বরিশালের আদালতে ভাঙচুরের পর আইনজীবীদের সভাপতি গ্রেফতারসহ যা ঘটেছে
বরিশালের আদালতে ভাঙচুরের পর আইনজীবীদের সভাপতি গ্রেফতারসহ যা ঘটেছে
editor
প্রকাশিত ফেব্রুয়ারি ২৫, ২০২৬, ০৪:৫৪ অপরাহ্ণ
Manual5 Ad Code
অনলাইন ডেস্ক:
Manual8 Ad Code
বিচারকের উপস্থিতিতেই আদালতে হট্টগোল। এজলাস কক্ষে প্রবেশ করে টেবিল চেয়ার ফেলে দিয়ে রায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান। ঘটনাস্থলে উপস্থিত অন্য আইনজীবী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের হুমকি-ধামকি।
বরিশালের অতিরিক্ত মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে (২৪ ফেব্রুয়ারী) মঙ্গলবারের ঘটনা। সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একাধিক ভিডিওতে দেখা যায়, বিচার কার্যক্রম চলা অবস্থায় কয়েকজন আইনজীবী উত্তেজিত অবস্থায় আদালত কক্ষে ঢুকে বিচারকের দিকে আঙুল তুলে নানা কথা বলছেন।
একপর্যায়ে আদালতে থাকা অন্য আইনজীবীদের বের করে দেওয়ার পাশাপাশি ওই কক্ষে থাকা চেয়ার-টেবিলগুলো ভাঙচুর করতে শুরু করেন তারা।
Manual6 Ad Code
এসময় আদালত কক্ষে উপস্থিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদেরও চিৎকার করে ধমকাতে শোনা যায় ওই আইনজীবীদের।
আদালত কক্ষের এই ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর এ নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়।
সমালোচনার মুখে এই ঘটনায় জড়িত জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতিকে বুধবার দুপুরে গ্রেফতার করে পুলিশ। ওই ঘটনায় ১২ জনের নাম উল্লেখ করে আর ১৫ থেকে ২০ জন অজ্ঞাতনামাকে আসামি করে ভাঙচুরের অভিযোগে একটি মামলা হয়েছে।
যদিও জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতিকে গ্রেফতারের এই ঘটনা ঘিরে বুধবারও উত্তেজনা বিরাজ করছে বরিশালের জেলা জজ আদালতে। বিএনপিপন্থি ওই আইনজীবীর মুক্তির দাবিতে আদালত বর্জন করে বিক্ষোভ করছেন আইনজীবীদের একটি অংশ।
এদিকে আদালত অবমাননার ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও এই ঘটনাকে ভবিষ্যতের জন্য দৃষ্টান্ত হিসেবেই দেখছেন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, দলীয় রাজনীতির প্রভাব বিদ্যমান রেখে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সম্ভব নয়।
আদালতের এজলাসে বিচারকের সামনেই যদি এমন পরিস্থিতি তৈরি হয় তাহলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রক্ষা করা সম্ভব কিনা এমন প্রশ্নও উঠেছে।
অতীতের কয়েকটি ঘটনার উল্লেখ করে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবীরা বলছেন, আদালত অবমাননার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বরিশালের এই ঘটনা। এর বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে সরকার বিচার বিভাগের স্বাধীনতার যে প্রতিশ্রতি দিয়েছে সেটি নিয়েও সন্দেহ তৈরি হবে।
এছাড়া ‘আদালতে মব’ করে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রক্ষা করা যাবে কিনা এমন প্রশ্নও তুলেছেন তারা।
বরিশালে বিচারকের উপস্থিতিতেই আদালতে হট্টগোল করেন কয়েকজন আইনজীবী
কী ঘটেছিল আদালতে?
কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতাকে জামিন দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে কয়েকদিন ধরেই উত্তপ্ত বরিশালের আইন অঙ্গন।
জেলা আইনজীবী সমিতির ডাকে মঙ্গলবার আদালত বর্জনের কর্মসূচি চলছিল বলেও জানা গেছে।
Manual8 Ad Code
এদিন বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য তালুকদার মো. ইউনুসকে জামিন দেওয়া হলে ক্ষুব্ধ আইনজীবীরা আদালতের এজলাসে ঢুকে বিচারকের উপস্থিতিতেই বিশৃঙ্খলা তৈরি করেন।
সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া এক মিনিট ছয় সেকেন্ড এবং সাড়ে চার মিনিটের দুইটি পৃথক ভিডিওতে দেখা যায়, বিচার কার্যক্রম চলা অবস্থায় কয়েকজন আইনজীবী উত্তেজিত অবস্থায় আদালত কক্ষে ঢুকে বিচারকের দিকে আঙুল তুলে নানা কথা বলছেন।
এসময় একটি মামলার শুনানি করছিলেন অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট এস এম শরীয়তউল্লাহ। কোর্ট রেজিস্ট্রার ও কোর্ট পুলিশের তিনজন সদস্যও ওই কক্ষে উপস্থিত ছিলেন।
Manual4 Ad Code
একপর্যায়ে আদালতে থাকা অন্য আইনজীবীদের বের করে দেওয়ার পাশাপাশি কক্ষে থাকা চেয়ার-টেবিলগুলো উল্টে ফেলতে শুরু করেন বিক্ষুব্ধরা।
