আজ বুধবার, ২২শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৯ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মহাকাশ থেকেও দেখা যাচ্ছে হরমুজে ছড়িয়ে পড়া তেল, পরিবেশ বিপর্যয়ের শঙ্কা

editor
প্রকাশিত এপ্রিল ২২, ২০২৬, ০৬:১৬ অপরাহ্ণ
মহাকাশ থেকেও দেখা যাচ্ছে হরমুজে ছড়িয়ে পড়া তেল, পরিবেশ বিপর্যয়ের শঙ্কা

Manual2 Ad Code

অনলাইন ডেস্ক

ইরানকে ঘিরে সাম্প্রতিক সামরিক হামলার জেরে পারস্য উপসাগরজুড়ে ছড়িয়ে পড়া তেল দূষণ এখন মহাকাশ থেকেও স্পষ্টভাবে ধরা পড়ছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা না গেলে এটি ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে।

স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা যাচ্ছে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলায় তেল স্থাপনা ও জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর বিভিন্ন স্থানে তেল ছড়িয়ে পড়েছে। এর ফলে শুধু অবকাঠামোগত ক্ষতিই নয়, পারস্য উপসাগরের নাজুক সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যও গুরুতর হুমকির মুখে পড়েছে।

সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ৭ এপ্রিল ধারণ করা একটি ছবিতে দেখা যায়, ইরানের কেশম দ্বীপের কাছে হরমুজ প্রণালির পাঁচ মাইলেরও বেশি এলাকায় তেল ছড়িয়ে পড়েছে। পরিবেশবাদী সংগঠন গ্রিনপিস জার্মানির মুখপাত্র নিনা নোয়েলের বরাতে জানা গেছে, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ‘শহিদ বাঘেরি’ নামের একটি ইরানি জাহাজ থেকেই ওই এলাকায় তেল নিঃসরণ ঘটে।

Manual7 Ad Code


পারস্য উপসাগরে তেল দূষণের চিত্র। ছবি: সেন্টিনেল-২/ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা (ইএসএ)

একই দিনে ধারণ করা আরেকটি স্যাটেলাইট ছবিতে লাভান দ্বীপের আশেপাশে তেলের উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের দাবি, দ্বীপসংলগ্ন একটি তেল স্থাপনায় ‘শত্রুপক্ষের’ হামলায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও, যা সিএনএন যাচাই করেছে, তাতে একটি ইরানি তেল শোধনাগারে বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ডের দৃশ্যও দেখা যায়।

ডাচ শান্তি সংস্থা প্যাক্স-এর প্রকল্প প্রধান উইম জুইনেনবার্গ এই ঘটনাকে ‘বড় ধরনের পরিবেশগত জরুরি অবস্থা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, লাভান দ্বীপের অন্তত পাঁচটি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার ফলে দ্বীপসংলগ্ন সাগরে তেল ছড়িয়ে পড়ছে এবং তা ধীরে ধীরে শিদভার দ্বীপের দিকেও ছড়িয়ে যাচ্ছে।

শিদভার দ্বীপ পারস্য উপসাগরের একটি সংরক্ষিত প্রবাল দ্বীপ, যেখানে কচ্ছপ, সামুদ্রিক পাখিসহ নানা সংরক্ষিত প্রাণীর আবাস। এই এলাকায় তেল পৌঁছালে সেখানকার বাস্তুতন্ত্র মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

স্যাটেলাইট চিত্রে কুয়েত উপকূলের কাছেও ৬ এপ্রিল তেল ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা দেখা গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে হাজারো মানুষের জীবিকা হুমকির মুখে পড়তে পারে, বিশেষ করে উপকূলীয় এলাকায় বসবাসকারী যারা মাছ ধরার ওপর নির্ভরশীল। তেল দূষণে মাছ দূষিত হলে খাদ্য ও আয়ের উৎস দুই-ই সংকটে পড়বে।

Manual8 Ad Code

এ ছাড়া, কচ্ছপ, ডলফিন ও তিমির মতো সামুদ্রিক প্রাণী তেল গিলে ফেলতে পারে বা তেলের স্তরে আটকে পড়তে পারে, যা তাদের জন্য প্রাণঘাতী হতে পারে।

Manual4 Ad Code

আরেকটি বড় উদ্বেগ হলো লবণাক্ত পানি বিশুদ্ধকরণ প্ল্যান্টগুলো। উপসাগরীয় অঞ্চলে প্রায় ১০ কোটি মানুষ এসব প্ল্যান্টের ওপর নির্ভরশীল। তেল দূষণ এসব প্ল্যান্টের ফিল্টারিং ব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে, যা বিশুদ্ধ পানির সরবরাহে বড় ধরনের সংকট তৈরি করতে পারে।

বর্তমানে এই দূষণের প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি নির্ধারণ করা কঠিন হলেও, পরিস্থিতি আরও অবনতি হলে বড় ধরনের পরিবেশগত বিপর্যয় অনিবার্য হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষ করে উপসাগরে থাকা প্রায় ৭৫টি বড় তেলবাহী ট্যাংকার, যেগুলোতে প্রায় ১৯ বিলিয়ন লিটার অপরিশোধিত তেল রয়েছে, এর যেকোনো একটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, তেল দূষণের প্রভাব ব্যাপক—অণুজীব থেকে শুরু করে মাছ, পাখি এবং ম্যানগ্রোভনির্ভর সামুদ্রিক কচ্ছপ পর্যন্ত পুরো বাস্তুতন্ত্র এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

তবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এই দূষণ পরিষ্কার করা। দুর্গম এলাকা, জটিল ভৌগোলিক কাঠামো এবং চলমান সংঘাতের কারণে পরিষ্কার কার্যক্রম পরিচালনা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

ফলে পারস্য উপসাগর এখন শুধু সামরিক উত্তেজনার কেন্দ্রই নয়, ধীরে ধীরে একটি সম্ভাব্য পরিবেশ বিপর্যয়ের দিকেও এগিয়ে যাচ্ছে।

Manual4 Ad Code