মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে উপদেষ্টা, সরকারের আকার বাড়লে ঝুঁকি আছে?
মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে উপদেষ্টা, সরকারের আকার বাড়লে ঝুঁকি আছে?
editor
প্রকাশিত আগস্ট ২৩, ২০২৬, ১১:১৮ অপরাহ্ণ
Manual4 Ad Code
বিবিসি বাংলা
সরকার গঠনের ছয় মাসের মাথায় মন্ত্রিসভার আকার আরও বড় করলো তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার। শুক্রবার রাষ্ট্রপতি হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের শপথের দিন নতুন করে মন্ত্রিসভায় যুক্ত হয়েছে আরও পাঁচ জন নতুন সদস্য।
Manual1 Ad Code
নতুন সদস্য যুক্ত হওয়ার পর বর্তমানে সরকারের মন্ত্রিসভার আকার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫১ জনে। এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রী ছাড়া পূর্ণ মন্ত্রী রয়েছেন ২৬ জন ও প্রতিমন্ত্রী ২৪ জন।
এছাড়াও মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হিসেবে রয়েছেন ১০ জন। আর প্রতিমন্ত্রী ও সচিব পদমর্যাদায় বিশেষ সহকারী হিসেবে রয়েছে আরও সাতজন।
এর আগে গত ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পর ছোট আকারের সরকার গঠনের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল। তবে ছয় মাস পরে সরকারের আকার আরও বেড়েছে।
গত ২২ অগাস্ট সর্বশেষ মন্ত্রিসভায় রদবদলের পর দেখা গেছে, বড় বড় কোনো মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন একজন মাত্র মন্ত্রী। আবার কোনো কোনো ছোট মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ছাড়াও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টারাও রয়েছেন দায়িত্বে।
যে কারণে নতুন করে রদবদলের পর মন্ত্রিসভার সমন্বয় ও ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা নিয়ে প্রশ্নও উঠেছে।
রাজনীতি ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা, এই বিষয়টিকে ‘জিগসো পাজল’ বা জটিল সমন্বয় চ্যালেঞ্জ হিসেবেই ব্যাখ্যা করছেন। যদিও বর্তমান বিএনপি সরকার তা মনে করছে না।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, প্রশাসনের কাজের গতিশীলতা বাড়াতেই মন্ত্রিসভার আকার বাড়ানো হয়েছে।
তবে বাংলাদেশে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর এটিই সবচেয়ে বড় মন্ত্রিসভা নয়। এর আগে ২০১৪-২০১৮ পর্যন্ত ৬১ মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ছিলেন শেখ হাসিনার দ্বিতীয় মেয়াদের মন্ত্রিসভায়। ২০০১-২০০৬ মেয়াদে খালেদা জিয়ার মন্ত্রিসভার আকারও ছিল এর চেয়ে বড়।
রদবদলের পর বর্তমানে তারেক রহমানের ৫১ সদস্যের মন্ত্রিসভায় প্রধানমন্ত্রী বাদে পূর্ণ মন্ত্রী রয়েছে ২৬ জন। আর প্রতিমন্ত্রী রয়েছেন ২৪ জন।
এর বাইরে পূর্ণ মন্ত্রীর মর্যাদায় ছয়জন উপদেষ্টা এবং প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় উপদেষ্টা রয়েছেন চারজন।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস দীর্ঘদিন অসুস্থ অবস্থায় রয়েছেন। তবে তিনি আছেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা পদে।
Manual4 Ad Code
মন্ত্রী পদমর্যাদার উপদেষ্টাদের মধ্যে নজরুল ইসলাম খান কৃষি এবং রুহুল কবির রিজভী শিল্প মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে আছেন। রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর অর্থ ও পরিকল্পনা এবং ইসমাইল জবিউল্লাহ জনপ্রশাসনের দায়িত্বে রয়েছেন।
এর বাইরে তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে পূর্ণ মন্ত্রীর পদমর্যাদায় জহির উদ্দিন স্বপনকে করা হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টাও।
অন্যদিকে, প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর একেএম শাসছুল ইসলাম প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এবং সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের দায়িত্বে রয়েছেন। একই পদমর্যাদায় জাহেদ উর রহমান তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়, মাহদী আমিন শিক্ষা, প্রাথমিক-গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বেও রয়েছেন।
আর প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হিসেবে রেহান আসিফ আসাদ আছেন ডাক, টেলিযোগাযোগ, তথ্যপ্রযুক্তি ও বিজ্ঞান মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে।
Manual5 Ad Code
তথ্য মন্ত্রণালয়ের একজন পূর্ণ মন্ত্রী, একজন প্রতিমন্ত্রী ছাড়াও প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টা রয়েছেন। একই ভাবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একজন পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রীর বাইরে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে দুইজনকে।
