসলেই কি তাঁরা এসব মনে রাখেন?
আমরা অনেক সময় বলি, অমুক নির্বাচনে একটা নীরব বিপ্লব ঘটে গেছে। এর অর্থ হলো, পূর্বাভাস ভুল প্রমাণ করে মানুষ এমন একটি পক্ষকে সমর্থন দিয়েছে, যেটি আগে আন্দাজ করা যায়নি। এসব ক্ষেত্রে সমীকরণটা বোঝা কঠিন। সেখানে হার-জিতের অনুপাত ৫১ থেকে ৪৯ হতে পারে, আবার ৮০ থেকে ২০-ও হতে পারে।
দেশে তো এর আগে আরও বারোটি নির্বাচন হয়েছে। তাঁরা তাঁদের কথা রাখলে দেশটা তো এত দিনে স্বর্গ হয়ে যেত। অথচ দেশটা দিন দিন কেমন নরক হয়ে যাচ্ছে। চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, রাহাজানি, মজুতদারি, কালোবাজারি, খুনোখুনি, নারী ও শিশু নির্যাতন ক্রমে বাড়ছে। ব্যাংক লোপাট হয়ে যাচ্ছে। অফিস-আদালতে লালফিতার গেরো আরও শক্ত হচ্ছে।
টেলিভিশনের পর্দায়, সিনেমায় আমরা কত দেশ দেখি। জুরাসিক পার্ক–এর শুটিং হয়েছে নিউজিল্যান্ডে। উত্তর মেরুর কাছাকাছি কয়েকটি দেশ নিয়ে যে অঞ্চল, তার নাম স্ক্যান্ডিনেভিয়া। আমাদের ঘরের কাছে আছে একটি দেশ—ভুটান। মনে হয় রূপকথার রাজ্য। এসব দেশের ছবি দেখে মনে হয়, পৃথিবীর মধ্যেই তারা স্বর্গ বানিয়ে রেখেছে। আর যখন নিজেদের দিকে তাকাই, মনে হয় পৃথিবীর নরক এখানেই। কবির কল্পনার সুজলা-সুফলা-শস্য শ্যামলা বাংলা এখন দুনিয়ার আস্তাকুঁড়। তারপরও আমরা নিজেদের সান্ত্বনা দিই। ‘কেমন আছ,’ জিজ্ঞেস করলে রোবটের মতো বলি, ‘ভালো আছি।’ এর চেয়ে বড় মিথ্যা আর কী হতে পারে।
নির্বাচনে কেউ না কেউ তো জিতবেন। কোনো একটি দল বা জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করবে। প্রশ্ন হলো, জিতবে কারা? যখন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তাম, তখন ছাত্র সংসদের নির্বাচন এলে ক্যাম্পাস মুখর হতো স্লোগানে স্লোগানে, ‘জিতছে কারা জিতবে কারা, অমুক ছাড়া আবার কারা’।
Manual3 Ad Code
এখনো এমন স্লোগান শোনা যায়। কিন্তু কে জিতবে, তা আগাম বলা কঠিন। আবহাওয়া কাল এক রকম তো আজ অন্য রকম। এক নেতার একটা কথায় ভোটের পারদ মনে হয় আসমান ছুঁই ছুঁই, তো আরেক নেতার পাল্টা কথায় সেটি তলানিতে। যাঁর সঙ্গেই কথা বলি, তিনি তাঁর ইচ্ছাপূরণের গল্প বলেন। তিনি যাঁর সমর্থক, তাঁর কাছে সেই ব্যক্তিই অপ্রতিরোধ্য।
নিয়মিত বিরতিতে নির্বাচন হলে একটা ‘ট্রেন্ড লাইন’ আঁকা যায়। সেখানে পূর্বাভাস দেওয়া সহজ। যেহেতু একটা ‘স্বাভাবিক’ নির্বাচন হচ্ছে আঠারো বছর পর, সে রকম নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না। এই আঠারো বছরে অনেক কিছু বদলে গেছে। সময় পাল্টেছে। পাল্টে গেছে মানুষের মন। পুরোনো ভোটার অনেকেই লোকান্তরে। নতুন ভোটার যুক্ত হয়েছেন অসংখ্য, যাঁরা প্রথমবার ভোট দেবেন। তাঁরা যেদিকে হেলবেন, সেদিকেই পাল্লা ঝুঁকে পড়বে।