সোনিয়া গান্ধীর সঙ্গে একান্ত বৈঠক, কংগ্রেসে ফিরছেন কি মমতা?
সোনিয়া গান্ধীর সঙ্গে একান্ত বৈঠক, কংগ্রেসে ফিরছেন কি মমতা?
editor
প্রকাশিত জুন ১০, ২০২৬, ০৯:১০ অপরাহ্ণ
Manual5 Ad Code
অনলাইন ডেস্ক
সোনিয়া গান্ধীর সঙ্গে একান্ত বৈঠকের পর পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এখন একটাই বড় প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—মমতা বন্দোপাধ্যায় কি কংগ্রেসে ফিরছেন? ১৯৯৭ সালে কংগ্রেস ত্যাগ করে অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি) গঠন করেছিলেন পশ্চিমবঙ্গের টানা তিনবারের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়।
Manual2 Ad Code
মাত্র এক সপ্তাহ আগেও যে বিষয়টি রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দূরতম কল্পনাতেও ছিল না, আজ তা নয়াদিল্লির রাজনৈতিক অলিন্দে এক তীব্র জল্পনায় রূপ নিয়েছে। তবে চূড়ান্ত কোনো ঘোষণা আসার আগ পর্যন্ত এই সম্ভাবনার গায়ে একটি প্রশ্নবোধক চিহ্ন রেখে দেওয়াই শ্রেয়—মমতা বন্দোপাধ্যায় কি সত্যিই তার তৃণমূল কংগ্রেসকে কংগ্রেসের সঙ্গে একীভূত করতে যাচ্ছেন?
রাজনীতিতে কোনো কিছুই অসম্ভব নয়। এক নজিরবিহীন ঘটনাক্রম নয়াদিল্লির গণমাধ্যমে এই আলোচনার হাওয়া আরও গরম করে তুলেছে। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে নিজের বিধায়কদের কাছ থেকে এক পূর্ণাঙ্গ বিদ্রোহের মুখে পড়েছেন মমতা। মার খাচ্ছেন তার দলের কাউন্সিলর ও স্থানীয় নেতারা। অথচ রাজ্যের এই চরম সংকটের সময়েও মমতা অবস্থান করছেন দিল্লিতে। কিন্তু কেন?
Manual4 Ad Code
মমতা বন্দোপাধ্যায় এবং তার ভাইপো তথা তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দোপাধ্যায় দিল্লিতে বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’-র বৈঠকে যোগ দিয়েছেন। অথচ অতীতে মমতা খুব কম সময়ই এই জোটের বৈঠকে সশরীরে উপস্থিত থেকেছেন; বেশিরভাগ সময় তিনি অভিষেক বা ডেরেক ওব্রায়েনকে পাঠাতেন। ২৯টি লোকসভা এবং ১২টি রাজ্যসভা আসন নিয়ে সংসদের তৃতীয় বৃহত্তম বিরোধী দল হওয়া সত্ত্বেও তৃণমূল এতদিন কেন্দ্রে বিজেপি-বিরোধী লড়াইয়ে নিজস্ব কৌশল বজায় রেখে আসছিল। কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন জোটের সঙ্গে মমতার সমীকরণ বরাবরই ছিল অম্লমধুর। তাহলে হুট করে এই অভূতপূর্ব সৌহার্দ্যের কারণ কী?
মঙ্গলবার (৯ জুন) সোনিয়া গান্ধীর সঙ্গে মমতার একান্ত বৈঠক হয়েছে, যা গত কয়েক বছরের মধ্যে প্রথম। জানা গেছে, তাদের আলোচনার মূল বিষয়বস্তু ছিল ‘তৃণমূলের ভবিষ্যৎ এবং জোটের রাজনীতি’। এরপর বুধবার (১০ জুন) রাহুল গান্ধীর সঙ্গে দীর্ঘ দেড় ঘণ্টা বৈঠক করেন অভিষেক বন্দোপাধ্যায়। বুধবার রাতেই মমতার আবারও সোনিয়ার সঙ্গে বৈঠক করার কথা রয়েছে। এই পর পর রুদ্ধদ্বার বৈঠকগুলো আসলে কীসের ইঙ্গিত দিচ্ছে?
পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতার হাতবদল ও দলের ভেতরে বিদ্রোহ
টানা ১৫ বছর পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মমতা। এই দীর্ঘ সময়ে রাজ্যে তৃণমূলের শাসন ছিল প্রশ্নাতীত ও নিশ্ছিদ্র। কিন্তু গত ৪ মে নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পর সবকিছু এক ঝটকায় বদলে গেছে।
পশ্চিমবঙ্গে এবার আছড়ে পড়েছে প্রবল ‘বিজেপি ঝড়’। এক দশক ধরে চলা তৃণমূলের অপশাসনের বিরুদ্ধে এটি ছিল জনগণের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। ফলে ২৯৪ আসনের রাজ্য বিধানসভায় তৃণমূল মাত্র ৮০টি আসনে সংকুচিত হয়ে পড়েছে।
এই বিপর্যয় সামনে আসতেই দলের নেতৃত্ব, বিশেষ করে অভিষেকের বিরুদ্ধে তীব্র অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ শুরু হয়। শতাধিক কাউন্সিলর পদত্যাগ করেছেন। ঋতব্রত বন্দোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে ৬০ জনেরও বেশি বিধায়ক মমতার ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা হয়েছেন।
অন্যদিকে কাকলী ঘোষ দস্তিদার দাবি করেছেন যে, তৃণমূলের ২৮ জন সংসদ সদস্যের মধ্যে ২০ জনেরও বেশি তাদের শিবিরে রয়েছেন এবং তারা বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোটকে সমর্থন দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
নির্বাচনী ফলাফলের মাত্র এক মাসের মধ্যে দলটির ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছেন এর প্রতিষ্ঠাতা মমতা বন্দোপাধ্যায়। তিনি কলকাতা হাইকোর্টে আইনি লড়াই শুরু করলেও শিবসেনা এবং এনসিপি ভাঙনের সাম্প্রতিক নজিরগুলো থেকে তিনি ভালো করেই জানেন যে, আইনি পথে দল বাঁচানোর সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। কারণ বিদ্রোহী বিধায়ক ও সংসদ সদস্যদের সংখ্যা দলত্যাগ বিরোধী আইনকে অনায়াসেই অকার্যকর করে দিতে পারে।
এদিকে তৃণমূলের এই কংগ্রেস-সংযুক্তির জল্পনায় জল ঢেলে দিয়েছেন বিদ্রোহী শিবিরের নেতা তথা বিধানসভার বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দোপাধ্যায়। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, তাদের ৬৪ জন বিধায়ক এবং ২০ জন সংসদ সদস্য কংগ্রেসের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার এই পদক্ষেপকে কোনোভাবেই সমর্থন করবেন না।
ঋতব্রত বলেন, ‘আমাদের বিধায়করা কংগ্রেসে যোগ দেবেন না। ২০ জন সংসদ সদস্যও এর বাইরে। তাহলে দলটা একীভূত করছে কারা? কংগ্রেসের সঙ্গে এই ধরনের কোনো সংযুক্তির প্রশ্নই ওঠে না।’
এই পরিস্থিতিতে মমতার প্রাপ্তি কী?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নিজের তৈরি তিন দশকের পুরনো দলটিকে বিদ্রোহীদের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য মমতার সামনে এখন সেরা বিকল্প হলো কংগ্রেসের সঙ্গে মিশে যাওয়া। এতে করে একদিকে যেমন তিনি জাতীয় রাজনীতিতে নিজের ভূমিকা ধরে রাখতে পারবেন, অন্যদিকে দলছুট হওয়ার হাত থেকে রক্ষা পাবেন তার রাজনৈতিক উত্তরসূরি অভিষেক বন্দোপাধ্যায়।
নয়াদিল্লির প্রবীণ সাংবাদিকদের সূত্র অনুযায়ী, কংগ্রেসের পক্ষ থেকে সোনিয়া গান্ধী মমতাকে দুটি নির্দিষ্ট প্রস্তাব দিয়েছেন। একটি হলো মমতা বন্দোপাধ্যায়কে কংগ্রেসের জাতীয় সহ-সভাপতি করা হবে। অপরটি হলো অভিষেক বন্দোপাধ্যায়কে দেওয়া হবে কংগ্রেসের জাতীয় সাধারণ সম্পাদক-এর পদ।
এর বিপরীতে অভিষেকের পক্ষ থেকেও কিছু প্রস্তাব রাখা হয়েছে, যার মধ্যে অন্যতম হলো মমতাকে রাজ্যসভায় পাঠানো এবং মল্লিকার্জুন খাড়গের পরিবর্তে তাকে উচ্চকক্ষের বিরোধী দলনেতা হিসেবে ঘোষণা করা।
Manual2 Ad Code
সঞ্জয় রাউত বা রাজদীপ সরদেশাইয়ের মতো প্রবীণ রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাংবাদিকরা মনে করছেন, কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে আসা আঞ্চলিক দলগুলোর (যেমন তৃণমূল বা এনসিপি) এখন আবার মূল দল বা ‘মাদারশিপ’-এ ফিরে আসাই বিজেপির আধিপত্য ঠেকানোর একমাত্র উপায়।
Manual8 Ad Code
তবে আজীবন লড়াকু বা ‘স্ট্রিটফাইটার’ হিসেবে পরিচিত মমতা বন্দোপাধ্যায়ের পক্ষে নিজের দলটির স্বতন্ত্র অস্তিত্ব বিসর্জন দেওয়া মোটেও সহজ নয়। তিনি এখন এক চরম শাঁখের করাতের মুখোমুখি। নিজের রাজনৈতিক অস্তিত্ব এবং পরিবারের ভবিষ্যৎ টিকিয়ে রাখতে শেষ পর্যন্ত তিনি এই চুক্তিতে সই করবেন কিনা—তা আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই পরিষ্কার হয়ে যাবে।