মা’-মাত্র একটি শব্দ। তবু এই একটি শব্দেই লুকিয়ে থাকে পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়, নিঃস্বার্থ ভালোবাসা আর অশেষ আত্মত্যাগের গল্প।
আজ রোববার (১০ মে) সেই মাকে সম্মান জানিয়ে সারাবিশ্বে পালিত হচ্ছে ‘বিশ্ব মা দিবস’।
Manual7 Ad Code
মা দিবস প্রতিবছর মে মাসের দ্বিতীয় রোববার পালিত হয়। সন্তানের জন্য নিঃস্বার্থ ভালোবাসার প্রতীক হিসেবে এই দিনটি উৎসর্গ করা হয় মায়েদের প্রতি।
একজন মানুষ জীবনে কত সম্পর্কই না গড়ে তোলে। বন্ধু আসে, প্রিয়জন আসে, সময়ের সঙ্গে অনেক মানুষ বদলে যায়। কিন্তু একটি সম্পর্ক কখনো বদলায় না সেটি মা। পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ ছায়া, সবচেয়ে নির্ভরতার নাম, সবচেয়ে নিঃস্বার্থ ভালোবাসার আরেক নাম মা।
আজ বিশ্ব মা দিবস। মে মাসের দ্বিতীয় রোববার বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশেও নানা আয়োজনে পালিত হয় দিনটি। তবে দিনটি কেবল ফুল, শুভেচ্ছা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি পোস্ট করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এই দিন যেন প্রতিটি মানুষকে আবার মনে করিয়ে দেয় জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তিটা এখনও মায়ের দোয়া আর ভালোবাসা।
একজন মা কখনো নিজের জন্য বাঁচেন না। সন্তান জন্মের পর থেকেই তার পৃথিবী বদলে যায়। নিজের ইচ্ছা, স্বপ্ন, ঘুম, ক্লান্তি সবকিছু আড়ালে রেখে তিনি সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। সন্তান ভালো থাকলেই যেন মায়ের পৃথিবী ভালো থাকে।
একটি শিশু পৃথিবীতে আসার আগেই একজন মা তার জন্য কষ্ট সহ্য করতে শুরু করেন। দীর্ঘ দশ মাসের যন্ত্রণা, অনিশ্চয়তা আর হাজারো ভয় পেরিয়ে তিনি সন্তানকে পৃথিবীর আলো দেখান। তারপর শুরু হয় আরেক যুদ্ধ সন্তানকে মানুষ করার যুদ্ধ। সেই যুদ্ধের কোনো ছুটি নেই, নেই কোনো অবসর।
গ্রামের কাঁচা উঠানে বসে সন্তানের জন্য খাবার রান্না করা মা কিংবা শহরের ব্যস্ত অফিস শেষে ক্লান্ত শরীরে সন্তানকে পড়াতে বসা মা–প্রত্যেক মায়ের গল্প আলাদা হলেও ভালোবাসা একই। তারা কখনো নিজেদের ক্লান্তির কথা বলেন না। সন্তান হাসলে তারা হাসেন, সন্তান কাঁদলে তাদের বুক ভেঙে যায়।
বর্তমান ব্যস্ত সময়ে অনেক সন্তানই হয়তো মায়ের সঙ্গে ঠিকমতো কথা বলার সময় পান না। একই ঘরে থেকেও দূরত্ব তৈরি হচ্ছে। প্রযুক্তির এই যুগে সম্পর্কগুলো অনেক সময় কৃত্রিম হয়ে উঠলেও মায়ের অনুভূতি কখনো কৃত্রিম হয় না। সন্তান রাতে খেয়েছে কি না, ঠিকমতো ঘুমিয়েছে কি না এই চিন্তাই একজন মায়ের প্রতিদিনের বাস্তবতা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি শিশুর প্রথম শিক্ষা শুরু হয় মায়ের কাছ থেকে। ভাষা শেখা, আচরণ শেখা, মানবিকতা শেখা সবকিছুর ভিত্তি গড়ে ওঠে মায়ের হাত ধরে। তাই সমাজ গঠনে একজন মায়ের ভূমিকা সবচেয়ে গভীর।
ধর্মীয়ভাবেও মায়ের মর্যাদা সর্বোচ্চ স্থানে। ইসলামে মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের জান্নাত বলা হয়েছে। কারণ একজন মা তার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময়গুলো সন্তানদের জন্য উৎসর্গ করেন। বিনিময়ে তিনি খুব বেশি কিছু চান না শুধু একটু সম্মান, একটু সময় আর একটু ভালোবাসা।
আজ মা দিবসে হয়তো কেউ মায়ের জন্য শাড়ি কিনবেন, কেউ ফুল দেবেন, কেউ দূরে থেকেও ফোন করে বলবেন “মা, ভালো আছো তো?”—কিন্তু সবচেয়ে বড় উপহার হতে পারে মায়ের পাশে কিছুটা সময় বসা। কারণ বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মায়েরা সবচেয়ে বেশি যেটা চান, তা হলো সন্তানের সান্নিধ্য।
যাদের মা এখনও বেঁচে আছেন, তারা পৃথিবীর সবচেয়ে সৌভাগ্যবান মানুষদের একজন। আর যাদের মা নেই, তাদের কাছে “মা দিবস” মানেই কিছু পুরোনো স্মৃতি, কিছু চেপে রাখা কান্না আর বুকভরা শূন্যতা।
Manual8 Ad Code
মা আসলে কোনো দিবসের মধ্যে সীমাবদ্ধ নন। তিনি প্রতিদিনের প্রার্থনা, প্রতিটি বিপদের সাহস, প্রতিটি সাফল্যের নীরব কারিগর। পৃথিবী বদলাবে, সময় বদলাবে, মানুষ বদলাবে কিন্তু মায়ের ভালোবাসা কখনো বদলাবে না।
আজ তাই শুধু নিজের মায়ের কথা নয়, পৃথিবীর প্রতিটি মায়ের জন্য কামনা করি—তারা যেন থাকেন সুখী, সুস্থ ও সম্মানিত।
প্রাচীন গ্রিসে বিশ্ব মা দিবসের পালন করা হলেও আধুনিককালে এর প্রবর্তন করেন এক মার্কিন নারী। ১৯০৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের আনা জারভিস নামের নারী মারা গেলে তার মেয়ে আনা মারিয়া রিভস জারভিস মায়ের কাজকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য সচেষ্ট হন।
ওই বছর তিনি তার সান ডে স্কুলে প্রথম এ দিনটি মাতৃদিবস হিসেবে পালন করেন। ১৯০৭ সালের এক রোববার আনা মারিয়া স্কুলের বক্তব্যে মায়ের জন্য একটি দিবসের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করেন।
Manual3 Ad Code
১৯১৪ সালের ৮ মে মার্কিন কংগ্রেস মে মাসের দ্বিতীয় রোববারকে ‘মা’ দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। এভাবেই শুরু হয় মা দিবসের যাত্রা। এরই ধারাবাহিকতায় আমেরিকার পাশাপাশি মা দিবস এখন বাংলাদেশসহ অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল, কানাডা, চীন, রাশিয়া ও জার্মানসহ শতাধিক দেশে মর্যাদার সঙ্গে দিবসটি পালিত হচ্ছে।