বিদ্যুতে অশনিসংকেত, এক বছরে বিপিডিবির লোকসান বেড়েছে ৯৪ শতাংশ
বিদ্যুতে অশনিসংকেত, এক বছরে বিপিডিবির লোকসান বেড়েছে ৯৪ শতাংশ
editor
প্রকাশিত জানুয়ারি ১৯, ২০২৬, ১২:০৫ অপরাহ্ণ
Manual2 Ad Code
অনলাইন ডেস্ক:
বড় ধরনের সংকট উঁকি দিচ্ছে দেশের বিদ্যুৎ খাতে। ২০২৪ সালের মাঝামাঝি ক্ষমতার পট পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে আসা অন্তর্বর্তী সরকার গত দেড় বছরে এই খাতে বেশ কয়েকটি উদ্যোগ নিলেও আশার আলো দেখাতে চরম ব্যর্থ হয়েছে সেগুলো। সরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন কমার বিপরীতে এই খাতে আরও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে বেসরকারি খাতের প্রভাব।
Manual5 Ad Code
ফলস্বরূপ, সদ্যসমাপ্ত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৭ হাজার ২১ কোটি টাকার লোকসান গুনেছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি), যা আগের অর্থবছরে (২০২৩-২৪) ছিল ৮ হাজার ৭৬৪ কোটি। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে বিদ্যুৎ খাতের একক এই ক্রেতাপ্রতিষ্ঠানের নিট লোকসান বেড়েছে ৯৪ শতাংশের বেশি।
চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগে দেশের বিদ্যুৎ খাতে বিপুল পরিমাণ দায়দেনা রেখে যায় আওয়ামী লীগ সরকার। তা কমাতে গত অর্থবছরে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা (আগের বকেয়া ২৭ হাজার ৪৩৯ কোটি টাকাসহ) ভর্তুকি দেয় অন্তর্বর্তী সরকার। বিদ্যুৎ খাতে ব্যয় সাশ্রয়, এ খাতের বিশেষ আইন বাতিল, সরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রে উৎপাদন বৃদ্ধি, ট্যারিফ নেগোসিয়েশনসহ বেশকিছু উদ্যোগ নেন অন্তর্বর্তী সরকারের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান। বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি ও উদ্যোগ গ্রহণের পরও বিদ্যুতের গড় উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণ খাতে গড় সিস্টেম লস তো কমেইনি; উল্টো নজিরবিহীনভাবে বেড়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদ্যুৎ খাত সংস্কারের নামে যেসব উদ্যোগের কথা বলা হচ্ছে, সেগুলো বাস্তবে এ খাতের আর্থিক ব্যয় কমানোর কার্যকর সংস্কার নয়। কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া এ খাতের আর্থিক সংকট নিরসন সম্ভব নয়। বরং বর্তমান ধারাবাহিকতায় লোকসান আরও বাড়বে এবং অতিরিক্ত সক্ষমতা যুক্ত করে ভবিষ্যতে খাতটিকে আরও বড় আর্থিক ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া হবে।
তাদের মতে, বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক ভারসাম্য ফেরাতে তাৎক্ষণিকভাবে কিছু কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি ছিল। এর মধ্যে রয়েছে অপ্রয়োজনীয় ও উচ্চ ব্যয়সম্পন্ন বিদ্যুৎ কেন্দ্র পুনর্মূল্যায়ন, ক্যাপাসিটি চার্জের বোঝা কমানো, দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি পুনঃআলোচনা এবং চাহিদাভিত্তিক উৎপাদন পরিকল্পনা নিশ্চিত করা। কিন্তু, তা করতে পারেনি অন্তর্বর্তী সরকার তথা বিদ্যুৎ বিভাগ।
দেশে বিদ্যুৎ সরবরাহে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিপিডিবি ১ লাখ ২১ হাজার ৪২০ কোটি টাকা ব্যয় করে। এর মধ্যে বিদ্যুৎ বিক্রি বাবদ আয় করে ৬৯ হাজার ৩৮৩ কোটি টাকা। ঘাটতি কমাতে ৩৮ হাজার ৬৩৬ কোটি টাকা ভর্তুকি দেয় অর্থ বিভাগ। এরপরও বিপিডিবির নিট লোকসান হয় ১৭ হাজার ২১ কোটি টাকা।
দেশের বিদ্যুৎ খাতে লোকসানের বড় কারণগুলোর মধ্যে বিদ্যুৎ ক্রয়-বিক্রয়ে ঘাটতি, চাহিদার চেয়ে বেশি সক্ষমতা তৈরি, কেন্দ্র বসিয়ে রেখে ক্যাপাসিটি চার্জ গোনা এবং সিস্টেম লস অন্যতম। অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার প্রক্রিয়ার অংশও ছিল এসবের কাঠামোগত পরিবর্তন এনে বিদ্যুৎ খাতকে লাভে নিয়ে আসা।
Manual3 Ad Code
দীর্ঘদিন ধরেই বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্র (আইপিপি) থেকে ব্যয়বহুল বিদ্যুৎ কেনার অভিযোগ রয়েছে। বিশেষত সরকারের নিজস্ব গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বসিয়ে রেখে আইপিপি থেকে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ কেনা হচ্ছে, যা বিপিডিবির আর্থিক ব্যয়কে আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে। সরকার বিদ্যুৎ খাত সংস্কারের অংশ হিসেবে ব্যয় কমানোর কথা বারবার বললেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন।
Manual2 Ad Code
