আজ সোমবার, ২০শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৭ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম কমলেও বাংলাদেশে কেন বাড়লো

editor
প্রকাশিত এপ্রিল ২০, ২০২৬, ০১:১৮ পূর্বাহ্ণ
বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম কমলেও বাংলাদেশে কেন বাড়লো

Manual5 Ad Code

অনলাইন ডেস্ক

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের রেশ কাটতে না কাটতেই ইরান যুদ্ধ বাংলাদেশের জ্বালানি বাজারকে নতুন করে অস্থিতিশীল করে তুলেছে। এই দুই যুদ্ধের সময় সরকার জ্বালানি তেলের দাম অনেকটা বৃদ্ধি করেছে। কিন্তু এবার বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে দেশীয় মূল্যের সমন্বয়হীনতা নিয়ে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যখন আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমতে শুরু করেছে, ঠিক সেই মুহূর্তে বাংলাদেশে দাম বাড়ানো হয়েছে। জ্বালানি তেলের এই মূল্যবৃদ্ধি পণ্য পরিবহন, কৃষি এবং শিল্প উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দেবে।

বৈশ্বিক বাজার বনাম দেশীয় মূল্য

বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারিত হয় ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দামের ওপর ভিত্তি করে। ফলে ব্রেন্ট ক্রুডের আন্তর্জাতিক বাজারে কখন কেমন দাম তার ওপর বিশ্বজুড়ে দেশগুলোর জ্বালানির দাম কত হতে পারে তার একটি ধারণা পাওয়া যায়। তবে কোনও কোনও দেশের নিজস্ব শুল্ক হার, তেল বিক্রির কমিশন এবং তেল পরিবহন ব্যবস্থা অভ্যন্তরীণ জ্বালানির বাজারের দামকে প্রভাবিত করে।

Manual3 Ad Code

এর আগের দফায় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময় ২০২২ সালের জানুয়ারিতে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি ৮০ থেকে ৯০ ডলার। বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধের শুরুতেই তেলের দাম বেড়ে ১০০ ডলারে দাঁড়ায়। মার্চে দাম বেড়ে ব্যারেল প্রতি ১৩৯ ডলারে দাঁড়ায়। বছরের মাঝামাঝি সময়ে আবার তেলের দাম কমে ১১০ ডলারে দাঁড়ায় এবং একেবারে বছরের শেষে আবার দাম ৮৫ ডলারে নেমে আসে।

ওই বছর অর্থাৎ আগস্টে তেলের দাম একবারে অনেকটা বৃদ্ধি করা হয়। সরকারের যুক্তি ছিল—বিপিসির লোকসান কমানো এবং প্রতিবেশী দেশে তেল পাচার রোধ করা। ওই সময় ২০২২ সালে ডিজেল এবং কেরোসিনের দাম ৮০ টাকা থেকে ৪২ ভাগ বাড়িয়ে করা হয় ১১৪ টাকা। অকটেনের দাম ৫১ ভাগ বাড়িয়ে ৮৯ টাকা থেকে ১৩৫ টাকা একই হারে অর্থাৎ ৫১ ভাগ বাড়িয়ে পেট্রোলের দাম ৮৬ টাকা থেকে ১৩০ টাকা করা হয়।

Manual5 Ad Code

সে সময়ও আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমে যাচ্ছে এমন পরিস্থিতিতে সরকার দেশে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি করে। এরপর ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে সমালোচনার মধ্যে দাম কমানো হয়। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে যে হারে তেলের দাম কমেছে ঠিক ওই হারে কমানো হয়নি। সব ধরনের তেলের লিটারপ্রতি কমানো হয় মাত্র ৫ টাকা।

এরপর আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর দীর্ঘদিনের সংস্কার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বাধ্য হয় বাংলাদেশে। ২০২৪ সালের মার্চ মাস থেকে আন্তর্জাতিক বাজার দরের সঙ্গে সমন্বয় করে দেশে তেলের দাম নির্ধারণ করা হয়। এতে দেশের বাজারে তেলের দাম খানিকটা কমে যায়। বিপিসি লোকসানের কবল থেকে বের হয়ে আসে। এমনকি বিপুল পরিমাণ মুনাফাও করে।

দেখা যায়, ২০২৪ সালে বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৭৫ থেকে ৯০ ডলারের মধ্যে ঘোরাফেরা করেছে। গত বছর ২০২৫ সালেও ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৭৫ থেকে ৮৫ ডলারের মধ্যেই ছিল। এই সময়ে দেশে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি করা হয়নি। এমনকি বিপিসির তরফ থেকে বলাও হয়নি যে তারা লোকসান করছে বা সরকারকে তেলে কোনও ভর্তুকি দিতে হচ্ছে।

