কর্ণেল অলি; আমি বিদ্রোহ না করলে কিন্তু বিদ্রোহ হতো না, কারণ মেজর জিয়া অনুপস্থিত ছিলেন
কর্ণেল অলি; আমি বিদ্রোহ না করলে কিন্তু বিদ্রোহ হতো না, কারণ মেজর জিয়া অনুপস্থিত ছিলেন
editor
প্রকাশিত মার্চ ২৬, ২০২৬, ১২:২৭ পূর্বাহ্ণ
Manual6 Ad Code
অনলাইন ডেস্ক:
জামায়াত আমিরের দেওয়া বক্তব্যে অনেকের জ্বলন শুরু হয়ে গিয়েছিল উল্লেখ করে কর্নেল অলি আহমেদ বলেছেন, জামায়াত আমির বলেছিলেন, “কর্নেল অলি বলেছিলেন ‘উই রিভল্ট‘। তার বক্তব্যের পর অনেকের গায়ে জ্বলন ধরেছিল। মেজর জিয়াউর রহমান তো নিজেই লিখেছেন এসিআরে (অ্যানুয়াল কনফিডেনসিয়াল রিপোর্ট) এই অফিসারই ১৯৭১ সালের ২৫ ও ২৬ মার্চ রাতে বিদ্রোহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।”
Manual4 Ad Code
কর্নেল অলি বলেন, ‘আমি বিদ্রোহ না করলে কিন্তু বিদ্রোহ হতো না। ওনি (মেজর জিয়া) তো ছিলেনই না। উনি তখন অনুপস্থিত ছিলেন। উনি চট্টগ্রাম বন্দরের দিকে যাচ্ছিলেন। ওনাকে যদি ফিরিয়ে না আনতাম, কয়েক মিনিট পর তো তাকে মেরে কর্ণফুলী নদীতে ফালায়া দিত।’
মহান স্বাধীনতা দিবস ও জাতীয় দিবস উপলক্ষ্যে বুধবার (২৫ মার্চ) বিকেলে জাতীয় প্রেসক্লাব মিলনায়তনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগর দক্ষিণের উদ্যোগে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় প্রধান আলোচকের বক্তব্যে একথা বলেন তিনি।
জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জামায়াতের নায়েবে আমির আব্দুস সবুর ফকিরের সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান।
Manual7 Ad Code
সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জামায়াত সেক্রেটারি মিয়া গোলাম পরওয়ার, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল সংসদ সদস্য মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান,মেজর (অব) আখতারুজ্জামান ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব) হাসিনুর রহমান।
প্রধান বক্তার বক্তব্যে লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ বীর বিক্রম বলেন, তৎকালীন মেজর শওকত চট্টগ্রাম বিগ্রেডের কমান্ডার। উনি আমাদের মধ্যে যুদ্ধের সময় তৃতীয় সিনিয়র ছিল। তিনি লিখেছেন- ‘এই অফিসারই জিয়াউর রহমানকে বলছেন স্বাধীনতা ঘোষণা করার জন্য।’ তাহলে তোমাদের গাত্রদাহ কেন হচ্ছে?