তথ্য অনুযায়ী, অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সবচেয়ে বেশি ৭২ হাজার ৭১ কোটি টাকার বিদ্যুৎ কেনা হয়েছে আইপিপি থেকে; আগের অর্থবছরের চেয়ে যা ১৪ হাজার ৬৯৪ কোটি টাকা বেশি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আইপিপি থেকে বিদ্যুৎ কেনা হয় ৫৭ হাজার ৩৭৭ কোটি টাকার। অথচ সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে বেসরকারি খাত থেকে বিদ্যুৎ কেনার প্রাক্কলন ব্যয় কমিয়ে ধরা হয়েছিল ৪৩ হাজার ৯৮৭ কোটি টাকা।
বেসরকারি খাত থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কেনা হয় ১ লাখ ৩০৯ মিলিয়ন কিলোওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুৎ। প্রতি ইউনিটের দাম পড়েছে ১৪ টাকা ৪৫ পয়সা, যা তার আগের অর্থবছরের চেয়ে ইউনিটপ্রতি ১ টাকা ৪০ পয়সা বেশি। এর ফলে, বিদ্যুতের গড় উৎপাদন খরচও গত অর্থবছরে বেড়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিদ্যুতের গড় উৎপাদন খরচ হয় ১২ টাকা ১০ পয়সা, যা তার আগের অর্থবছরে ছিল ১১ টাকা ৩৫ পয়সা।
দেশের বিদ্যুৎ খাতে প্রতি বছর সঞ্চালন ও বিতরণ খাতে বিপুল পরিমাণ সিস্টেম লস হচ্ছে। এতেও বিদ্যুতের খরচ বাড়ছে। সংস্কার প্রক্রিয়ায় এ খাতের অন্যতম লক্ষ ছিল বিদ্যুতের সিস্টেম লস আদর্শ মানে নামিয়ে আনা। তবে ভিন্নভাবে সঞ্চালন ও বিতরণে সিস্টেম লস কমানোর কথা বলা হলেও সামগ্রিকভাবে বিদ্যুতের গড় সিস্টেম লস বেড়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সিস্টেম লস ছিল ১০ দশমিক ৬ শতাংশ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১০ দশমিক ১৩ শতাংশ। যদিও বিদ্যুৎ খাতের বৈশ্বিক আদর্শ সিস্টেম লস ধরা হয় ৮ শতাংশ।
দেশের বিদ্যুৎ খাতে আর্থিক ক্ষতি কমাতে ক্রমান্বয়ে ভর্তুকি থেকে বেরিয়ে আসার কথা বলেছে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার। তবে সরকারের বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির বিষয়ে বিপিডিবি ও বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্যে রয়েছে বড় ধরনের পার্থক্য। বিপিডিবির তথ্যে দেখা গেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিদ্যুতে ভর্তুকি দেওয়া হয় ৩৮ হাজার ৬৩৬ কোটি টাকা। বিদ্যুৎ বিভাগের আরেক নথি থেকে যদিও জানা যায়, গত অর্থবছরে বিদ্যুতে ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে ৫৯ হাজার ৬০০ কোটি টাকা।
Manual7 Ad Code
বিদ্যুৎ খাতে অন্তর্বর্তী সরকার ভর্তুকি বাড়িয়ে এ খাতের দায়দেনা কমিয়ে আনার কথা বলছে। গত বছরের হিসাব অনুযায়ী, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ৩ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার (৩৯ হাজার কোটি টাকা) বকেয়া পরিশোধ করেছে সরকার; যার মধ্যে রয়েছে আদানির বিপুল পরিমাণ বকেয়া। যদিও এরই মধ্যে সরকার বেসরকারি বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলোর কাছে প্রায় ২৭ হাজার কোটি টাকা বকেয়া বাড়িয়েছে। গ্রীষ্মে লোডশেডিং কমাতে অবশ্য ২০ হাজার কোটি টাকা বকেয়া পরিশোধের কথাও জানিয়েছে সরকার।
আন্তর্জাতিক বাজার থেকে জ্বালানি তেল ও গ্যাস কিনে বিদ্যুৎ কেন্দ্রে সরবরাহ করে বিপিডিবি। বিগত তিন বছরের মধ্যে বিশ্ববাজারে জ্বালানি পণ্যের দাম এখন সর্বনিম্ন। এর মধ্যে ব্যারেলপ্রতি জ্বালানি তেলের দাম ৬০ ডলারে নেমে এসেছে। অন্যদিকে গ্যাসের দামও গত দেড় বছরে প্রতি এমএমবিটিইউ (মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট) ওঠানামা করছে ১০-১২ ডলারে। এরপরও বিপিডিবির বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ কেন বাড়ছে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট করে বলতে পারেননি সংস্থাটির কর্মকর্তারা।
এ বিষয়ে জানতে বিপিডিবির ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনে সবচেয়ে ব্যয় বেশি হয় জ্বালানি তেলভিত্তিক ও বেসরকারি কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কিনলে। জ্বালানি তেলে উৎপাদন খরচ যেমন বেশি, তেমনি ক্যাপাসিটি চার্জও রয়েছে। গ্যাস সংকটের কারণে বিপিডিবি তার নিজস্ব বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বড় অংশ চালাতে পারে না। তখন বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর ওপর নির্ভর করতে হয়। যে কারণে খরচ বাড়ে।
বিদ্যুৎ খাতের ক্রমবর্ধমান লোকসান সরকারকে বাড়তি ভর্তুকির চাপের মুখে ফেলছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, টেকসই সমাধানের জন্য বিদ্যুৎ উৎপাদন কাঠামো, চুক্তি ব্যবস্থাপনা এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত সংস্কারে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।