আদালত কক্ষে উপস্থিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদেরও চিৎকার করে ধমকাতেও শোনা যায় ওই আইনজীবীদের।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, যে আইনজীবীরা এজলাসে এই ঘটনা ঘটিয়েছেন তারা জেলা আইনজীবী সমিতির বিএনপিপন্থী নেতা হিসেবে পরিচিত।
ভিডিওর একদম সামনে যাকে দেখা গেছে তিনি আইনজীবী সমিতির সভাপতি সাদিকুর রহমান লিংকন।
বুধবার দুপুরে পুলিশের হাতে গ্রেফতার হওয়ার আগে বিবিসি বাংলার কথা হয় এই আইনজীবীর সঙ্গে।
তিনি অভিযোগ করেন, অর্থের বিনিময়ে জামিন অযোগ্য মামলায় আওয়ামী লীগ নেতা তালুকদার মো. ইউনুসকে জামিন দেওয়া হয়েছে।
এর আগেও আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতাকে এভাবে জামিন দেওয়া হয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, ক্ষোভ থেকেই এমন ঘটনা ঘটিয়েছেন তারা।
বিবিসি বাংলাকে তিনি জানান, “যে সকল মামলায় মহামান্য হাইকোর্ট জামিন দেয় নাই, মহানগর দায়রা জজ জামিন দেয় নাই, সেই সকল মামলাগুলোতেও ম্যাজিস্ট্রেট আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের জামিন বিবেচনা করছিলেন, আমরা তাদেরকে নিষেধ করলেও শোনে নাই।”
আদালতে বিশৃঙ্খলা না করে আইনের মাধ্যমে সমাধান করা যেত কিনা এমন প্রশ্নে জবাবে মি. লিংকন বলেন, আগে থেকেই নানা কর্মসূচির মাধ্যমে বিচার কার্যক্রম স্থগিত রাখার অনুরোধ করা হলেও আদালত এটি শোনেনি।
“আমরা আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে চাই, এটা ঠিক আছে কিন্তু টাকার বিনিময়ে আইন কেনা-বেচা হোক এটা আমরা চাই না,” বলেন তিনি।
আদালতে উপস্থিত অন্য আইনজীবীকেও হুমকি দিতে দেখা যায়
এই অপরাধের শাস্তি কী?
বরিশালে আদালতের এজলাসে আইনজীবীদের এমন বিশৃঙ্খল আচরণে ক্ষোভ জানিয়েছেন অন্য আইনজীবী ও বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, এমন আচরণ বিচার বিভাগের স্বাধীনতার পরিপন্থি।
আদালত কোনো মামলার রায় দিলে কিংবা কাউকে জামিন দিলে সেখানে পরবর্তী আইনি লড়াইয়ের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু আইনের তোয়াক্কা না করে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি গ্রহণযোগ্য নয় বলেই মনে করেন আইনজীবীরা।
ঢাকা জজ কোর্টের আইনজীবী কামরুল আহসান বিবিসি বাংলাকে বলেন, আদালতে রাষ্ট্রপক্ষ রয়েছে, তারা যদি মনে করে সঠিক বিচার হয়নি তাহলে আপিলের সুযোগ রয়েছে। ধাপে ধাপে বিচার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
এই আইনজীবী জানান, “কোনো অর্ডারে কেউ যদি অ্যাগ্রিভড হন সেক্ষেত্রে ম্যাজিস্ট্রেট, জেলা জজ, হাইকোর্ট, সুপ্রিম কোর্ট প্রতিটি ধাপে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ আছে। কিন্তু আপনি জজ সাহেবের ওপরই যদি হামলা করে বসেন তাহলে তো বিচার বিভাগই থাকে না।”
আইনজীবীরা অভিযোগ করেছেন, কিছু স্বার্থান্বেষী অতি রাজনৈতিক আইনজীবী এই পেশাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। অনেকেই রাজনৈতিক সিড়ি হিসেবেও এই পেশার ব্যবহার করছেন বলেও দাবি তাদের।
“দলে বড় পদ পাওয়ার জন্য, সিড়ি হিসেবে আইন পেশাকে ব্যবহার করছেন। অতীতেও বিচার বিভাগের ওপর এভাবে হস্তক্ষেপ করা হয়েছে,” বিবিসি বাংলাকে বলেন মি. আহসান।
বরিশালের আদালতে হওয়া ঘটনাকে ন্যাক্কারজনক উল্লেখ করে এমন ঘটনা বন্ধে সরকারকে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরশেদের।
তিনি বলছেন, আদালতের কার্যক্রমে হস্তক্ষেপের জন্য এমন ঘটনায় একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার মামলা হতে পারে।
এছাড়া এই ঘটনায় যদি কেউ আহত হয়ে থাকেন সেক্ষেত্রে ক্রিমিনাল অফেন্সের অভিযোগে মামলা হতে পারে বলেও জানান তিনি।
অধিনস্ত আদালতের এমন ঘটনায় অতীতেও সুয়োমুটো জারি করেছে সুপ্রিম কোর্ট। তবে রাজনৈতিক সদিচ্ছা এক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলেই মনে করেন এই আইনজীবী।
“গত ১৮ মাস মব ভায়োলেন্সের কারণে আদালত সঠিকভাবে কাজ করতে পারেনি। অতীতেও আদালতের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এই সরকারের আমলে কি হবে সেটার জন্য আমরা অপেক্ষা করছিলাম,” বলেন মি. মোরশেদ।
যদি বিএনপি মনে করে যে তারা রুল অব ল চায় তাহলে প্রধানমন্ত্রী নিজেরই উচিৎ এই ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে একটি নির্দেশনা দেওয়া।
“এমনিতেই বহু আইনজীবী আসতে পারেন না আদালতে। যাতে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত হচ্ছে না। এর মধ্যে যদি নির্বাচনের পরে মানুষ যখন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা দেখতে উন্মুখ হয়ে আছে তখন এই সমস্ত কর্মকাণ্ড গ্রহণযোগ্য নয়,” বলেও মন্তব্য করেন মি. মোরশেদ।