আজ শুক্রবার, ১৭ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২রা শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ওয়াশিংটন-ঢাকা বাণিজ্য চুক্তি আজ, কতটা সুবিধা পাবে বাংলাদেশ?

editor
প্রকাশিত ফেব্রুয়ারি ৯, ২০২৬, ০২:০৫ পূর্বাহ্ণ
ওয়াশিংটন-ঢাকা বাণিজ্য চুক্তি আজ, কতটা সুবিধা পাবে বাংলাদেশ?

Manual6 Ad Code

অনলাইন ডেস্ক:

ওয়াশিংটন-ঢাকা বাণিজ্য চুক্তি আজ (সংগৃহীত ছবি)
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর মাত্র কয়েক দিন বাকি। এমন এক সময় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুল্ক-সংক্রান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য চুক্তি সই করতে যাচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার।

Manual2 Ad Code

আজ সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) ওয়াশিংটন ডিসিতে এই চুক্তিতে সই হওয়ার কথা রয়েছে।

নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে এমন একটি দীর্ঘমেয়াদি ও বহুমাত্রিক প্রভাবসম্পন্ন চুক্তি নিয়ে সরকারের এই তৎপরতা ঘিরে রাজনৈতিক মহল, ব্যবসায়ী সমাজ ও অর্থনীতিবিদদের মধ্যে দেখা দিয়েছে ব্যাপক প্রশ্ন ও সংশয়।

চুক্তির শর্তাবলি প্রকাশ না করা, অংশীজনদের সম্পৃক্ত না করা এবং নির্বাচন-পূর্ব তাড়াহুড়ো— সব মিলিয়ে চুক্তিটি নিয়ে সন্দেহ আরও গভীর হয়েছে।

প্রধান প্রশ্ন হলো— এই চুক্তি থেকে বাংলাদেশ বাস্তবে কতটা সুবিধা পাবে? নাকি নির্বাচনের মুখে একটি অন্তর্বর্তী সরকার এমন সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, যার দায়ভার বহন করতে হবে ভবিষ্যৎ নির্বাচিত সরকারকে?

নির্বাচন সামনে রেখে কেন এই তাড়াহুড়ো

১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ভোটের মাত্র তিন দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্য চুক্তি সইয়ের উদ্যোগ নেওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে। অনেকের মতে, এ ধরনের নীতিগত ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত ছিল নির্বাচিত সরকারের জন্য রেখে দেওয়া।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছেন, এই চুক্তির বাস্তবায়ন, পুনরায় আলোচনা বা সংশোধনের দায়িত্ব ভবিষ্যৎ সরকারকেই নিতে হবে। ফলে এখন কোনো একতরফা বা কঠোর শর্ত মেনে নেওয়া হলে, পরবর্তী সরকার তা পরিবর্তন করতে গিয়ে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক জটিলতায় পড়তে পারে।

শুল্ক কমানোর প্রতিশ্রুতি, কিন্তু অনিশ্চিত মাত্রা

বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন জানিয়েছেন, সোমবারের চুক্তিতে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর আরোপিত অতিরিক্ত শুল্ক আরও কমানোর চেষ্টা চলছে। তবে কতটা কমবে, সে বিষয়ে তিনি এখনই নির্দিষ্ট করে কিছু বলতে পারেননি।

গতকাল রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) সচিবালয়ে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, সোমবার (আজ) যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি বাণিজ্য চুক্তি হওয়ার কথা রয়েছে, যেখানে শুল্কহার চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হবে।

শেখ বশিরউদ্দীন বলেন, ৯ তারিখে যে চুক্তিটি হতে যাচ্ছে, সেখানে আমরা চেষ্টা করছি শুল্ক আরও কতটা কমানো যায়। কতটুকু কমবে, এই মুহূর্তে আমি বলতে চাচ্ছি না বা পারছি না। আলোচনার ভিত্তিতে বিষয়টি নির্ধারিত হবে।

তিনি আরও বলেন, শুধু সামগ্রিক শুল্ক কমানো নয়, বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাতে শুল্ক শূন্যে নামিয়ে আনার চেষ্টা চলছে।

আমাদের প্রচেষ্টা রয়েছে— গার্মেন্টস পণ্যে যেন শুল্ক শূন্য হয়। আমরা এখনও সেই লক্ষ্যে কাজ করছি, বলেন তিনি।

