আজ বুধবার, ২রা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১৮ই ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চা বাগানে বেড়ে ওঠা চম্পা ভারতের অন্ধ্র প্রদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডিতে

editor
প্রকাশিত সেপ্টেম্বর ২, ২০২৬, ১০:২৩ অপরাহ্ণ
চা বাগানে বেড়ে ওঠা চম্পা ভারতের অন্ধ্র প্রদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডিতে

Manual3 Ad Code

তিমির বনিক,মৌলভীবাজার প্রতিনিধি:

চা-বাগানের পথ ধরে শুরু হয়েছিল পথচলা। অনেক প্রতিকূলতা পেরিয়ে সেই পথচলা আজ এসে পৌঁছেছে ভারতের অন্ধ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি গবেষণায়। তিনি চম্পা নাইডু।

মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার লংলা চা-বাগানে বেড়ে ওঠা চম্পার গল্প শুধু একজন তরুণীর সাফল্যের গল্প নয়। এটি চা-বাগান থেকে উঠে আসা সেইসব মেয়েদের গল্পও, যাদের সামনে সুযোগ সীমিত হলেও স্বপ্নের কোনো সীমা নেই।

Manual7 Ad Code

২০১০ সালে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে চম্পা ভর্তি হন ক্যামেলিয়া ডানকান ফাউন্ডেশন স্কুলে। চা-বাগানের শ্রমিকদের সন্তানদের জন্য পরিচালিত এই আবাসিক প্রতিষ্ঠানে বিনা খরচে পড়াশোনা ও আবাসনের সুযোগ পান তিনি। সেখান থেকেই তাঁর শিক্ষাজীবনের বড় পরিবর্তন শুরু।

২০১৫ সালে এসএসসি এবং ২০১৭ সালে এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জন করেন চম্পা। পড়াশোনার পাশাপাশি পেয়েছেন বৃত্তি ডাচ্‌–বাংলা ফাউন্ডেশনের।

এরপর শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা। বিশ্ববিদ্যালয়জীবনেও নিজের শেকড়ের মানুষদের থেকে দূরে সরে যাননি। চা-বাগানের বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নিয়মিত চা-শ্রমিক ও তাঁদের সন্তানদের শিক্ষা, অধিকার ও জীবনযাত্রার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কাজ করেছেন।

চা-বাগানের শিক্ষা, শ্রমিকদের জীবন, মানবাধিকার ও সামাজিক বৈষম্যের বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করতে করতেই তাঁর আগ্রহ আরও বিস্তৃত হয়। পরবর্তীতে পাবলিক পলিসি ও হিউম্যান রাইটস নিয়েও কাজ শুরু করেন তিনি।

তবে এই পথচলা সহজ ছিল না। নানান প্রতিকূলতা ও সংগ্রামের মধ্য দিয়েই এক ধাপ করে এগিয়ে যেতে হয়েছে তাকে।

উচ্চশিক্ষার জন্য ২০২৩ সালে ICCR Scholarship নিয়ে ভারতে যান চম্পা। ভর্তি হন অন্ধ্র বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্সে।

ভারতের অন্যতম পুরোনো ঐতিহ্য বয়ে বেড়ানো প্রতিষ্ঠিত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান অন্ধ্র বিশ্ববিদ্যালয় তাঁর জন্য শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয় ছিল না। চম্পা তেলুগু সম্প্রদায়ের সদস্য এবং তাঁর পারিবারিক শেকড় অন্ধ্র প্রদেশে। পূর্বপুরুষদের সঙ্গে যুক্ত সেই অঞ্চলে থেকেই নিজের একাডেমিক ও গবেষণার পথ তৈরি করতে চেয়েছিলেন তিনি। তাই অন্ধ্র বিশ্ববিদ্যালয়কে বেছে নেওয়ার পেছনে নিজের শেকড়ের প্রতি তাঁর টানও গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

Manual4 Ad Code

২০২৫ সালে দ্বিতীয়বারের মতো ICCR Scholarship পেয়ে অন্ধ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগে পিএইচডি শুরু করেন তিনি।

পিএইচডির জন্য দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও সুযোগ পেয়েছিলেন চম্পা। কিন্তু নিজের পারিবারিক শেকড় ও অন্ধ্র প্রদেশের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ সম্পর্কের কারণে শেষ পর্যন্ত অন্ধ্র বিশ্ববিদ্যালয়েই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

Manual6 Ad Code

বর্তমানে ২০২৫ থেকে ২০২৮ সময়কালে অন্ধ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগে পিএইচডি করছেন চম্পা। তাঁর গবেষণার কেন্দ্রে রয়েছে বাংলাদেশের চা-বাগানের শ্রমজীবী মানুষের জীবন, মানবাধিকার ও সামাজিক বাস্তবতা। পাশাপাশি চা-শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন, অধিকার নিশ্চিত করা এবং তাঁদের জন্য কার্যকর নীতিমালা ও পলিসি প্রণয়নের সম্ভাবনা নিয়েও কাজ করছেন তিনি।

অর্থাৎ যে চা-বাগানের জীবন তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছেন, আজ সেই মানুষদের জীবন ও অধিকারই তাঁর গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাঁর কাজের লক্ষ্য শুধু সমস্যাগুলো তুলে ধরা নয়, বরং চা-শ্রমিকদের জীবনমান ও সামাজিক অবস্থার উন্নয়নে কী ধরনের নীতিগত পরিবর্তন প্রয়োজন, সেটিও খুঁজে দেখা।

চম্পার নিজের ভাবনায়ও এই জায়গাটি গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর কাছে এই পথচলা শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়; চা-বাগান থেকে উঠে আসা আরও অনেক মেয়ের সামনে সম্ভাবনার দরজা খুলে দেওয়ার একটি উদাহরণ। আজ চা-বাগানের অনেক তরুণ-তরুণীই পড়াশোনা করে বিভিন্ন ভালো জায়গায় যাচ্ছে, নিজেদের অবস্থান তৈরি করছে-চম্পার গল্প সেই পরিবর্তনেরই একটি অংশ।

লংলা চা-বাগান থেকে শুরু হওয়া এই পথচলায় তাই শুধু একটি পিএইচডি ডিগ্রি নেই। আছে দীর্ঘ সংগ্রাম, শিক্ষার জন্য লড়াই, নিজের শেকড়ের প্রতি টান এবং সেই মানুষগুলোর জন্য কাজ করার চেষ্টা, যাদের জীবনকে তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছেন।

Manual8 Ad Code

চম্পা চা-বাগান থেকে বেরিয়ে এসেছেন, কিন্তু চা-বাগানকে পেছনে ফেলে আসেননি। বরং নিজের শেকড়ের মানুষদের জীবন, অধিকার ও ভবিষ্যৎ নিয়ে কাজ করেই এগিয়ে চলেছেন।

আর হয়তো এখানেই চম্পার গল্পের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য—তিনি শুধু নিজের জীবনের সীমানা বদলাননি; তাঁর পথচলা চা-বাগানের আরও অনেক মেয়ের স্বপ্নের সীমানাটাও বড় করে দিয়েছে।