তিনি সমালোচকদের কড়া বার্তা দিয়ে পাল্টা সমালোচনা করে বলেন, ‘ডকুমেন্টগুলো তো আর্মি হেডকোয়ার্টারে আছে। একদম যদি ইংরেজি লেখাপড়া করতে না জানো তাহলে ঢাকা ইউনিভার্সিটি ইংলিশ প্রফেসরের কাছে নিয়ে যাও পড়ার জন্য। অসুবিধাটা কোথায়? আরও যদি ওখানেও অসুবিধা হয় তাহলে আমার ঘরে আসো। আমি তো অরিজিনাল এসিআর’টা তো রাইখা দিছি। আমি তো ওই রকম বোকা লোক না। আমি যখন চাকরি ছেড়েছি, অরিজিনাল এসিআরগুলো তখন সঙ্গে নিয়ে এসেছি। আমার ঘরে আসো, বিনে পয়সায় দেখিয়ে দেব। সুতরাং আমিরকে (জামায়াত আমির) টিটকারি না মেরে এটা গ্রহণ করো। সত্যকে গ্রহণ করা মানুষের কাজ। এটা অস্বীকার করে বেশিদিন টিকতে পারবে না।’
তিনি বলেন, সত্যিকার অর্থে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার জন্য প্রথম যে ব্যক্তিটি চিন্তা করেছিলেন তিনি হলেন লে. কর্নেল এম আর চৌধুরী(মজিবর রহমান চৌধুরী)। ওনার আমি খুব ঘনিষ্ঠ লোক ছিলাম। তিনি ছিলেন ফোর্থ রেজিমেন্টের অধিনায়ক। বদলি হয়ে আসেন চট্টগ্রামে। আমি ছিলাম ষোল শহরে। ওনি ডেকে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে নিয়ে গেলেন। ওনি সরাসরি বললেন, বাংলাদেশের এই অবস্থা কি করা দরকার। আমি বললাম বিদ্রোহ করা দরকার, দেশ স্বাধীন করা দরকার। তিনি বললেন, এগ্রিড। তুমি তোমার প্রস্তুতি গ্রহণ করো। আমিও আমার প্রস্তুতি গ্রহণ করি। এর কয়েক দিন পর আমাকে জিয়াউর রহমান সাহেব তার বাসায় ডেকে পাঠালেন। প্রথম দিন আমি ওনার সঙ্গে আমি কথা বললাম না। কারণ ওনিও ছিলেন আইএসআই এর কর্মকর্তা। আমিও। সুতরাং আমি তাকে আগে থেকে চিনি না, জানি না। কোথায় কথা বলে কি বিপদে পড়ি। প্রথম দিন ওনার কথা শুনে চলে আসি। কয়েকদিন পর আবার ডাকলেন। আবার জিজ্ঞাসা করলেন। বললেন একটা কিছু তো করতেই হয়। আমিও বুঝি একটা কিছু করতে হবে। কি করণীয় বলেন। বললেন বিদ্রোহ করলে কেমন হয়। বললাম খুব ভালো হয়। বললেন, তোমার প্রয়োজন। কারণ তুমি ছাড়া তো রেজিমেন্টের সোলজাররা তো কারো কথা শুনবে না। আমরা তিনজন হলাম। বাকিরা জানে আংশিক। কেউ জানে দুই আনা, কেউ এক আনা, কেউ তিন আনা। পুরো গল্পটা আমি আর জিয়াউর রহমান ছাড়া আর কেউ জানেন না। এমআর চৌধুরীকে ২৫ মার্চ রাত ১০টার দিকে গাড়ীর পেছনে রশি দিয়ে বেঁধে টেনে-হ্যাচরিয়ে তাকে হত্যা করা হয়।
কর্নেল অলি বলেন, জিয়াউর রহমানকেও হত্যা করতো সেদিন। যদি পাঁচ মিনিট আগে ফেরায়া না আনতাম। আমি আনিনি। আল্লাহরই হুকুম। আমি মালিকের হুকুমটা পালন করেছি মাত্র।
তিনি আরও বলেন, “আমি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ফাস্ট ব্রিগেড মেজর। কতো বড় অন্যায় আর্মিতে হয় বোঝেন। জিয়াউর রহমান প্রথম ঘোষণা দিলেন, ‘আই ডিক্লেয়ার মাই সেল্ফ এজ এ প্রবেশন হেড অব দ্যা স্টেট, অ্যান্ড ইনডিপেনডেন্টস অব বাংলাদেশ।’ ২৭ তারিখ সন্ধ্যায়। কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রে ট্রান্সমিটিং স্টেশন ব্রডকাস্টিং ছিল না। সেটাকে রুপান্তর করে ব্রডকাস্টিং স্টেশনে আনলাম। ওটা থেকে তিনি ব্রডকাস্ট করেন। তিনি যখন রাষ্ট্রপতি তখন তার মন্ত্রিসভার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলাম। মেজর মীর শওকত ছিলেন পররাষ্ট্র মন্ত্রী। বাকি মন্ত্রী সভা আমরা পূরণ করিনি। কারণ সবার সঙ্গে দেখা করার পর সেটা পূরণ করবো। দ্বিতীয় এনাউন্সমেন্টটা যে কোনো কারণে কাজ হয়নি।”
