আজ মঙ্গলবার, ১৯শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৫ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পাকিস্তানের যে কূটনীতির ফলে ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি আলোচনা

editor
প্রকাশিত এপ্রিল ১০, ২০২৬, ১০:৩৭ অপরাহ্ণ
পাকিস্তানের যে কূটনীতির ফলে ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি আলোচনা

Manual8 Ad Code

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

Manual5 Ad Code

পাকিস্তানের ভূমিকা নিয়ে সাবেক রাষ্ট্রদূত আসিফ দুররানি বলেন, ‘শান্তি ফেরাতে পাকিস্তান তার কাজ করে দিয়েছে। মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আপনার কাজ হলো ঘোড়াকে পানি পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া, কিন্তু তাকে পানি পান করানো আপনার কাজ নয়। পাকিস্তান যে সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে, তা গ্রহণ করা এখন সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর ওপর নির্ভর করছে।’

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দুই সপ্তাহের অস্ত্রবিরতি কার্যকর করার ক্ষেত্রে সফল মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করার পর পাকিস্তান এখন দেশ দুটির মধ্যে সরাসরি শান্তি আলোচনার আয়োজক হিসেবে প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। এই কূটনৈতিক সাফল্যের পর এবং শনিবার (১১ এপ্রিল) থেকে শুরু হতে যাওয়া এই ঐতিহাসিক বৈঠককে সামনে রেখে রাজধানী ইসলামাবাদে দুই দিনের সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।

আলোচনাটি শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী এগোবে কি না তা নিয়ে এখনও অনিশ্চয়তা থাকলেও, প্রস্তুতিতে কোনো কমতি রাখেনি পাকিস্তান। প্রায় ১০ হাজার পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করায় পুরো শহর এখন নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা, রাস্তাঘাটও জনশূন্য হয়ে পড়েছে।

Manual5 Ad Code

এই আলোচনার ওপর এখন পুরো বিশ্বের নজর। কারণ, যুদ্ধের সমাপ্তি এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত হওয়ার ওপর বিশ্ব অর্থনীতির ভাগ্য নির্ভর করছে। যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এই প্রণালি দিয়েই পরিবাহিত হতো।

Manual8 Ad Code

তবে এই আলোচনা পাকিস্তানের জন্য শুধু সম্মানের নয়, বরং অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইও বটে। সিঙ্গাপুরের নানইয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটির দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক বিশেষজ্ঞ আব্দুল বাসিত বলেন, ‘এই আলোচনা ব্যর্থ হলে পাকিস্তান এক ‘ভয়াবহ দুঃস্বপ্নের’ মুখে পড়বে। কারণ প্রতিবেশী ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। গত বছর সৌদি আরবের সাথে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করায় পাকিস্তান এরই মধ্যে স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, তারা রিয়াদের প্রতি তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবে।’

বাসিত আরও ব্যাখ্যা করেন, এমনটি ঘটলে পাকিস্তানের তিনটি সীমান্তই (ভারত, আফগানিস্তান ও ইরান) একসঙ্গে ‘উত্তপ্ত’ হয়ে উঠবে। বর্তমানে পাকিস্তান এমনিতেই তাদের চারটি প্রদেশের দুটিতে বিদ্রোহ দমনের লড়াই চালাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে আরও একটি ফ্রন্টে যুদ্ধ করার সামর্থ্য পাকিস্তানের নেই।

তবে ঝুঁকি থাকলেও পাকিস্তানের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এখন আনন্দ ও গর্বের জোয়ার বইছে। আব্দুল বাসিত মনে করেন, এটি পাকিস্তানের জন্য একটি বড় জয়। কারণ বিশ্বের আর কোনো দেশ এই যুদ্ধবিরতি কার্যকর করতে সক্ষম হয়নি। আমরা যখন এক মহাবিপর্যয়ের দ্বারপ্রান্তে ছিলাম, তখন পাকিস্তান সেই পরিস্থিতি রুখে দিয়েছে।

রাজনৈতিক অস্থিরতা, ভঙ্গুর অর্থনীতি এবং ভারতের সাথে চরম তিক্ত সম্পর্কের মধ্য দিয়ে যাওয়া একটি দেশের জন্য এই সাফল্য অত্যন্ত প্রয়োজন ছিল। কিন্তু প্রশ্ন হলো, পাকিস্তান এই অসাধ্য সাধন করল কীভাবে?