প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে একজন পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রী, একজন প্রতিমন্ত্রীর বাইরেও একই পদমর্যাদায় একজন উপদেষ্টা রয়েছেন। মন্ত্রী/প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদার কোনো কোনো উপদেষ্টাকে আবার একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বও দেওয়া হয়েছে।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘একই মন্ত্রণালয়ে যখন মন্ত্রী প্রতিমন্ত্রী এবং উপদেষ্টা থাকেন তখন সমন্বয়হীনতার তৈরি হয় কিংবা জটিলতা আরও বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়’।
একদিকে, কোনো কোনো মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী কিংবা প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টারাও যখন রয়েছে; তার বিপরীতে বড় বড় কোনো মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব মাত্র একজন মন্ত্রীর হাতেও।
এই যেমন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দুইটি মন্ত্রণালয় স্বরাষ্ট্র ও আইন মন্ত্রণালয়। এই দুইটি মন্ত্রণালয় সামলাচ্ছেন দুইজন মন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ও মো. আসাদুজ্জামান। সেখানে নেই কোনো প্রতিমন্ত্রী কিংবা উপদেষ্টাও।
আবার সড়ক পরিবহণ, নৌ ও রেলপথ মন্ত্রণালয়ের মতো তিনটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন একজন মন্ত্রী ও দুইজন প্রতিমন্ত্রী। এসব মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে দেওয়া হয়নি কোনো উপদেষ্টাকে।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী কিংবা উপদেষ্টারা তো দায়িত্বে থাকতেই পারেন। এটা তো অসাংবিধানিক না। কাজের গতিশীলতা বাড়ানোর জন্যই এটা করা হয়েছে।’
বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ছয় মাসে বিদ্যুৎ, জ্বালানি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কিংবা দ্রব্যমূল্যসহ নানা সংকটের মুখোমুখি হতে হয়েছে বর্তমান সরকারকে।
বিশেষ করে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত, আইনশৃঙ্খলা, শিক্ষা কিংবা অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়েও এই কয়েকমাসে নানা বিতর্ক উঠেছে। এমন পরিস্থিতিতে মন্ত্রিসভায় রদবদল করা হলেও যে সব মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল সেগুলোতে কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি।
বরং যে সব মন্ত্রণালয় নিয়ে জনপরিসরে তেমন বড় কোনো সমালোচনা ছিল না এমন দুয়েকটি মন্ত্রণালয়ে রদবদল করা হয়েছে। এমন অবস্থায় মন্ত্রিসভার আকার বাড়ানো হলে তা সরকারের জন্য কতখানিক কাজে দেবে তা নিয়ে দুই ধরনের বক্তব্য পাওয়া গেছে বিশ্লেষকদের কাছ থেকে।
সাবেক সচিব আব্দুল আউয়াল মজুমদার মনে করেন, বর্তমান সরকারের মন্ত্রিসভার আকার কিছুটা বড় হলেও এতে আরও কাজে গতি বাড়বে। তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন পর বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে। আগের মন্ত্রিসভায় যারা ছিল তাদের অনেকেই অভিজ্ঞতা সম্পন্ন ছিল। এখন যারা আছেন তাদের অনেকেই নতুন দায়িত্বে এসেছে। সুতরাং কাজ ভাগাভাগি করে করার জন্য এই মন্ত্রিসভার আকারকে খুব একটা বড় বলা যাবে না’।
শুধু মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী কিংবা প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা না। বিভিন্ন বিবেচনায় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী কিংবা সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন অন্তত সাতজন। তাদের কেউ কেউ প্রতিমন্ত্রী আবার কেউ কেউ সচিব পদমর্যাদায় দায়িত্বও পালন করছেন।
সাবেক আমলা ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়া বলেন, ‘একটি মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রী প্রতিমন্ত্রী থাকার পর আবার উপদেষ্টার বা বিশেষ সহকারী কতখানি দরকার সেটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। রাজনৈতিক কারণে অনেক সময় হয়তো অনেককে দায়িত্ব দিতে হয়। তবে এক্ষেত্রে একজন অভিজ্ঞতা সম্পন্ন লোক হলে সমন্বয় নিয়ে যেমন সংকট হয় না তেমনি মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তগুলোও দ্রুত নেওয়া যায়’।
তার মতে, মাথা ভারি প্রশাসন কাজের গতি বাড়ানোর পরিবর্তে অনেক সংকট বাড়াতে পারে। যে কারণে বড় মন্ত্রণালয়ের ক্ষেত্রে মন্ত্রীর পাশাপাশি একজন প্রতিমন্ত্রী এবং ছোট মন্ত্রণালয়ের ক্ষেত্রে একজন মন্ত্রী থাকলে সেটি কাজের গতি আরও বাড়তো বলেও মনে করেন তিনি।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান অবশ্য এই অবস্থাকে ব্যাখ্যা করেছেন জিগসো পাজল বা বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে।
তিনি বলেন, ‘এখন যেভাবে সরকার কাঠামো তৈরি হলো, এখন এটিকে যদি একটি চিত্র হিসেবে ভাবা হয়, এটা একটা জিগসো পাজলের মতো। এই কাঠামো ম্যানেজ করা সরকারের জন্য নানামুখী চ্যালেঞ্জ বলেই আমি মনে করি’।