Manual4 Ad Code
তিনি ৩০ তারিখ বলে দিলেন, আই ডিক্লেয়ার মাই সেল্ফ এজ কমান্ডার ইন চিফ অব লিবারেশন ফোর্সেস। এটা খালেদ মোশাররফ এবং শফিউল্লাহ সাহেব মেনে নিতে পারেননি। শফিউল্লাহ ছিলেন একই কোরের। কিন্তু জিয়া সাহেব ছিলেন সিনিয়র। তারা মেনে নিতে পারেননি বলে ষড়যন্ত্র শুরু করে দিলেন। সাপ্লাই কোর থেকে কখনো কেউ আর্মি চিফ হয় না, সেনা প্রধান হয় না। কিন্তু ওসমানী সাহেব একজন পলিটিশিয়ানকে নিয়ে সেটাই করলেন। কেন করলেন? মেজর জিয়াউর রহমানকে দমন করার জন্য। তিনটা ফোর্স খাড়া করা হলো। কে ফোর্স, জেড ফোর্স ও এস ফোর্স। এটা করে খালেদ মোশাররফ ও শফিউল্লাহ একই জায়গায় রয়ে গেলেন, জিয়াউর রহমানকে দেওয়া হলো মেঘালয়ের ‘তুরা’ নামক স্থানে। গভীর জঙ্গলের মধ্যে। যেন ওনি আর ফিরে আসতে না পারেন। ওনি আমার সঙ্গে ছাগলনাইয়ার বিওপিতে সাক্ষাৎ করেন, বিদায় নিতে। বললাম কি আশা করেন? ওনি সঙ্গে রাখতে চান।
Manual8 Ad Code
কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বলেন, আমি যে ব্রিগেড মেজর ছিলাম সেই অর্ডার কিন্তু সেনা বাহিনীতে হয়নি। ১৯৭১ এ হয়নি, ১৯৭২, ৭৩, ৭৫ এও হয়নি। ১৯৭৫ সালের হেডকোয়ার্টারে আসার সময় মিলিটারি ব্রিগেডিয়ার নাছিম। তিনি পরে সেনাপ্রধান হন। তাকে আমার অফিসে ডেকে পাঠাই। বলি আজকে সন্ধ্যার মধ্যে এই অর্ডার হবে। পরে সেটা করা হয়। বৈষম্য শুধু বাইরে হয় না, আর্মিতেও হয়, আমার সঙ্গে সেটা হয়েছিল। এই বৈষম্য থেকে আমাদের বের হতে হবে। যারা আল্লাহ ও রসুলকে মানে না, তারাই বৈষম্য করে।
কর্নেল অলি আরও বলেন, ওনি জানতে চান তোমার পোস্টিং অর্ডার! বললাম আপনি যান, আমি কাল সকালে গাড়ী নিয়ে রওনা হবো। আমি সংবিধান মেনে বিদ্রোহ করিনি। কোনো বেটার নেতৃত্বে আছি? আমি কারো নেতৃত্বে বিদ্রোহ করিনি। ওসমানীর অর্ডার মেনে কোনোখানে যাব না। আমার জিভ, আমার সাথী-বন্ধু। পরের দিন তুরাতে যাই, জঙ্গল পরিস্কার করে ব্রিগেড হেডকোয়ার্টার সেট করি। জিয়াউর রহমান এসে দেখেন ব্রিগেড হেডকোয়ার্টার রেডি। তিনি বলেন, ইন্ডিয়ান আর্মি থেকে একজন আর্মি মেজর আসবেন। ওনি ব্রিগেড মেজর হবে। আমি কিছু বলিনি। কে ফোর্স, জেড ফোর্স আসলো। ইন্ডিয়ান মেজর আসলো। বললাম রাতে খাও, ঘুমাও। সকাল নাস্তা করে ভেগে যেও। বলে কেন? বললাম, এখানে আর কেউ থাকবে না। উল্টাপাল্টা কাজ করলে বন্দুক থাকবে সঙ্গে, কি করবো বুঝতে পারবা। মেজর জিয়া ডাকলে বলি, আমার যে সুবাদার মেজর রহমান আছে, সে তো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ডিউটি করা সুবাদার। প্রয়োজনে তার কাছে শিখবো। কিন্তু ইন্ডিয়ান অফিসার জেড ফোর্সে থাকবে না।