ট্রাম্পের ‘প্রিয়’ সেনানায়ক

যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং উপসাগরীয় দেশ—সবার কাছেই গ্রহণযোগ্যতা থাকায় পাকিস্তান খুব ভালো অবস্থানে রয়েছে। পাকিস্তানের ক্ষমতাসীন দল পিএমএল-এনের সিনেটর মুশাহিদ হোসেন সৈয়দের মতে, এই পুনর্মিলন প্রক্রিয়ার নেতৃত্বে রয়েছেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির। ডোনাল্ড ট্রাম্প তাকে তার ‘ফেভারিট ফিল্ড মার্শাল’ বলে ডাকেন।

পাকিস্তানের রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর দীর্ঘদিনের প্রভাব থাকায় আসিম মুনিরকে দেশটির সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রে ও জাতিসংঘে নিযুক্ত পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত মালিহা লোধি বলেন, ‘ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ শুরু হওয়ার পরপরই আসিম মুনির মার্কিন প্রেসিডেন্টের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তোলেন এবং তাকে দুটি ‘আগাম জয়’ উপহার দেন।

প্রথমটি হলো, সিআইএ-র গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ২০২১ সালে কাবুল বিমানবন্দরে হামলার মূল পরিকল্পনাকারীকে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দেওয়া। ওই আত্মঘাতী হামলায় ১৭০ জন আফগান ও ১৩ জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছিলেন। মালিহা লোধি বলেন, ‘ট্রাম্প এর জন্য এতটাই কৃতজ্ঞ ছিলেন যে, কংগ্রেসে তার প্রথম ভাষণেই তিনি বিষয়টি উল্লেখ করেছিলেন।’

দ্বিতীয় জয়টি ছিল ভারতের সাথে উত্তেজনা প্রশমনে ট্রাম্পের ভূমিকাকে বড় করে দেখা। পাকিস্তান সেই হাতেগোনা কয়েকটি দেশের একটি যারা ট্রাম্পকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনীত করেছে।

পাশাপাশি পাকিস্তান তাদের খনিজ সম্পদের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রবেশাধিকার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী পরিচালিত ফ্রন্টিয়ার ওয়ার্কস অর্গানাইজেশন একটি মার্কিন কোম্পানির সাথে ৫০০ মিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ চুক্তি সই করে। এছাড়া জানুয়ারিতে ট্রাম্প পরিবারের ক্রিপ্টোকারেন্সি ভেঞ্চার ‘ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফাইন্যান্সিয়াল’-এর সাথেও একটি চুক্তি করেছে পাকিস্তান। এর ফলে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মহলের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক আরও মজবুত হয়েছে।

‘নীতিগত অবস্থান’

যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ হলেও ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার পাল্টাপাল্টি হামলায় পাকিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরায়েলি হামলার নিন্দা জানায়। আবার যখন সৌদি আরবের তেলক্ষেত্রে ইরান হামলা করে, তখন পাকিস্তান ইরানের বিরুদ্ধেও কড়া বিবৃতি দেয়।

৭ এপ্রিল জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার একপাক্ষিক প্রস্তাবের ওপর ভোটদানে বিরত থাকে পাকিস্তান। সিনেটর মুশাহিদ হোসেন একে ‘নীতিগত ও ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি জানান, এই নিরপেক্ষ অবস্থানই ইরান ও উপসাগরীয় দেশগুলোর আস্থা অর্জনে সাহায্য করেছে।

সাবেক পররাষ্ট্র সচিব আইজাজ চৌধুরী জানান, প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এই আলোচনার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। গত পাঁচ সপ্তাহে শরিফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার ওয়াশিংটন, মস্কো, বেইজিং, তুরস্ক, মিশর এবং সৌদি-কাতারসহ ডজনখানেক বিশ্বনেতার সঙ্গে কথা বলেছেন।

অস্ত্রবিরতি ঘোষণার দিন শাহবাজ শরিফ ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সাথে কথা বলেন। পেজেশকিয়ান আলোচনায় অংশ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন এবং পাকিস্তানের প্রচেষ্টার প্রশংসা করেন।

সাবেক রাষ্ট্রদূত আসিফ দুররানি মনে করেন, ইরানের সঙ্গে ৯২০ কিলোমিটারের দীর্ঘ সীমান্ত এবং শরণার্থী ও জঙ্গি দমনে দীর্ঘদিনের সহযোগিতা এই আস্থার ভিত্তি তৈরি করেছে। এছাড়া ধর্মীয় সংযোগও একটি বড় কারণ। সুন্নি প্রধান দেশ হলেও পাকিস্তানে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শিয়া জনগোষ্ঠী বাস করে, যারা প্রতি বছর হাজার হাজার সংখ্যায় ইরানে তীর্থযাত্রায় যান।

Manual8 Ad Code

আগামীর চ্যালেঞ্জ

শনিবারের আলোচনা ঘিরে অনিশ্চয়তা এখনো কাটেনি। লেবাননে ইসরায়েলি হামলা এই শান্তি প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। মালিহা লোধি বলেন, ‘ইসরায়েল এরই মধ্যে লেবাননে তীব্র হামলা চালিয়ে এই যুদ্ধবিরতিকে নড়বড়ে করার চেষ্টা করছে। এখন ট্রাম্পের ওপর দায় বর্তায় তিনি ইসরায়েলকে কতটা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেন।’

পাকিস্তানের ভূমিকা নিয়ে আসিফ দুররানি বলেন, ‘শান্তি ফেরাতে পাকিস্তান তার কাজ করে দিয়েছে। মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আপনার কাজ হলো ঘোড়াকে পানি পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া, কিন্তু তাকে পানি পান করানো আপনার কাজ নয়। পাকিস্তান যে সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে, তা গ্রহণ করা এখন সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর ওপর নির্ভর করছে।’তথ্য সুএঃ বিবিসি বাংলা