সাম্প্রতিক ইরান যুদ্ধের পর দেখা যায় ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১২০ ডলারে উঠে যায়। কিন্তু তা খুব সীমিত সময়ের জন্যে। আজও ব্রেন্ট ক্রুড ৯০ ডলারে পাওয়া যাচ্ছে। হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার জন্য বিশ্বনেতারা এক হতে শুরু করেছে। ফ্রান্স এই কাজে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে।

কিন্তু বিশ্ববাজারের এই নিম্নমুখী প্রবণতার মধ্যেই দেশে আজ থেকে তেলের নতুন বর্ধিত দাম কার্যকর হয়েছে। যা কার্যকর হয়েছে রবিবার থেকে। নতুন দাম অনুযায়ী ডিজেল ১০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১১২ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৩০ টাকা, পেট্রোল ১১৬ টাকা থেকে ১৩৫ টাকা এবং অকটেন ১২০ টাকা থেকে ১৪০ টাকা লিটার করা হয়েছে।

এতে প্রশ্ন উঠছে, এখনও যদি ব্রেন্ট ক্রুডের দাম একই থাকে তাহলে কেন তেলের দাম বাড়ানো হলো। সরকার অবশ্য বলছে লোকসান কমানোর জন্যই এই কাজ করেছে।

তেলের পর এলপিজি, সামনে বিদ্যুৎ

জ্বালানি তেলের পাশাপাশি দ্বিতীয় দফায় বাড়ানো হয়েছে রান্নার গ্যাস এলপিজির দাম। নতুন সিদ্ধান্তে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ২১২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৯৪০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। যা আগে ছিল ১ হাজার ৭২৮ টাকা।

একই সময়ে আলোচনার টেবিলে রয়েছে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাবও। পিডিবি’র উৎপাদন খরচ ও আয়-ব্যয়ের প্রতিবেদন ইতোমধ্যে মন্ত্রিসভা কমিটিতে পাঠানো হয়েছে। গত ৯ এপ্রিল গঠিত কমিটি বিষয়টি পর্যালোচনা করে চূড়ান্ত সুপারিশ দিলেই বিদ্যুতের দামও বাড়তে পারে।

বাজার ও জনজীবনে প্রভাব

Manual2 Ad Code

জ্বালানির দাম বাড়ার প্রভাব সরাসরি পড়তে শুরু করেছে নিত্যপণ্যের বাজারে। ইতোমধ্যে বাস ও ট্রাক ভাড়া বাড়তে শুরু করেছে। কৃষি খাতে সেচ এবং শিল্প খাতে কাঁচামাল পরিবহনের খরচ বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এই অতিরিক্ত খরচের চূড়ান্ত বোঝা শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তার কাঁধেই চাপছে।

বিশেষজ্ঞদের মতামত

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামসুল আলম এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে বলেন, “তেলের দাম বাড়িয়ে সরকার জনগণের প্রতি সুবিচার করেনি। একটি নির্বাচিত সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা থাকে তারা জনগণের দিক দেখবে। সরকার ক্ষমতায় এসে প্রথমে ঘোষণা দিয়েছিল কোনও পণ্যের দাম বাড়াবে না, ভর্তুকি দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেবে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে যখন দাম নিম্নমুখী, তখন দেশে দাম বাড়ানো হলো। এই সিদ্ধান্তের ফলে সরকারের প্রতি জনআস্থার সংকট তৈরি হবে।” তিনি একে ‘লুণ্ঠনমূলক’ প্রক্রিয়া হিসেবে অভিহিত করে সামনের দিনগুলোতে পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেন।

Manual8 Ad Code

অপরদিকে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ইজাজ হোসেন মনে করেন, সরকার কতদিন ভর্তুকি দিয়ে যাবে সে প্রশ্নও রয়েছে। তিনি বলেন, “দাম কিছুটা বাড়ানো ভালো। অন্যান্য দেশও দাম কিছুটা বাড়িয়েছে। এতে সাধারণ মানুষ বুঝতে পারবে—সংকট আছে, ব্যবহারের ক্ষেত্রে সচেতন হতে হবে। তবে সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে যেন একশ্রেণির অসাধু চক্র একে পুঁজি করে পরিবহন ভাড়া বা পণ্যের দাম অস্বাভাবিক বাড়িয়ে অতি মুনাফা করতে না পারে। এতে জনগণের ভোগান্তি চরম আকার ধারণ করবে।”

তথ্য সুএঃ বাংলা ট্রিবিউন