Manual5 Ad Code

পাল্টা শুল্ক থেকে দরকষাকষি

২০২৫ সালের এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বাংলাদেশসহ প্রায় ১০০টি দেশের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন। সে সময় বাংলাদেশের ওপর ৩৭ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়। পরে আলোচনার মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকার তা কমিয়ে ২০ শতাংশে নামিয়ে আনে, যা গত ১ আগস্ট থেকে কার্যকর হয়।

এর সঙ্গে আগে থেকেই বিদ্যমান ১৫ শতাংশ শুল্ক যুক্ত হয়ে বর্তমানে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রে মোট শুল্কহার দাঁড়িয়েছে ৩৫ শতাংশ।

এই দরকষাকষি প্রসঙ্গে শেখ বশিরউদ্দীন বলেন, ৩৭ শতাংশ শুল্ক আমরা নেগোশিয়েট করে ২০ শতাংশে নামিয়েছিলাম। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেই চুক্তির শর্ত ফাঁস হয়ে যায়। পৃথিবীতে একমাত্র দেশ হিসেবে আমাদের চুক্তির শর্ত বিশ্বজুড়ে প্রকাশিত হয়। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, সেটা না হলে আমরা ২০ শতাংশেরও কম শুল্ক পেতাম।

তিনি আরও বলেন, তারপরও আমরা আমাদের প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে শুল্ক কমিয়ে আনতে পেরেছি।

বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে আমদানি বাড়ানোর উদ্যোগ

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে বাংলাদেশ ৬২৬টি পণ্যে শুল্ক ছাড় দেয়, যার মধ্যে ১১০টি পণ্যের আমদানি শুল্ক পুরোপুরি প্রত্যাহার করা হয়। তবুও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানে বড় পরিবর্তন আসেনি।

Manual3 Ad Code

শুল্কচাপ কমাতে যুক্তরাষ্ট্রের দাবির আলোকে বাংলাদেশ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়। এর মধ্যে রয়েছে— যুক্তরাষ্ট্র থেকে গম, সয়াবিন তেল ও তুলা আমদানি বৃদ্ধি এবং বোয়িং থেকে উড়োজাহাজ কেনার উদ্যোগ।

Manual8 Ad Code

বেসামরিক বিমান পরিবহন উপদেষ্টা জানান, বর্তমানে বিমানের হাতে ১৯টি উড়োজাহাজ থাকলেও ফ্লাইয়েবল রয়েছে ১৪টি। এই ১৪টি উড়োজাহাজ দিয়েই পুরো নেটওয়ার্ক পরিচালনা করতে হচ্ছে।

তিনি বলেন, বিমানের মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী ২০৩৫ সাল নাগাদ আমাদের অন্তত ৪৭টি উড়োজাহাজ প্রয়োজন।

তিনি আরও জানান, বোয়িং ও এয়ারবাসের প্রস্তাব বিশ্লেষণ করে টেকনো-ইকোনমিক ফিজিবিলিটি সম্পন্ন হয়েছে। এরপর প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর থেকে পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদকে প্রধান করে একটি নেগোশিয়েশন টিম গঠন করা হয়, যা বর্তমানে বোয়িংয়ের সঙ্গে দরকষাকষি করছে।

আমরা যে উড়োজাহাজ কেনার প্রস্তাব করছি, সেটি ২০৩৫ সাল পর্যন্ত মাত্র ১৪টি প্লেনের জন্য। এর মূল্য পরিশোধ হবে দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তিতে— ১০ বছর বা প্রয়োজনে ২০ বছর সময় নিয়ে, বলেন তিনি।

অর্থনীতিবিদদের মতে, ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট কো-অপারেশন ফ্রেমওয়ার্ক অ্যাগ্রিমেন্ট (টিকফা) প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে ভবিষ্যতে এই চুক্তি পুনরায় আলোচনার সুযোগ থাকতে পারে। তবে সেটি কার্যকর হবে কিনা, তা নির্ভর করবে চুক্তির ভাষা ও শর্তের ওপর।

যদি কঠোর ও দীর্ঘমেয়াদি বাধ্যবাধকতা যুক্ত থাকে, তাহলে নতুন সরকারের জন্য সেই সুযোগ সীমিত হয়ে পড়তে পারে।

সরকারের দাবি— এই চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশ শুল্ক সুবিধা পাবে, রপ্তানি প্রতিযোগিতায় টিকে থাকবে এবং মার্কিন বাজারে অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে। অন্যদিকে ব্যবসায়ী ও বিশ্লেষকদের আশঙ্কা— গোপন শর্ত, নির্বাচনের আগে তাড়াহুড়ো এবং অংশীজনদের বাদ দিয়ে নেওয়া সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

তথ্য সুএঃ নিউজ২৪