পাঁচ বছর আগে নন্দীগ্রামের সেই লড়াইয়ের পুনরাবৃত্তি ঘটল ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে। তবে এবার ক্ষেত্রটি ভিন্ন। তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিজের দুর্গ হিসেবে পরিচিত কলকাতার ভবানীপুর কেন্দ্রে তাকে পরাজিত করে এক অনন্য নজির স্থাপন করলেন বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী। নন্দীগ্রামের হারের পর যে ভবানীপুর মমতাকে মুখ্যমন্ত্রী পদে টিকে থাকতে সাহায্য করেছিল, সেই আসনেই এবার ধস নামালেন তার একসময়ের ঘনিষ্ঠ সেনাপতি।
সোমবার (০৪ মে) ভোট গণনার শুরু থেকেই ভবানীপুর কেন্দ্রে টানটান উত্তেজনা লক্ষ্য করা যায়। ‘মিনি ইন্ডিয়া’ খ্যাত এই আসনে মুহূর্তের ব্যবধানে বদলেছে লিড।
সকালে পোস্টাল ব্যালট গণনায় শুভেন্দু অধিকারী শুরুতেই এগিয়ে যান। দুপুরে সপ্তম রাউন্ডের শেষে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পাল্টা ঘুরে দাঁড়ান এবং একসময় ১৯,০০০ ভোটের ব্যবধানে লিড নেন। রাজনৈতিক মহলে তখন মনে হচ্ছিল মমতার জয় কেবল সময়ের অপেক্ষা। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে মমতার লিড নাটকীয়ভাবে কমে ২,৯০০-তে নেমে আসে। তবে ১৮তম রাউন্ড শেষে রাত ৯টার দিকে শুভেন্দু ১১,০০০ ভোটে এগিয়ে যান। অবশেষে চূড়ান্ত ফলাফলে দেখা যায়, প্রায় ১৫,০০০ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন শুভেন্দু অধিকারী।
Manual4 Ad Code
উল্লেখ্য, শুভেন্দু এবার নন্দীগ্রাম এবং ভবানীপুর—উভয় আসনেই বিশাল জয় ছিনিয়ে নিয়েছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নিজের খাসতালুক কালীঘাট যে বিধানসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত, সেখানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই পরাজয় অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তার এই পতনের পেছনে বেশ কিছু প্রধান কারণ উঠে আসছে।
Manual6 Ad Code
আরজি কর কাণ্ডের প্রভাব: আরজি কর মেডিকেল কলেজে ঘটে যাওয়া নৃশংস ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা রাজ্যের নারী নিরাপত্তা নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছিল। এই ইস্যুটি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাবমূর্তিতে বড় আঘাত হেনেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
তীব্র প্রতিষ্ঠান বিরোধী হাওয়া: দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকার পর তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে জনমানসে যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল, তা এবার ব্যালট বক্সে ফুটে উঠেছে।
Manual5 Ad Code
বিজেপির ভোট ব্যাংক সংহতি: ভবানীপুরের মিশ্র জনজাতি বা ডেমোগ্রাফিক বিন্যাসকে কাজে লাগিয়ে বিজেপি নিজেদের ভোট ব্যাংক সুসংহত করতে সক্ষম হয়েছে।
Manual7 Ad Code
স্বচ্ছ নির্বাচন প্রক্রিয়া: এবার অত্যন্ত নির্ভীক এবং স্বচ্ছ ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ায় ভোটাররা কোনো চাপ ছাড়াই নিজেদের রায় দিতে পেরেছেন।
কেবল ভবানীপুর নয়, সামগ্রিকভাবে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের ভরাডুবি হয়েছে। ২৯৩টি আসনের মধ্যে বিজেপি প্রায় ২০০টি আসনে জয়ী হয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে। অন্যদিকে, নিজের খাসতালুকে খোদ মুখ্যমন্ত্রীর পরাজয় তৃণমূল শিবিরের জন্য সবথেকে বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
২০২১ সালে নন্দীগ্রামে পরাজয়ের ক্ষত ঢাকতে ভবানীপুরকে ঢাল করেছিলেন মমতা, কিন্তু ২০২৬-এ সেই ভবানীপুরই তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াল। এখন দেখার, এই অভাবনীয় পরিবর্তনের পর বাংলার রাজনীতির গতিপ্রকৃতি কোন দিকে মোড় নেয়।